আমি যদি পিছপা হতে গিয়ে প্রাণ হারাই- আরেক সৈনিকের উদ্দীপ্ত কণ্ঠ- তাহলে আমার অসিয়ত আমার লাশ দাফন না করে শকুন নেকড়ের জন্য ফেলে রাখবেন।
এবার একসঙ্গে কয়েকটি কণ্ঠ গর্জে ওঠে। প্রতিটি কণ্ঠেই চেতনার জোশ। আল-আদিলের বুকটা প্রশস্ত হয়ে যায়। তিনি বললেন- দুশমন তোমাদের পেছনে আসছে। তোমাদেরকে প্রমাণ করতে হবে, রামাল্লার জয়ই তাদের শেষ জয়। আজ রাত এবং আগামী দিন পরিপূর্ণ বিশ্রাম নাও। আগামী রাত পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা পাবে।
আল-আদিল পাথরের উপর থেকে নেমে আসেন। সালার ও কমান্ডারদের তাঁবুতে ডেকে এনে নির্দেশনা প্রদান করেন।
খৃস্টানরা দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। এটি বল্ডউইনের বাহিনী। তার জানা আছে সম্মুখে হামাতের দুর্গ এবং আল-আদিলের বাহিনী সেখানেই অবস্থান করছে। তিনি গুপ্তচর মারফত এ তথ্যও পেয়েছেন, যে বাহিনীটি হামাতের দিকে সরে গেছে, তার কমান্ডার আল-আদিল এবং আল-আদিল সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাই। একজন সাধারণ সৈনিকও বুঝতে পারে, পরাজিত বাহিনী তার নিকটবর্তী দুর্গেই আশ্রয় গ্রহণ করবে।
বল্ডউইন দ্রুত অগ্রসর হয়ে হামাতের দুর্গ অবরোধ করে ফেলেন। তিনি ঘোষণা দেন, দুর্গের ফটক খুলে দাও। অন্যথায় দুর্গটাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবো। তার ধারণা, আল-আদিলের বাহিনী যুদ্ধ করার অবস্থায় নেই। কিন্তু তার ঘোষণার জবাবে দুর্গের পাঁচিলের উপর থেকে তীর বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়।
বল্ডউইন পুনরায় ঘোষণা দেন, এই খুনাখুনি অনর্থক। তোমরা লড়াই করতে পারবে না। দুর্গ আমাদের হাতে তুলে দাও। আমি ওয়াদা দিচ্ছি, একজন বন্দির সঙ্গেও অন্যায় আচরণ করা হবে না।
দুর্গের উপর থেকে আওয়াজ আসে—
তোমরা এতটুকু দূরে থাকো, যে পর্যন্ত আমাদের তীর পৌঁছুতে না পারে। তোমাদের না দিয়ে বরং দুৰ্গটা আমরা নিজেরাই গুঁড়িয়ে ফেলবো। আমাদের রক্ত অনর্থক ঝরবে না। তোমরাই বরং উদ্দেশ্যহীন মৃত্যুবরণ করবে।
ঘোষক ক্রুসেডার বাহিনীর অবস্থাটা দেখতে পায়। যেনো সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ চারদিক থেকে দুর্গটাকে গ্রাস করে রেখেছে। তার মোকাবেলায় দুর্গে যে সৈন্য আছে, তা না থাকারই সমান। কিন্তু এই স্বল্পসংখ্যক সৈন্যের কমান্ডার অস্ত্র সমর্পণ করতে প্রস্তুত নয়।
সূর্য অস্ত্র যাচ্ছে। খৃস্টানরা পরবর্তী কর্মসূচি ভোর পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেছে। তাদের বাহিনী দ্রুতগতিতে পথ চলে এসেছে। সবাই ক্লান্ত। এটি পশ্চাদ্ধাবন। বল্ডউইন এই চেষ্টায় রত যে, তিনি আল-আদিলকে কোথাও বিশ্রাম করার এবং বাহিনীকে নতুনভাবে সংগঠিত করার সুযোগ দেবেন না। তিনি আল-আদিলকে জীবিত ধরতে চাচ্ছেন। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ভাই হওয়ার কারণে আল-আদিল অত্যন্ত মূল্যবান কয়েদি। তাঁর বিনিময়ে খৃস্টানরা সুলতান আইউবীর নিকট থেকে কঠিন শর্ত আদায় করে নিতে পারে। বল্ডউইনের পরিপূর্ণ আশা, তিনি দুর্গের বাহিনী ও আল আদিলকেসহ দুৰ্গটা নিয়ে নিতে পারবেন।
***
বল্ডউইন তার বাহিনীকে দুর্গ থেকে এতোটুকু পেছনে সরিয়ে নিয়ে গেছেন যে, দুর্গওয়ালাদের তীর সে পর্যন্ত পৌঁছছে না। বাইরে থেকে কোনোবাহিনী তার উপর আক্রমণ চালাতে পারে এমন আশঙ্কা তার নেই। সুলতান আইউবী এখানে নেই। নেই তাঁর কোন বাহিনীও। হামাত দুৰ্গটাকে নিজের পায়ের তলেই দেখতে পাচ্ছে বল্ডউইন।
সন্ধ্যার পর পর তিনি তার কমান্ডারদেরকে আগামী দিনের কর্মসূচি পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে নিজ তাঁবুতে ফিরে যান। তাবুটা ফৌজ থেকে সামান্য দূরে পেছনে। সে যুগের রাজা-বাদশাহদের তবু শীশমহল থেকে কম হতো না। বল্ডউইন তত বিজয়ী সম্রাট। তিন চারটি রূপসী খৃস্টান মেয়ে তার সঙ্গে আছে। চারটি মুসলমান মেয়েও আছে। এই মেয়েগুলোকে খৃষ্টান কমান্ডাররা বিজিত অঞ্চল থেকে ধরে এনে বল্ডউইনকে উপহার দিয়েছিলো। মেয়েগুলো আরবের রূপের রাণী।
খৃস্টান মেয়েরা এই মুসলিম মেয়েগুলোকে বুঝিয়েছে, তোমাদের ক্রন্দন ও মুক্তির জন্য ছটফট করা অর্থহীন। তাদেরকে বলা হয়েছে, তোমাদের সৌভাগ্য যে, তোমরা ক্রুশের একজন সম্রাটের ভাগে পড়েছে। তারা বুঝায়
শেষ পর্যন্ত তোমাদেরকে কোনো মুসলিম আমীর কিংবা শাসকের হেরেমে যেতেই হতো, যেখানে তোমাদেরকে কয়েদির মতো থাকতে হতো। দু-চার বছর পর যখন তোমাদের যৌবনের আকর্ষণ কমে যেতো, তখন তোমাদেরকে কোনো সওদাগরের কাছে বিক্রি করে দেয়া হতো। যদি তোমরা তোমাদেরই সৈনিকদের হাতে পড়তে, তাহলে তারাও তোমাদের সেই দশা-ই ঘটাতো, যা আমাদের সৈন্যরা ঘটাচ্ছে। নারীর কোনো ধর্ম থাকে না। যখন যার সঙ্গে বিয়ে হয়, সে-ই তার খোদা, সে-ই তার ধর্ম হয়ে যায়। এমতাবস্থায় তোমাদের সেই মানুষটির কাছে থাকতে আপত্তি কোথায়, যিনি রণাঙ্গনের সম্রাট, একটি রাষ্ট্রের ও কোটি মানুষের হৃদয়ের রাজা!
মেয়েগুলো প্রথম দিনটি খুব ছটফট করে কাটায়। তাদের উপর কোনো অত্যাচার করা হয়নি। কোনো ভয়-ভীতিও দেখানো হয়নি। রউইন তাদের রূপ-যৌবন দেখে তার হাই কমান্ডের সেনাপতিদের বললেন, মেয়েগুলোকে প্রশিক্ষণ দিয়ে উত্তম পন্থায় ব্যবহার করা যেতে পারে। এমন মূল্যবান মেয়েগুলোকে ভোগ-বিলাসিতার উপকরণ বানিয়ে নষ্ট করা ঠিক হবে না। তিনি মেয়েগুলোকে নিজের কাছে রেখে দেন।
