আমাদেরকে সম্ভ্রমের কুরবানী দিতেই হবে- নির্জনে কথা বলার সুযোগ পেয়ে চার মেয়ের একজন বললো- আমাদের পালানো দরকার।
আর প্রতিশোধ নেয়া উচিত- অন্য একজন বললো।
তার জন্য আমাদেরকে প্রকাশ করতে হবে, আমরা আন্তরিকভাবেই তাদের দাসত্ব মেনে নিয়েছি- প্রথম মেয়ে বললো- তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে।
আমার পিতা সুলতান আইউবীর বাহিনীতে আছেন- অন্য একজন বললো- বর্তমানে মিসরে আছেন। আমি তাঁর নিকট থেকে শুনেছি, কাফেরদের মেয়েরা তাদের ধর্ম, জাতি ও ক্রুশের জন্য নিজের ইজ্জত বিলিয়ে আমাদের বড় বড় শাসকদেরকে ক্রুশের অনুগত বানায়। কাউকে হত্যা করতে হলে করায়। আমাদের ফৌজের গোপন তথ্য সংগ্রহ করে তাদের সম্রাটদের নিকট পৌঁছায়।
আমি জানি- অন্য এক মেয়ে বললো- তাদের মেয়েরা সে কাজটাই করে, যা আমাদের পুরুষ গুপ্তচররা শত্রুর দেশে গিয়ে করে থাকে। মেয়েটি কথা বন্ধ করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে গোপনীয়তা বজায় রেখে বললো- যদি তাদের বলে দেই, আমরা তোমাদের ধর্ম গ্রহণ করবো, তাহলে এমন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে যে, আমরা এই সম্রাটকে খুন করে ফেলবো।
আর কিছু না হোক, অদ্ভুত পালাবার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একজন বললো।
বল্ডউইন বাহিনীর হামাত দুর্গ অবরোধের রাতের দুরাত আগের ঘটনা। সম্মুখপানে অগ্রসর হতে হতে মুসলিম মেয়েরা খৃস্টান মেয়েদের বললো, আমরা তোমাদের কথা বুঝে ফেলেছি। যে কোনো সময় আমরা ইসলাম ত্যাগ করে তোমাদের ধর্ম গ্রহণ করে ফেলবো।
বিষয়টা বল্ডউইনকে অবহিত করা হলো। তিনি তাদেরকে মূল্যবান হার উপহার দিয়ে গলায় ক্রুশ ঝুলিয়ে দেন। কিন্তু তিনি খৃস্টান মেয়েদের আলাদা ডেকে নিয়ে বললেন- আমি এদের কারো হাতে কিছু পানাহার করবো না। হতে পারে, এটা তাদের কৌশল। মুখের কথায় ধর জাগ গ্রহণের ঘোষণা দিলেই তো হয়ে যায় না। মনের পরিবর্তন সহজ নয়। তোমরা তাদের মন জয় করার চেষ্টা করো। মুসলমানদের ক্রয় করা কঠিন নয়। তবে তাদের উপর ভরসা রাখাও অনিরাপদ। যেসব মুসলমানের ঈমান পাকা, তারা এমন এমন ত্যাগ দিয়ে বসে, আমরা যার কল্পনাও করতে পারি না। এই মেয়েগুলো পালাতে পারবে না। তবে চোখ রাখবে, যেন এরা আমার উপর আক্রমণ না করে বসে।
***
অবরোধের প্রথম রাত। চার মেয়ে আলাদা আলাদা কক্ষে ঘুমিয়ে আছে। বল্ডউইনও তাদের নিয়ে ফুর্তি করার পর ঘুমিয়ে পড়েছেন। ছোট বড় সকল কমান্ডার অচেতনের ঘুম ঘুমাচ্ছে। সৈন্যদেরও কোনো চৈতন্য নেই। জেগে আছে শুধু সান্ত্রীরা আর বল্ডউইনের দেহরক্ষীদের চার-পাঁচজন সৈনিক। হামাতের একটি উপত্যকা চলে গেছে দুর্গের দিকে। সম্মুখে দুর্গ পর্যন্ত খোেলা মাঠ। এই উপত্যকায় অন্তত এক হাজার পদাতিক সৈন্য পা টিপে টিপে হাঁটছে। কমান্ডার তাদেরকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা সম্মুখপানে এগিয়ে চলছে। বল্ডউইনের বাহিনীর তাবু এখন সামান্য দূরে।
এই পদাতিক বাহিনী আল-আদিলের সৈনিক। আল-আদিল দুর্গে নেই। তাঁর অনুমান ছিলো, খৃস্টানরা দুর্গ অবরোধ করবে। তাই তিনি তাঁর সবকটি ইউনিটকে বলে রাখেন, অবরোধ হলে ভয় পাবে না। আল আদিল দুর্গপতিকে পরিকল্পনা জানিয়ে রাখেন। সে কারণেই দুর্গপতি অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে তীর বৃষ্টির মাধ্যমে ক্রুসেডারদের হুৎকারের যথার্থ জবার প্রদান করেছেন। দুর্গপতি হলেন আল-আদিলের মামা শিহাব উদ্দীন আল হারেমী।
রাতে আল-আদিলের এক হাজার পদাতিক সৈন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে এবং সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে গেরিলা আক্রমণ চালায়। তারা সর্বপ্রথম তাঁবুগুলোর রশি কেটে ফেলে এবং উপর থেকে খৃস্টানদেরকে বর্শার আঘাতে ঝাঁঝরা করতে শুরু করে। তাঁবুর তলে আটকেপড়া সৈনিকরা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়।
এটা স্থির হয়ে লড়াই করার যুদ্ধ নয়। এটা সুলতান আইউবীর আঘাত করো আর পালাও ধরনের বিশেষ রণকৌশল। এতো বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে এক হাজার সৈনিকের স্থির হয়ে যুদ্ধ করা সম্ভবও নয়। বিভক্ত ক্ষুদ্র দলগুলোর দায়িত্ব ভিন্ন ভিন্ন। দু-তিনটি দল ক্রুসেডারদের উট-ঘোড়া ও খচ্চরের বাঁধন খুলে দেয়। এক হাজার সৈনিক চুপিচুপি আসে আর পলকের মধ্যে ডানে-বাঁয়ে বেরিয়ে যায়। খৃস্টান বাহিনীর মধ্যে শোরগোল ও আর্তচীঙ্কার শুরু হয়ে যায় যে, আসমান-যমিন এক সঙ্গে কেঁপে ওঠে।
বল্ডউইনের চোখ খুলে যায়। তার কমান্ডারগণও জেগে ওঠে। তিনি তাঁবু থেকে বের হয়ে দেখতে পান, কোথাও আগুন জ্বলছে। আল-আদিলের সৈনিকরা তাঁবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে গেছে। আক্রমণের সময় তারা আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়েছিলো। এই ধ্বনি মুসলমান মেয়েগুলোও শুনেছিলো। তারা বুঝে ফেলে, এই আক্রমণ মুসলিম সৈন্যদের। এক মেয়ে বলে ওঠে, চলো পালাই। কিন্তু দুটি মেয়ে আবেগের বশবর্তী হয়ে বল্ডউইনকে খুন করতে প্রস্তুত হয়ে যায়। সেখানে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়া হলো। বল্ডউইনের দেহরক্ষীরা তার চতুর্পাশ্বে ঘোড়ায় চড়ে দাঁড়িয়ে যায়।
হঠাৎ পায়ের তলার মাটি কাঁপতে শুরু করে প্রচন্ড কম্পন। সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার ঘোড়র ক্ষুরধ্বনি কানে আসতে শুরু করে। এরা আল আদিলের অশ্বারোহী সৈনিক। মুসলমান ঐতিহাসিকদের মতে তাদের সংখ্যা ছিলো দুহাজার। ইউরোপিয়নদের মতে চার হাজারের অধিক। ধেয়ে এসে এই অশ্বারোহীরা সবদিক ছড়িয়ে গিয়ে এমন তীব্র আক্রমণ করে বসে যে, মুহূর্ত মধ্যে প্রলয় ঘটে যায়। রক্তের বন্যা বইতে শুরু করে। খৃস্টান সৈনিকরা মোকাবেলার অবস্থায় ছিলো না। এখনো তারা বুঝেই ওঠতে পারেনি যে, হচ্ছেটা কী এবং আক্রমণগুলো কোথা থেকে আসছে। তাকবীর ধ্বনি থেকে প্রমাণ মিলছে, তারা মুসলমান। আল-আদিলের আরোহী সৈন্যরা খৃস্টানদের অবরোধ ভেঙে যে-ই মোকাবেলায় আসে, তাকেই ঘোড়ার পদতলে দলিত করে কিংবা তরবারী ও বর্শার নিশানা বানিয়ে দুর্গের দিকে বেরিয়ে যায়। কমান্ডারদের আহ্বানে তারা পেছন দিকে মোড় ঘুরিয়ে আবার ঘোড়া হাঁকায়। তারা পুনরায় ছুটে গিয়ে খৃষ্টানদের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে চলে যায়।
