এ বিজয়গুলো ছিলো অপেক্ষাকৃত সহজ। তাতে, মিসর থেকে আসা নতুন সৈনিকদের মনোবল বেড়ে যায়। তারা বুঝে নেয়, যুদ্ধ এভাবেই হয়ে থাকে, যাতে বিজয় আমাদেরই হয়। নতুন সৈনিকরা অসতর্ক হয়ে ওঠে। খৃস্টানরা সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবে পিছপা হয়ে সুলতান আইউবীকে ধোঁকা দিয়েছিলো। তারা অল্প কজন সৈন্যের মহড়া দিয়েছিলো মাত্র। এরা ফিরিঙ্গি। রেনাল্ট ও বল্ডউইনের বাহিনী এখনো সম্মুখে আসেনি। তারা উক্ত এলাকাতেই অবস্থান করছে। এখন খৃস্টানরা এমন শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে যে, সুলতান আইউবীর গুপ্তচররা শত্রুর এলাকা থেকে বেরই হতে পারছে না। ত্রিপোলীর গোয়েন্দার পর ওদিক থেকে আর কেউ আসতেই পারেনি।
রামাল্লার সন্নিকটে একটি নদী আছে। পানি গভীর না হলেও নদীটা বেশ গভীর ও চওড়া। ঈসা এলাহকারী রামাল্লা জয় করে তার বাহিনীকে রামাল্লার আশপাশে ছড়িয়ে দেন। নদীর তীরের আড়াল থেকে খৃস্টান বাহিনী এমনভাবে বেরিয়ে আসে, যেনো পানির স্রোত কূলের বাইরে চলে এসেছে। আল্লাহ জানেন, এই বাহিনী কবে থেকে ওখানে লুকিয়ে বসে ছিলো। ঈসা এলাহকারীর বাহিনী অসতর্কতা হেতু মারা পড়ে। তারা বিক্ষিপ্ত ছিলো। ফলে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়নি। ত্রিপোলীর গোয়েন্দার রিপোর্ট নির্ভুল প্রমাণিত হলো যে, খৃস্টানরা এমন কৌশল অবলম্বন করবে, যার ফলে সুলতান আইউবীর বিশেষ রণকৌশল অকার্যকর হয়ে পড়বে।
তৎকালের এক ঐতিহাসিক ইবনে আর্সীর লিখেছেন- ফিরিঙ্গিরা নদীর দিক থেকে এমনভাবে আত্মপ্রকাশ করে, যেনো মানুষ আর ঘোড়ার প্লাবন কূল অতিক্রম করে বাইরে এসে জনবসতিগুলো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সুলতান আইউবীর বাহিনী অসতর্ক অবস্থায় পুরোপুরি ঘেৰাওয়ে চলে আসে।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক জেমস লিখেছেন- সম্রাট বল্ডউইন সালাহুদ্দীন আইউবীর আগেই তার বাহিনীকে রামাল্লার উপকণ্ঠে নিয়ে এসেছিলেন। আইউবীর বাহিনী রামাল্লা জয় করার পর বল্ডউইনের এক সালার শহরে আগুন ধরিয়ে দেয়। খৃষ্টানদের কৌশল সফল হয়। আইউবী ঘেরাওয়ে এসে পড়েন। তার বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তিনি কয়েকিট ইউনিটকে একত্রিত করে বিশেষ পদ্ধতিতে জবাৰী আক্রমণ করেন। কিন্তু ময়দান খৃস্টানদের হাতেই থাকে। আইউবীর হামলা ব্যর্থ হয়। এমনকি তার পক্ষে পেছনে সরে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সুলতান আইউবীর নতুন সৈনিকরা- যারা কয়েকটি স্থানে সহজে সাফল্য অর্জন করে ভেবে বসেছিলো, তাদেরকে কেউ পরাজিত করতে পারবে না- এমনভাবে পলায়ন করে যে, তারা মিসরের উদ্দেশ্যেই রওনা হয়ে যায়। পলায়নকারীদের মধ্যে তাদের সংখ্যাই বেশি, যাদেরকে অদূরদর্শী সেনা অফিসারগণ গনীমতের প্রলোভন দেখিয়ে ভর্তি করেছিলেন। সবচে বড় কারণ, এরা অনভিজ্ঞ। পরিশেষে সুলতান আইউবীর অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, তিনি একটি উটের পিঠে চড়ে রণাঙ্গন থেকে বেরিয়ে যান এবং নিজের জীবন রক্ষা করেন।
কাজি বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ- যিনি এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তাঁর রোজনামচায় লিখেছেন–
সুলতান আইউবী আমাকে এই যুদ্ধের পরাজয়ের কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন- খৃস্টানরা আমারই কৌশল প্রয়োগ করে আমার বাহিনীকে সেই সময় রণাঙ্গনে টেনে আনে, তখনো আমি তাদেরকে যুদ্ধের বিন্যাসে সাজাতে পারিনি। আরেক কারণ, আমার বাহিনীর উভয় পার্শ্বে যে ইউনিটগুলো ছিলো, তারা পরিকল্পনাবিহীন স্থান পরিবর্তন করতে থাকে। তাদের মধ্যে কোন সাবধানতা ছিলো না। এই সুযোগে শত্রুরা তাদের উপর আক্রমণ করে বসে। সেই আক্রমণ এতোই তীব্র ও আকস্মিক ছিলো যে, আমার নতুন যোদ্ধারা ভীত হয়ে পেছনে পালিয়ে যায় এবং মিসরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। তারা পথ হারিয়ে ফেলে এবং এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। আমি তাদেরকে একত্রিত করতে ব্যর্থ হই। দুশমন আমার বাহিনীর বহু সৈনিকদের বন্দি করে ফেলে। তন্মধ্যে ঈশা এলাহকারীও ছিলেন।
সুলতান আইউবী তাঁর সৈনিকদেরকে জীবনহানি ঘটানোর পরিবর্তে নির্দেশ প্রদান করেন, যার যার মতো ময়দান থেকে সরে যাও এবং কায়রো পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করো।
খৃস্টানদেরকে ষাট হাজার দিনার পণ আদায় করে সুলতান আইউবী সালার ঈশা ইলাহকারীকে ছাড়িয়ে আনেন। এক মিসরী ঐতিহাসিক মোহাম্মদ আল ওয়াহদীদ লিখেছেন- সুলতান আইউবী স্বীয় ভাই শামসুদ্দৌলা তুরান শাহকে এই যুদ্ধ এবং নিজের পরাজয়ের চিত্র লিখেছিলেন। তাতে তিনি একটি আরবী পংক্তিও লিখেছেন, যার মর্ম নিম্নরূপ
আমি তোমাকে এমন সময়ে স্মরণ করলাম, যখন খৃস্টানদের অস্ত্র কাজ করে চলছে। শত্রুর সরল ও গৌর বর্ণের বর্শাগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করে রক্ত পান করে ফিরছে।
যুদ্ধটা হয়েছিলো ৫৭৩ হিজরীর (১১৭৬ খৃস্টাব্দে) জুমাদাল আউয়ালে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী যখন কায়রোতে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর মাথাটা অবনত। সঙ্গে কোনো সৈন্য নেই। নেই একজন দেহরক্ষীও।
কায়রো পৌঁছেই সুলতান আইউবী পুনরায় সেনাভর্তির নির্দেশ দেন। তিনি সিরিয়ার রণাঙ্গনে স্বীয় ভ্রাতা আল-আদিলকে এবং যোগ্যতম সালারদেরকে হামাত রেখে এসেছেন।
৬.৪ দরবেশ
দরবেশ
রামাল্লা। আজকের ইসরাইল কবলিত এই রামাল্লায়-ই খৃস্টানদের হাতে পরাজয়বরণ করেছিলেন সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী। বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে দশ মাইল দূরে উত্তরে জর্ডানে অবস্থিত এই রামাল্লা। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইল জর্ডানের এই এলাকাটি দখল করে নিয়েছিলো। জর্ডান নদীর পশ্চিমতীরে ইসরাইলী সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাটা। অঞ্চলটি এখনো ইসরাইলের দখলে। তারা ঘোষণা দিয়েছে, পৃথিবীর কোন শক্তি এই অঞ্চলটি তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। রামাল্লা এবং অন্যান্য অধিকৃত অঞ্চলকে সেদিনও তারা বধ্যভূমি বানিয়েছিলো এবং আজো সেগুলো বধ্যভূমিই রয়ে গেছে। রামাল্লার মুসলমানরা ইসরাইলের এই অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে আর ইসরাইল তাদের রাইফেলের গুলি দ্বারা মুসলমানদের দমন করছে।
