বিপরীত দিক থেকে অনেকগুলো ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি কানে আসছে। সুলতান আইউবীর গ্রেফতারকৃত গোয়েন্দা মেয়েদের ছিনিয়ে আনা খৃষ্টান কমান্ডো দল ঐখানে দাঁড়িয়ে। সমুদ্রের ওপার থেকে এসে তারা যে স্থানে নৌকা বেঁধে রেখে অভিযানে নেমেছিলো, এই সেই জায়গা। অভিযান সফল করে এখন তাদের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আপন দেশে ফিরে যাওয়ার পালা। তারা ঘোড়া থেকে নেমে এক এক করে নৌকায় উঠছে। ছেড়ে দিয়েছে ঘোড়াগুলো।
আচম্বিত তীরবর্ষণ শুরু হয় তাদের উপর। পালাবার পথ নেই। পাল্টা আক্রমণেরও সুযোগ নেই। তারা আত্মরক্ষার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। কজন লাফিয়ে উঠে নৌকায়। তারা রশি কেটে দিয়ে শপাশপ দাঁড় ফেলতে শুরু করে। পিছনে যারা রয়ে গেলো, তারা তীরের নিশানায় পরিণত হলো। নৌকায় করে পলায়নপর কমাণ্ডোদের থামতে বলা হয়। কিন্তু তারা থামছে না। বাতাস নেই। ধীরে ধীরে মাঝের দিকে চলে যাচ্ছে নৌকা। শোঁ শোঁ শব্দ করে বেশ কটি তীর গিয়ে বিদ্ধ হয় তাদেরও গায়ে। হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায় দাড়ের শব্দ। আরো এক ঝাক তীর ছুটে যায় নৌকায়। তারপর আরো এক ঝাঁক। গেঁথে গেঁথে দাঁড়িয়ে আছে লাশগুলোর গায়ে। মাঝি-মাল্লাহীন নৌকা দুলতে দুলতে স্রোতে ভেসে অল্পক্ষণের মধ্যে কূলে এসে ঠেকে। মুসলিম বাহিনী পাড়ে এসে ধরে ফেলে নৌকাটি। নৌকায় কোন প্রাণী নেই। আছে প্রাণহীন: কতগুলো দেহ। তীরের আঘাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে মেয়েরাও। গোটা কমাণ্ডের বেঁচে নেই একজনও।
একটি খুটার সঙ্গে বেঁধে রাখা হলো নৈৗকাটি। সাফল্যের গৌরব নিয়ে। উপকূলীয় ক্যাম্প অভিমুখে রওনা হয় মুসলিম সেনারা।
***
মুবী ও সঙ্গীকে নিয়ে কায়রোর একটি সরাইখানায় অবস্থান করছে মিগনানা মারিউস। এ সরাইখানাটি দু ভাগে বিভক্ত। একাংশ সাধারণ ও নিম্নস্তরের মুসাফিরদের জন্য, অপর অংশ বিত্তশালী ও উচ্চস্তরের পর্যটকদের জন্য। ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরাও এ অংশে অবস্থান করে। এদের জন্য মদ, নারী ও নাচ-গানের ব্যবস্থা আছে। মিগনানা মারিউসের এসে অবস্থান নেয় এ অংশে। এসে পরিচয় । দেয়, মুবী তার স্ত্রী আর সঙ্গের লোকটি তার ভৃত্য।
মুবীর রূপ-যৌবন সরাইখানার মালিক-কর্তৃপক্ষ এবং অবস্থানরত লোকদের মনে মিগনানা মারিউস এর প্রভাব বিস্তার করে ফেলে। এমন একজন সুন্দরী যুবতী যার স্ত্রী, তিনি অবশ্যই একজন বিত্তশালী আমীর। মিগনানাকে বিশেষ গুরুত্বের চোখে দেখতে শুরু করে কর্তৃপক্ষ।
নিজেকে মুসলমান পরিচয় দিয়ে সালাহুদ্দীন আইউবীর বাড়ী-ঘর ও দফতর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে মুবী। মুবী জানতে পায়, সুলতান আইউবী সুদানীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন ও সুদানী বাহিনীকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন। মুবী আরো জানতে পারে, সুলতান আইউবী সুদানী সালার ও কমাণ্ডার শ্রেণীর লোকদের হেরেম থেকে ললনাদের বিদায় করে দিয়েছেন এবং আবাদী জমি দিয়ে তাদের পুনর্বাসিত করছেন।
মিসরের ভাষা জানে না মিগনানা মারিউস। তথাপি সে আগুন নিয়ে খেলার মত এই ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে অবতরণ করলো। এটি হয়ত তার অস্বাভাবিক দুঃসাহস কিংবা চরম নির্বুদ্ধিতর পরিচয়। এ জাতীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটন এবং এতবড় মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের নিকটে পৌঁছার প্রশিক্ষণও তার নেই। তদুপরি সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তারপরও সে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করতে আসলো! কমাণ্ডার বলেছিলো–তুমি একটি বদ্ধ পাগল; বুদ্ধি বিবেকের বাম্পও নেই তোমার মাথায়। বাহ্যত পাগল-ই ছিলো মিগনানা মারিউস।
এ এক ঐতিহাসিক সত্য যে, বড়দেরকে যারা হত্যা করে, তারা পাগল-ই হয়ে থাকে। বিকৃত-মস্তিষ্ক না হোক মাথার নাট-বোন্ট কিছুটা হলেও ঢিলে থাকে তাদের। ইতালীর এই সাজাপ্রাপ্ত লোকটির অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। তার কাছে এমন একটি সম্পদ আছে, যাকে সে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে শুধু। সে হলো মুবী । মুৰী শুধু মিসরের ভাষা-ই জানতো না, বরং তাকে এবং তার নিহত হয় সঙ্গী মেয়েকে মিসরী ও আরবী মুসলমানদের চলাফেরা, উঠাবসা, সভ্যতা-সংস্কৃতি ইত্যাদি সব সামাজিক আচার-আচরণ সম্পর্কেও দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। সে মুসলমান পুরুষদের মনের যথার্থ অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবহিত। অভিনয় করতে জানে ভালো। মুবীর সবচে বড় গুণ, সে আঙ্গুলের ইশারায় পুরুষদের নাচাতে জানে। জানে প্রয়োজনে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে যে কোন পুরুষের সামনে নিজেকে মেলে ধরতে।
সরাইখানার রুদ্ধ কক্ষে মিগনানা মারিউস, মুবী ও তাদের সঙ্গী কী আলোচনা করলো, কী পরিকল্পনা আঁটলো, তা কেউ জানে না। সরাইখানায় তিন-চারদিন অবস্থান করার পর মিগনানা মারিউস যখন বাইরে বের হয়, তখন তার মুখে লম্বা দাড়ি, চেহারার রং সুদানীদের ন্যায় গাঢ় বাদামী। এই বেশ তার কৃত্রিম হলেও দেখতে কৃত্রিম বলে মনে হলো না। পরনে সাধারণ একটি চোগা, মাথায় পাগড়ী ও রোমাল। মুবী আপাদমস্তক কালো বোরকায় আবৃত। তার শুধু মুখমণ্ডলটাই দেখা যায়। কপালের উপর কয়েকটি রেশমী চুল সোনার তারের মত ঝক ঝক্ করছে। রূপের বন্যা বইছে তার চেহারায়। মেয়েটির প্রতি রাস্তার পথিকদের যার-ই দৃষ্টি পড়ছে, তারই চোখ আটকে যাচ্ছে। সঙ্গের লোকটির পরণে সাধারণ পোশাক। দেখে লোকটাকে এদের চাকর-ভৃত্য বলেই মনে হলো।
