দুর্গের অপর দিকে যে খৃস্টান বাহিনী ছিলো, তাদের উপর আক্রমণ হয়নি। এদিককার হৈ-হুঁল্লোড়, আর্ত চীৎকার আর ঘোড়ার আকাশকাঁপানো হেষারবে তাদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এদিককার খৃস্টান সৈন্যরা ওদিকে পালিয়ে যায়। তাদের হাজার হাজার উট-ঘোড়া ও খচ্চরের রশি খুলে দেয়া হয়েছিলো। তারা এলোপাতাড়ি ছুটতে গিয়ে সৈনিকদের পিষে মারতে এবং আতঙ্কিত করতে শুরু করে। বল্ডউইন বাহিনীর এই অংশটা পালাতে উদ্যত হয়।
ওদিকে মুসলিম মেয়ে চারটি নিখোঁজ হয়ে গেছে। তাদের একজন মুসলিম সৈনিকদের সংবাদ দেয়ার চেষ্টা করছে যে, বল্ডউইন এখানে আছেন। কিন্তু মুসলিম সৈন্যরা সবাই অশ্বারোহী এবং অবিরাম ছুটে চলছে। তারা খৃস্টান বাহিনী থেকে দূরে চলে গেছে। মেয়েটি দু-তিনজন অশ্বারোহীর পেছনে পেছনে চীৎকার করে ছুটেছে। কিন্তু হট্টগোল এতো বেশি যে, তার চীৎকার কারো কানে পৌঁছেনি। কেউ তার দিকে ফিরে তাকায়নি। মেয়েটি পেছনে অনেক দূরে চলে গেছে।
হঠাৎ এক অশ্বারোহী মেয়েটিকে দেখে ঘোড়া থামায়। মেয়েটি তাকে কম্পিত কণ্ঠে বললো, আমি মুসলমান। আমরা তিনটি মেয়ে খৃস্টান সম্রাটের কজায় আছি।
বল্ডউইনের তাঁবু- যেটি তার সামরিক হেডকোয়ার্টারও ফৌজ থেকে আলাদা এবং দূরে। মেয়েটির ডাকে যে সৈনিক ঘোড়া থামিয়েছে, তিনি একজন কমান্ডার। তিনি মেয়েটিকে নিজের ঘোড়ার পিঠে পেছনে বসিয়ে নিয়ে যান।
আল-আদিলের এক সালার মেয়েটির পুরো কাহিনী শোনেন। মেয়েটি বল্ডউইনের হেডকোর্টারের ঠিকানা বলে। সালার সেখানে গেরিলা আক্রমণ এবং বল্ডউইনকে ধরার জন্য দুটি সেনাদল প্রস্তুত করেন এবং নিজে তাদের নেতৃত্ব প্রদান করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি বল্ডউইনের তাঁবুটা ঘিরে ফেলেন। সালার বল্ডউইনকে হুংকার দেন। তাঁবুতে অগ্নিসংযোগের হুমকি প্রদান করেন। কিন্তু বল্ডউইন তাঁবুতে নেই। নেই তার দেহরক্ষীরাও। যারা অস্ত্র সমর্পণ করে সম্মুখে এগিয়ে আসে, তারা চাকর, কয়েকটি খৃস্টান ও তিন মুসলিম মেয়ে এবং কয়েকজন সাধারণ সৈনিক। তাদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। বল্ডউইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। কিন্তু কেউ বলতে পারলো না, লোকটা কোথায় আছেন।
বেগতিক অবস্থায় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বল্ডউইন সম্মুখে চলে গেছেন। দীর্ঘক্ষণ পর তিনি জেনে ফেলেছেন, এটা মুসলিম বাহিনীর গেরিলা আক্রমণ-পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনি নিজ তাঁবু অভিমুখে ফেরত রওনা হন। সঙ্গে দেহরক্ষী আছে। তবু এলাকা থেকে বেশ দূরে থাকতেই একদিক থেকে একটি ঘোড়া ছুটে এসে তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে গিয়েই বললো, আপনি অন্য কোথাও চলে যান। আপনার তাঁবুতে মুসলিম সৈন্যরা হানা দিয়েছে।
বল্ডউইন সেখান থেকেই ঘোড়ার গতি ফিরিয়ে দেন।
আল-আদিল সারা রাত আঘাত হানো আর পালিয়ে যাও নীতিতে অভিযান অব্যাহত রাখেন। রাত পোহাবার পর দেখা গেলো হামাতের দুর্গের চতুর্পার্শ্বে খৃস্টানদের লাশ ছড়িয়ে আছে। আহতরা কাতরাচ্ছে। আল আদিলের শহীদদের লাশও আছে। খচ্চর-ঘোড়া ও উট দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে চরে বেড়াচ্ছে। এখানকার কোথাও না বল্ডউইন আছে, না তার জীবিত সৈন্যরা। খৃস্টানরা তাদের রসদও ফেলে গেছে। আল-আদিল তার বাহিনীকে নির্দেশ দেন, দুশমনের ফেলে যাওয়া সম্পদগুলো জড়ো করো এবং তাদের পশুগুলোকেও ধরে আনেনা।
আল-আদিলের এই আক্রমণ বীরত্ব, জযবা ও যুদ্ধবিদ্যার বিচারে প্রশংসনীয় অভিযান ছিলো। কিন্তু সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি তার দ্বারা ফায়দা হাসিল করতে পারেননি। প্রয়োজন ছিলো, দিশেহারা অবস্থায় পলায়নপর খৃস্টানদের ধাওয়া করে তাদের সামরিক শক্তিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া। তারপর সম্মুখে এগিয়ে গিয়ে সেই অঞ্চলে ঢুকে যাওয়া, যেটি খৃস্টানরা জয় করে নিয়েছিলো। যতো বেশি সম্ভব শত্রুসেনাদের বন্দি করাও আবশ্যক ছিলো, যাদেরকে নিজেদের বন্দিদের মুক্ত করার কাজে ব্যবহার করা যেতো। কিন্তু সফল গেরিলা আক্রমণ থেকে বড় কোনো সফলতা অর্জন করা আল-আদিলের পক্ষে সম্ভব ছিলো না। কারণ, তার সৈন্য ছিলো কম। ধাওয়া করার শক্তি তার ছিলো না। গেরিলা ও কমান্ডো হামলা চালিয়ে দুশমনকে অস্থির ও আধমরা করা যায়। পরাজিত করে ভূ খন্ড দখল করতে হলে পরিপূর্ণ সামরিক শক্তির প্রয়োজন। আল-আদিল প্রথম কাজটি সাফল্যের সঙ্গে আঞ্জাম দিয়েছেন বটে; কিন্তু দ্বিতীয়টির জন্য কোন সামর্থ তাঁর ছিলো না।
আল-আদিল একটি সাফল্য এই অর্জন করেছেন যে, রামাল্লার পরাজয় তার স্বল্পসংখ্যক সৈন্যের উপর যে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিলো, সেটি দূর হয়ে গেছে এবং সৈনিকদের জা ও মনোবল চাঙ্গা হয়ে ওঠেছে। তাদের মনে বিশ্বাস ও আস্থা জন্মে গেছে, খৃস্টানরা তাদের চে শক্তিশালী নয় এবং যে কোনো ময়দানে তারা খৃস্টানদের পরাজিত করতে সক্ষম। প্রয়োজন শুধু সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করা। এই সাফল্যও অর্জিত হয়ে গেছে যে, তারা হামাতের দুৰ্গটাকে রক্ষা করেছে। অন্যথায় খৃস্টানরা একটি দুর্গও পেয়ে গিয়েছিলো।
আল-আদিল নিজ হেডকোয়ার্টারে বসে আক্ষেপ করছেন। সালারদের আবেগ তাঁর চেয়েও বেশি উত্তেজিত। যদি পর্যাপ্ত সৈন্য থাকতো, তাহলে এ কমান্ডো অভিযানের পর অনেক বড় সাফল্য অর্জন করা যেত এবং বল্ডউইন তার সৈনিকদেরকে জীবিত নিয়ে যেতে পারতো না।
