তুমি ভালো করেছো- ইমাম বললেন- আমি তোমার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত। এখন তুমি ত্রিপোলী থেকে বেরিয়ে যাও। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
না- ভিক্টর বললো- রাত পোহালে সকলে চেঙ্গিস ও মেয়েটির লাশ দেখবে। আমার বিশ্বাস, হারমান জেনে ফেলেছেন চেঙ্গিস গোয়েন্দা ছিলো। তিনিই মেয়েটিকে তার পেছনে লাগিয়েছিলেন। তাই তিনি ধরে নেবেন এদেরকে মুসলমান গোয়েন্দারা খুন করেছে। তারপর এখানকার মুসলমানদের উপর কেয়ামত নেমে আসবে। আগেই নির্দেশ জারি হয়ে গেছে, কারো উপর চরবৃত্তির সন্দেহ হলে তাকে বন্দি কিংবা হত্যা করে ফেলবে। হারমান এখানকার প্রতিটি গৃহের উপর একজন করে গোয়েন্দা নিয়োগ করে রেখেছেন। তারা মুসলমানদেরকে টার্গেট বানানোর বাহানা খুঁজছে। আমি নিজের জায়গায় ফিরে যাচ্ছি। এই খুনের দায় আমি নিজে বহন করবো। কারণ বলবো, আমি আর চেঙ্গিস একই নারীর প্রেম-প্রত্যাশী ছিলাম।
তোমার থেকে আমরা এতো কুরবানী গ্রহণ করবো না- ইমাম বললেন আমি একজন লোক দেবো, যে তোমাকে কায়রো রেখে আসবে।
আমি আমার জীবনের কুরবানী দিতে চাই- ভিক্টর বললো- আমার শহরে খৃস্টান বাহিনীর দুজন অফিসার আমার এক বোনের প্রতি হাত বাড়িয়েছিলো। সে সময়টার কথা আমার স্মরণ আছে। তারা তাদের সৈনিকদেরকে আমার বোনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলো। কোন খৃস্টান আমার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। তিনজন মুসলমান যুবক খৃস্টান সৈন্যদের মোকাবেলা করেছিলো। তারা আহত হয়েছিলো। তবু তারা আমার বোনকে রক্ষা করেছে। খৃষ্টানদের উচ্চ পর্যায়ে ভালো একজন অফিসার ছিলেন। তিনি আমার অভিযোগ শুনেছিলেন। অন্যথায় শেষ পর্যন্ত আমার বোনও রক্ষা পেতো না, প্রতিরোধকারী মুসলিম যুবকরাও রেহাই পেতো না। এই ঘটনাটাই আমাকে মুসলমানদের গোয়েন্দায় পরিণত করেছে। আমি আপনার জাতিকে এই অনুগ্রহের প্রতিদান দিতে চাই। নিজের জীবনটা জল্লাদের হাতে তুলে দিয়ে আমি ত্রিপোলীর মুসলমানদের জীবন ও সম্মান রক্ষা করবো।
ভিক্টর ইমামকে জানায়- খৃস্টানরা সৈন্য সমাবেশ শুরু করেছে। তাদের গন্তব্য হাল্ব। প্রথমে তারা সিরিয়া জয় করার ইচ্ছা পোষণ করছে। তবে রওনা কবে হবে এখনো জানা যায়নি। এও জানা সম্ভব হয়নি, তাদের সকল সৈন্য একই এলাকার উপর আক্রমণ চালাবে, নাকি সামনে গিয়ে বিভক্ত হয়ে একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে হামলা করবে। এসব সংবাদ খুব তাড়াতাড়ি সুলতান আইউবীর কানে পৌঁছে যাওয়া দরকার, যাতে তিনি মিসরে বসে না থাকেন।
ভিক্টর যা কিছু জানতে পেরেছিলো, ইমামকে জানিয়ে দেয়। সে উঠে দাঁড়ায়। ইমাম যেতে নিষেধ করলে বললো- আপনি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনাকে কেউ ধরতে পারবে না।
ভিক্টর বেরিয়ে যায়।
***
ভিক্টরের ক্ষতস্থানের রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেছে। ইমাম তার জখম দুটোতে পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সে এই ভেবে পড়িগুলো খুলে ফেলে যে, যাদের নিকট যাচ্ছে, তারা জিজ্ঞেস না করে বসে ব্যান্ডেজ কে করে দিয়েছে?
পট্টি খুলে ফেলার পর আবার রক্তক্ষরণ শুরু হয়। চেঙ্গিস ও মেয়েটির লাশ যেখানে পড়ে আছে, ভিক্টর সেখানে এসে পৌঁছে। রাতের শেষ প্রহরের চাঁদ উপরে উঠে এসেছে। ভিক্টরের মদের সোরাহী ও দুটি পেয়ালার উপর দৃষ্টি পড়ে। মেয়েটির চেহারার প্রতি গভীর চোখে তাকায়। মৃত্যু মেয়েটির চেহারার রূপ নষ্ট করতে পারেনি। উন্মুক্ত রেশমকোমল চুলগুলো বুকের উপর ছড়িয়ে আছে। ভিক্টর পুনরায় মদের সোরাহীটার প্রতি তাকিয়ে মনে মনে বললো- হায়রে মানুষ! নিজের ধ্বংসের জন্য কতোই না উপায় বের করে নিয়েছ।
ভিক্টর চেঙ্গিসের লাশটার প্রতি তাকায়। খানিক কি যেনো ভেবে এক পার্শ্বে বসে পড়ে। চেঙ্গিসের মরদেহটা বরফের ন্যায় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ভিক্টর তার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললো- তুমি ভালোভাবেই জানতে বন্ধু, নারী পুরুষের জন্য কতো বড় দুর্বলতা আর মদ কতো রাজা-বাদশাহর সিংহাসন উল্টে দিয়েছে। তারপরও জেনে-শুনে তুমি এই দুর্বলতা নিজের মধ্যে স্থান দিয়েছে। যাক গে ওসব, আমিও আসছি বন্ধু! জল্লাদ খুব তাড়াতাড়ি আমাকে তোমার নিকট পৌঁছিয়ে দেবে। আমরা একই পথের পথিক। আমি আসছি বন্ধু- আমি আসছি।
ভিক্টর উঠে দাঁড়ায়। দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। খৃস্টান অফিসারদের বাসভবন তার গন্তব্য। জখম থেকে রক্ত ঝরছে। খঞ্জরটা খাপ থেকে বের করে দেখে খঞ্জরের গায়ে রক্ত জমে আছে। নিজের জখমের রক্ত দ্বারা খঞ্জরটা ভিজিয়ে নেয়। খঞ্জর হাতে নিয়েই হাঁটছে ভিক্টর।
অধিক রক্তক্ষরণের ফলে ভিক্টর শরীরে দুর্বলতা অনুভব করছে। অফিসারদের ভবনে এসে পৌঁছে একটি দরজায় করাঘাত করে। তার জানা আছে, এখন তাকে যার নিকট যেতে হবে, তার বাসগৃহ এটিই। কিছুক্ষণ পর এক কর্মচারি দরজা খুলে দেয়। ভিক্টর অফিসারের নাম উল্লেখ করে বললো- ওনাকে জাগিয়ে তুলে বলল এক খুনী এসেছে।
চাকর দৌড়ে ভেতরে চলে যায়।
ভেতর থেকে বকবকানির শব্দ ভেসে আসতে শুরু করে। অফিসার গালাগাল করতে করতে এগিয়ে আসেন। দরজায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন- কে তুমি? কাকে খুন করে এসেছো?
চাকর একটি প্রদীপ হাতে নিয়ে ছুটে আসে। অফিসার আলোতে ভিক্টরকে দেখে বললেন- তুমি? কার সঙ্গে লড়াই করেছো?
