সুলতান আইউবী টিলার উপর থেকে নীচে নেমে একদিকে হাঁটতে শুরু করেন। হঠাৎ দেখতে পান, দূরে একস্থানে ধূলি উড়ছে, যা একটি কিংবা দুটি ঘোড়ার ধূলি হবে। সুলতান দাঁড়িয়ে যান। ধূলি ও সুলতানের মাঝে দূরত্ব কমতে থাকে। দুটি ঘোড়া তার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে যায়। একটির আরোহী আলী বিন সুফিয়ান। অপরজন ত্রিপোলী থেকে ইমামের প্রেরিত গোয়েন্দা। সুলতান তাকে চেনেন না। লোকটি উটের পিঠে করে বেশ কদিনে কায়রো গিয়ে পৌঁছে। আলী বিন সুফিয়ান তার থেকে রিপোের্ট নিয়ে তাকে একটি ঘোড়া দিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন।
গোয়েন্দা সুলতান আইউবীকে জানায়- খৃস্টানরা ইসলামী দুনিয়ার উপর চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। সেনা সমাবেশ শুরু হয়ে গেছে। খুনিনের সম্রাট রেনাল্টের সৈন্যসংখ্যা সবচে বেশি। তিনি মহাযুদ্ধের নেতৃত্ব দিতে চাচ্ছেন।
সেই রেনাল্ট, যাকে মুহতারাম নুরুদ্দীন জঙ্গী (রহ.) গ্রেফতার করে বন্দি করেছিলেন- সুলতান আইউবী বললেন- জঙ্গী তাকে শর্তের ভিত্তিতে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জঙ্গীর অকাল মৃত্যু রেনাল্টের শর্তহীন মুক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতা আর সোনা-জহরতের লোভী আমীরগণ নুরুদ্দীন জঙ্গীর অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্রকে পুতুল শাসক বানিয়ে রেনাল্টকে মুক্তি দিয়ে দেয়। আজ সেই রেনাল্ট ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য আসছে। …আচ্ছা, তারপর বলো। আক্রমণ তাদের করারই কথা। আর কে থাকবে?
ত্রিপোলীর সম্রাট রেমন্ড- গোয়েন্দা বললো- অধিকতর সৈন্য সমাবেশ সেখানেই হচ্ছে। আক্রমণের বিস্তারিত সেখানেই স্থির হচ্ছে। তৃতীয়জন বল্ডউইন। তার সৈন্যও কম নয়। তবে তারা কবে নাগাদ রওনা হবে, জানা যায়নি। আক্রমণ হবে সিরিয়ার উপর। হাল্ব, হাররান ও হামাতের নামও শোনা যাচ্ছে। অভিযানটা খুব তাড়াতাড়ি হবে।
আলী বিন সুফিয়ান- সুলতান আইউবী বললেন- আমি ত্রিপোলীর সর্বশেষ সংবাদের অপেক্ষায় থাকবো।
না- আপনি আর কোনো সংবাদের অপেক্ষায় থাকবেন না- আলী বিন সুফিয়ানের পরিবর্তে ত্রিপোলী থেকে আসা গোয়েন্দা উত্তর দেয়- খৃস্টানদের সামরিক শাখায় আমাদের দুজন লোক ছিলো। দুজনই মারা গেছে।
গোয়েন্দা সুলতান আইউবীকে রাশেদ চেঙ্গিস ও ভিক্টরের কাহিনী শোনায়। সুলতান আইউবীর চোখ লাল হয়ে যায়। গোয়েন্দা বললো রেনা দাবি করছেন, তার বাহিনীতে দুইশত পঞ্চাশজন নাইট থাকবে। আমাদের উক্ত দুই গোয়েন্দা মৃত্যুর আগে ইমামকে জানিয়েছিলো, খৃষ্টানরা আপনাকে অতর্কিত গেরিলা আক্রমণ পদ্ধতি প্রয়োগের সুযোগ দেবে না। তারা এমন কৌশল অবলম্বন করবে, আপনি তাদের মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য হবেন। আপনার সৈন্য কম এই দুর্বলতা তাদের জানা আছে। আপনি যাতে ঘুরে-ফিরে লড়াই করতে না পারেন, এই লক্ষ্যেই তারা অধিক সংখ্যক সৈন্য নিয়ে আসছে।
এই গোয়েন্দা রিপোর্টের পর সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীকে এখন বাইরে তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। তিনি কক্ষবদ্ধ হয়ে থাকতে শুরু করেছেন। কাগজে সম্ভাব্য রণাঙ্গনের নকশা এঁকে তার উপর অগ্রযাত্রা ও অন্যান্য কৌশলের দাগ টানছেন। যোগ-বিয়োগ দিয়ে হিসাব মেলাচ্ছেন। কখনো হঠাৎ সালারদের ডেকে তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। সেই সালারদের একজন হলেন ঈসা এলাহকারী ফকীহ, যিনি যোগ্য সেনা অধিনায়ক হওয়ার পাশাপাশি বড় মাপের একজন আলেম এবং ইসলামী আইন বিশারদও। কোনো কোনো ঐতিহাসিক তাকে সুলতান আইউবীর ডান হাত বলে অভিহিত করেছেন।
কথা নেই, বার্তা নেই হঠাৎ একদিন সুলতান আইউবী রওনা হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বসেন। বাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশকে তিনি সুদানের সীমান্ত ঘেঁষে ছাউনি ফেলতে নির্দেশ দেন। কারণ, ওদিকে থেকেও আক্রমণ আসার সম্ভাবনা আছে। সুলতান আইউবীর জন্য সবচে বড় আপদ হলো, তিনি যখন কোনো অভিযানে রওনা হন, তখন পেছনেও শত্রু থেকে যায়। খৃস্টানদের জন্য তিনি মিসরের সকল সৈন্য নিয়ে যেতে পারেন না। এবার যখন তিনি রওনা হন, ঐতিহাসিকদের পরিসংখ্যান মোতাবেক তখন তার সঙ্গে সৈন্য ছিলো এক হাজার পদাতিক। এরা সকলে আযাদকৃত দাস। তবে যুদ্ধবাজ। আর ছিলো আট হাজার অশ্বারোহী, যাদের কেউ মিসরী, কেউ সেই সুদানী, যাদেরকে ১১৬৯ সালে সুলতান আইউবী বিদ্রোহের অপরাধে সেনা বাহিনী থেকে বহিষ্কার করে উর্বর জমি দান করে পুনর্বাসিত করেছিলেন। এখন তারা মিসরের অফাদার ও নির্ভরযোগ্য। কিন্তু এই এক হাজার পদাতিক সৈন্য নিতান্তই নতুন। তারা এখনো যুদ্ধ করেনি, যুদ্ধ। দেখেনি। তাদের প্রশিক্ষণও শেষ করা হয়েছে তাড়াহুড়ো করে।
সুলতান আইউবী তার বাহিনীকে স্বীয় ভাই আল-আদিলের কমান্ডে হাবের উপকণ্ঠে রেখে এসেছিলেন। তার অনুমান ছিলো, খৃস্টানরা এতো তাড়াতাড়ি সিরিয়া এসে পৌঁছবে না। তিনি দ্রুত রওনা হয়ে হাল্ব পৌঁছে যান। সেখানে পৌঁছে সংবাদ পান, খৃষ্টানরা হাররান দুর্গকে অবরোধ করে রেখেছে। সুলতান অবরোধকারী খৃস্টান সৈন্যদেরকে ঘিরে ফেলেন। তাঁর এই কৌশলটা এতোই আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত ছিলো যে, খৃস্টানরা শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হলো না। সুলতান বহু শত্রুসেনাকে গ্রেফতার করেন এবং খৃস্টানদের অনেক ক্ষতিসাধন করেন। তিনি অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখেন এবং দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান লিড্ডিয়া ও রামাল্লা দখল করে নেন।
