আমি দুজন মানুষের খুনের দায় স্বীকার করতে এসেছি- ভিক্টর বললো- আমাকে গ্রেফতার করুন।
অফিসার ভিক্টরের মুখে সজোরে একটা চপেটাঘাত মেরে বললেন- খুন করার আর সময় পাওনি? দিনে করলে না কেননা? আমি কি তোমার বাপের চাকর যে, এখন তোমাকে গ্রেফতার করবো? আমার গভীর সুখ নিদ্রাটা তুমি বরবাদ করে দিয়েছো! পরক্ষণে চাকরকে বললেন- যাও, একে নিয়ে কয়েদখানায় বন্দি করে রাখো।
চাকর ভিক্টরকে বাহুতে ধরে হাঁটতে শুরু করলে অফিসার গর্জন করে বলে ওঠলেন- দাঁড়াও, থামো জংলী কোথাকার! ভেবে দেখলে না লোকটা তো পথে তোমাকেও খুন করে ফেলতে পারে। ভেতরে নিয়ে আসো। শুনি কী করেছে।
আমি একজন পুরুষ এবং একজন মহিলাকে হত্যা করেছি স্যার! ভিক্টর উচ্চকণ্ঠে বললো।
হত্যা করেছো?- অফিসার চমকে ওঠে জিজ্ঞেস করে- হত্যা করেছে? যদি কোনো মুসলমানকে হত্যা করে থাকো, তাহলে যাও নিজের ব্যান্ডেজ চিকিৎসা করাও। তুমি তাকে খুন না করলে নিশ্চয়ই সে তোমাকে খুন করে ফেলতো। আর যদি কোনো খৃস্টানকে খুন করে থাকো, তাহলে তোমাকেও খুন হতে হবে। ভেতরে এসে খুলে বলল কী ঘটেছে।
আপনি আমার সঙ্গে অতিশয় সুদর্শন এক যুবককে দেখে থাকবেন ভিক্টর ভেতরে গিয়ে বসে বললো- একটি মেয়ের সঙ্গে আমার প্রেম ছিলো। আমার সেই বন্ধু মেয়েটিকে ফুসলিয়ে আমার সাথে তার সম্পর্ক ভেঙে দেয়। নিজে তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তার দ্বারা আমাকে অপদস্ত করায়। কিন্তু আমি হাল ছাড়তে চাইনি। দুজনে মিলে আমাকে অনেক যন্ত্রণা দেয়। আজ রাতে আমি তাদেরকে একসঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় বসে থাকতে দেখে ফেলি। আমি মূলত তাদের দেখতেই গিয়েছিলাম। তাদেরকে এমন অবস্থায় দেখলাম যে, আমি সহ্য করতে পারলাম না। আমি মেয়েটির উপর আক্রমণ করে বসি এবং তাকে খঞ্জরের আঘাতে হত্যা করে ফেলি। তারপর আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে আমার সংঘাত হয়। সে আমাকে দুটি আঘাত করে। আমিও তাকে দুটি আঘাতই করেছিলাম। কিন্তু আঘাত ছিলো গুরুতর। সেও মারা যায়। আমি কোথাও পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আপনার নিকট এসে পড়েছি।
নারীর জন্য খুন করা এবং খুন হওয়া কোনোটিই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অফিসার বললেন।
ঘটনাটিকে অফিসার মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না। এই মুহূর্তে কথা শুনতেই তার ভালো লাগছে না। চোখে তার রাজ্যের ঘুম। কে খুন হলো আর কে খুন করলো, সেদিকে তার কোনোই ভ্রূক্ষেপ নেই। ভিক্টরকে তিনি ছেড়েই দিতেন বোধ হয়। কিন্তু ততোক্ষণে ভোর হয়ে গেছে। লাশ দুটো দেখা হলো।
আসল ঘটনা জানতে পেরে হারমান ও তার নায়েব ক্ষোভে পাগলের মতো হয়ে যান। নিহত মেয়েটি অত্যন্ত মূল্যবান ও সক্রিয় গুপ্তচর ছিলে আর চেঙ্গিস ছিলো তার শিকার, যার মাধ্যমে তার পুরো দলের সন্ধান বের করার পরিকল্পনা ছিলো। তাদের সব পরিকল্পনা ও অর্জন শেষ হয়ে গেলো। সেই সঙ্গে মূল্যবান গোয়েন্দা মেয়েটিকেও হারাতে হলো।
ভিক্টরের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে। কেউ তার ব্যান্ডেজ-চিকিৎসার কথা ভাবলো না। হারমান তাকে প্রহার করতে শুরু করেন। মার খেয়ে ভিক্টর অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তারপর আর কখনো তার জ্ঞান ফিরে আসেনি। পরদিন অচেতন অবস্থায়ই তাকে জল্লাদের হাতে তুলে দেয়া হলো। জল্লাদ কুড়ালের এক আঘাতে তার মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
যে সময়ে ভিক্টরের মাথা ও দেহকে একটি গর্তে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছিলো, ঠিক তখন ইমামের প্রেরিত এক গোয়েন্দা ত্রিপোলী থেকে বহুদূর চলে গিয়েছিলো। তাকে উটের পিঠে চড়িয়ে পাঠানো হয়েছে। কায়রো পর্যন্ত সফর অনেক দীর্ঘ ও দুর্গম, যার ধকল একমাত্র উটই সহ্য করতে পারে।
***
৫৩৭ হিজরীর (১১৭৭ সাল) প্রথম দিকের ঘটনা। কায়রোর সামরিক এলাকায় অস্বাভাবিক জঁকজমক বিরাজ করছে। কোন মাঠে ঘোড়া ছুটাছুটি করছে। কোথাও পদাতিক সৈনিকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। কায়রো থেকে দূরে পার্বত্য এলাকার দৃশ্যটা এমন, যেনো সেখানে যুদ্ধ চলছে। এসব হলো, সুলতান আইউবীর বাহিনীর সামরিক মহড়া। এক উপত্যকায় দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ করে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। অশ্বারোহী সৈনিকরা ছুটে এসে বিশ-পঁচিশ গজ বিস্তৃত এই আগুনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একটি মহড়া দূরবর্তী বালুকাময় প্রান্তরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কোনো সৈনিকের সঙ্গে পানি রাখার অনুমতি নেই।
কঠিন এক প্রশিক্ষণ। এরা সকলে নবাগত যোদ্ধা। ভর্তি এখনো চলছে। ফৌজের সকল সালার ও অন্যান্য অফিসার এই প্রশিক্ষণদানে মহাব্যস্ত। সুলতান আইউবী সালতানাতের অন্যান্য কাজ ও সমস্যার প্রতি দৃষ্টি দেন রাতে। দিন কাটে তার প্রশিক্ষণের তত্ত্বাবধান ও সালারদের দিক-নির্দেশনা প্রদানের মধ্য দিয়ে। তিনি সকলকে বলে রেখেছেন, খৃস্টানরা যদি সিরিয়ার উপর আক্রমণ না করে, তার অর্থ হবে, তারা যুদ্ধ থেকে তাওবা করেছে কিংবা তাদের মস্তিষ্ক সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তার এই দুই ধারণার একটিও সঠিক নয়। তারা অবশ্যই আসবে।
এ সময় পর্যন্ত কোন না কোনো অধিকৃত এলাকা থেকে কারো না করো আসবার কথা ছিলো- সুলতান আইউবী পার্শ্বে দন্ডায়মান এক সালারকে উদ্দেশ করে বললেন। তখন তিনি একটি টিলার উপর দাঁড়িয়ে সামরিক মহড়া দেখছিলেন। তিনি বললেন- খৃস্টানরা অবশ্যই আসবে। গোয়েন্দারাই বলতে পারবে, তারা কোন দিক থেকে আসবে, কোথায় আসবে এবং তাদের সেনাসংখ্যা কতো হবে।
