ইসরাইলের হঠকারিতা আর আরব দুনিয়ার নীরবতা-নির্জীবতা প্রমাণ করছে, ইসরাইল এই অঞ্চলটির দখল ছাড়বে না এবং ছাড়তে বাধ্য হবে না। কিন্তু আটশত বছর আগে যখন রামাল্লা খৃস্টানদের দখলে চলে গিয়েছিলো, তখন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী একটি দিনের জন্যও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেননি। তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক কষ্টে জীবন রক্ষা করেছিলেন। শোচনীয় পরাজয় বরণ করে তাঁর বাহিনী পিছপা হয়ে সোজা মিসরের দিকে মুখ করতে বাধ্য হয়েছিলো। বিপুলসংখ্যক সৈন্য খৃস্টানদের হাতে বন্দি হয়েছিলো। কিছু সৈন্যরা উপায়-উপকরণ ব্যতীত কায়রো যেতে গিয়ে পথেই প্রাণ হারিয়েছিলো। এরূপ পরাজয় একটি বাহিনীর মনোবল ও উদ্দীপনা ভেঙে দিয়ে থাকে। নিজেদের সামলে নিতে নিতে চলে যায় বহু সময়- বছরের পর বছর। কিন্তু সুলতান আইউবী মিসর পৌঁছে শুধু আত্মসংবরণই করেননি। অল্প কিছুদিনের মধ্যে অভাবনীয়রূপে সেই এলাকায় ফিরে যান, যেখানে তিনি পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছিলেন। তিনি ক্রুসেডারদের যম হয়ে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করেন।
রামাল্লা আজ আবারো সালাহুদ্দীন আইউবীর অপেক্ষা করছে।
সুলতান আইউবীর সম্মুখে কাজ শুধু এটুকুই নয় যে, পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে হবে এবং ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করতে হবে। তাঁকে বহু বিপদ-শঙ্কা ও সমস্যা বেষ্টন করে রেখেছে। তাঁর সারিতে বিশ্বাসঘাতকদের অভাব নেই। সুদানের দিক থেকে আক্রমণ আশঙ্কা বেড়ে গেছে। সুদানীদের জানা আছে, আইউবীর কাছে ফৌজ নেই। যে কজন আছে, তারা পরাজিত ও আহত। বিপরীতে ক্রুসেডারদের সৈন্য দশগুণ বেশি। রামাল্লার জয় তাদের মনোবল ও উন্মাদনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আরেকটি আশঙ্কা, সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধবাদী আমীরগণ তার এই পরাজয়কে কাজে লাগাতে পারে। তারা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে সুলতান আইউবীর সেই বাহিনীটির জন্য আপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যাদের তিনি রণাঙ্গনে রেখে এসেছেন। সেই বাহিনীর প্রধান সেনানায়ক সুলতানের ভাই আল-আদিল, যার উপর তার পূর্ণ আস্থা আছে।
একটি শঙ্কা খৃষ্টান গোয়েন্দাদেরও। পিছপা হওয়ার সময় মিসরী সৈন্যের বেশে খৃস্টান গোয়েন্দাদেরও মিসরে ঢুকে যাওয়া সহজ ছিলো। এ সুযোগটা তারা অবশ্যই গ্রহণ করেছে। তারা মিসরে গুজব ছড়িয়ে জনগণের মনোবল ভেঙে দিতে পারে।
রামাল্লার পরাজয়ের পর আল-আদিল হামাত পর্যন্ত সরে এসেছিলেন। এই স্থানটিতেই সুলতান আইউবী তার প্রতিপক্ষ মুসলিম আমীরদের পরাজিত করেছিলেন। হামাতে দুর্গও আছে। খৃস্টানরা সুলতান আইউবীকে পরাজিত করে হামাতের দিকে এগিয়ে যায়। আল-আদিল নিজেও একজন সালার এবং এখন তাঁর সঙ্গে যেসব সালার আছে, তাঁরাও দুঃসাহসী মুজাহিদ। তাদের দীন ও ঈমান সুলতান আইউবীরই ন্যায় পরিপক্ক। আল আদিল স্বীয় ভাই আইউবীর শিষ্য। তারই নিকট থেকে যুদ্ধকৌশল রপ্ত করেছেন। বিচক্ষণ ও দূরদর্শিতার বলে তিনি বুঝে ফেলেন, এমন একটি সহজ ও বিশাল জয়ের পর ক্রুসেডাররা রামাল্লায় বসে থাকবে না। তিনি পেছনে ছদ্মবেশে গোয়েন্দা রেখে দুটি ফৌজ নিয়ে হামাত অভিমুখে রওনা হন। তিনি জেনে ফেলেছেন, সুলতান আইউবী মিসর চলে গেছেন।
আল-আদিলের অনুমান সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। গোয়েন্দারা তাঁকে সংবাদ প্রদান করে, খৃস্টান বাহিনী হামাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আল আদিল তার বাহিনীর অবস্থা আঁচ করেন। ভালো নয়। সৈনিকদের মনোবল ভেঙে গেছে। উট-ঘোড়ার সংখ্যাও কমে গেছে। রসদের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। তবে তিনি ফৌজকে খুবই উপযুক্ত একটি স্থানে নিয়ে এসেছেন। সবুজ পাহাড়ি এলাকা। পানি আছে। তিনি সৈনিকদেরকে এক স্থানে সমবেত করে নেন। তিনি দেখলেন, অধিকাংশ উট আহত। গুরুতর আহত উটগুলোকে জবাই করিয়ে ফৌজকে বলে দেন, পেট পুরে গোশত খাও। এভাবে একটি প্রশস্ত অঞ্চলে রাতটাকে তিনি উৎসবের আমেজে ভরে দেন। তিনি সন্ধ্যায়ই হাল্ব ও দামেশকে দূত প্রেরণ করেন যে, যতো পারো রসদ, পশু ও অস্ত্র প্রেরণ করো।
রাতের বেলা। সৈন্যরা উটের গোশত খেয়ে পরিতৃপ্ত। আল-আদিল একটি পাথরের উপর উঠে যান। তাঁর ডানে ও বাঁয়ে দু ব্যক্তি প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি উচ্চকণ্ঠে ভাষণ দিতে শুরু করেন
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মুজাহিদগণ! তোমরা এই বাস্তবতাকে মেনে নাও, আমরা পরাজিত হয়ে এসেছি। তোমরা কি এই পরাজিত অবস্থায়-ই মা-বোন, স্ত্রী-কন্যাদের নিকট ফিরে যাবে এবং বলবে, আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দুশমনের হাতে পরাজিত হয়ে এসেছি? তোমাদের মায়েরা কি দুধের দাবি ক্ষমা করবেন? তারা ঘরে বসে সংবাদের অপেক্ষা করছেন, আমরা প্রথম কেবলাকে কাফেরদের কজা থেকে মুক্ত করেছি কিনা! তারা জানে, আমাদের বে-দখল অঞ্চলগুলোতে কাফেররা মুসলিম নারীদের লাঞ্চিত করছে। ভেবে দেখো, তোমরা তোমাদের মা-বোনদেরকে কী জবাব দেবে। তোমাদের যারা এখান থেকেই পেছনে কেটে পড়তে চাও, তারা মজলিস থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়াও। আমি তাদেরকে বাঁধা দেবো না। তাদের জন্য বাড়ি-ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুমতি আছে।
আল-আদিল থেমে যান। সমবেত সৈনিকরাও নীরব। একজন সৈনিকও আলাদা হলো না। প্রত্যেকে আপন আপন স্থানে বসে আছে।
সালারে আলা!- এক সৈনিক দাঁড়িয়ে গর্জে ওঠে বললো আমাদেরকে কী করতে হবে বলুন। আপনাকে কে বলেছে, আমরা যুদ্ধ পরিত্যাগ করে বাড়ি চলে যেতে চাই?
