হ্যাঁ, ধরা পড়েছে- ভিক্টর জবাব দেয়- নিজের পাপের হাতে ধরা পড়েছে। আমার খঞ্জর তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। আপনি আমার রক্ত দেখতে পাচ্ছেন। সম্ভব হলে রক্তক্ষরণ বন্ধ করার ব্যবস্থা করুন। আপনি ভয় পাবেন না। আল্লাহর শোকর আদায় করুন যে, চেঙ্গিস জীবিত নেই। অন্যথায় আমাদের প্রত্যেককে কয়েদখানার নির্যাতনে জীবন হারাতে হতো।
ইমাম তাড়াতাড়ি ওষুধ বের করেন। পানি আনেন। ভিক্টরের জখম ধুইতে শুর করেন। ভিক্টরকে পোশাক পরিবর্তন করতে বললেন।
না- ভিক্টর বললো- আমি আমার করণীয় ঠিক করে রেখেছি। এই কাপড়েই আমি ফিরে যাবো। আমি আপনার নুন খেয়েছি। আমার প্রিয় বন্ধু ও অতিশয় বিপজ্জনক সফরের সঙ্গী আমার হাতে খুন হয়েছে। আমি স্থির করেছি, আপনাদের সকলের জন্য নিজেকে কুরবান করে দেবো। নিজের ঘাড়টা জল্লাদের সম্মুখে অবনত করে দিয়ে আপনাদের সকলকে রক্ষা করবো।
ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ইমাম তাতে ওষুধ প্রয়োগ করছেন আর ভিক্টর ইমামকে সমস্ত ঘটনা বলে শোনাচ্ছে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে ভিক্টর বললো- আমার সন্দেহ জেগে গিয়েছিলো মেয়েটি প্রতারণা করছে। সে নিজেকে একজন বৃদ্ধ কমান্ডারের রক্ষিতা বলে দাবি করতো; কিন্তু আমি এমন কোনো বৃদ্ধ কমান্ডারকে কখনো দেখিনি। প্রতিদিন তার চেঙ্গিসের পথে দাঁড়িয়ে থাকা প্রমাণ করে, সে নিকটেই কোথাও থাকতো এবং চেঙ্গিসের উপর দৃষ্টি রাখতো। আমি চেঙ্গিসকে যখনই সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছি, সে ক্ষেপে ওঠেছে। আমি আপনাকে বলেছি, সে মদপানও করতে শুরু করেছিলো। আমার সন্দেহ, তাকে মদের সঙ্গে হাশিশ মিশিয়ে খাওয়ানো হতো। অন্যথায় চেঙ্গিসের মতো কঠিন ও পাকা ঈমানের মানুষটা এতো তাড়াতাড়ি এবং এতো সহজে এই ফাঁদে পা দেয়ার কথা নয়। অনেক রূপসী নারী তাকে ভালোবাসার জালে আটকানোর চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু সব অফারই সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। মেয়েটি তাকে নিজের রূপ আর হাশিশ মিশ্রিত মদের যাদুতে দৈহিকভাবে নয় মানসিকভাবে ঘায়েল করে নিয়েছিলো।
চেঙ্গিস যখন বললো, সে মেয়েটিকে বলে দিয়েছে সে গোয়েন্দা, তখন আমার মনটা কেঁপে ওঠেছিলো। আমি যেনো অদৃশ্য থেকে ইঙ্গিত পেয়ে গেছি, এটি এতো বিরাট পদস্খলন, যার শাস্তি শুধু তার নয়। আমাদের প্রত্যেকের মৃত্যু। তার এই পদস্খলন মিসর-সিরিয়ার আযাদীর অপমৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমি তাকে বুঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু মেয়েটি তার বিবেকের উপর যে যাদু প্রয়োগ করে দিয়েছিলো, তা তাকে আমাদের থেকে এবং নিজের ঈমান ও কর্তব্য থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়েছিলো। আমি তখনই সংকল্প করে নিয়েছি, রক্ষা পাওয়ার একটি মাত্র পথ আছে মেয়েটিকে হত্যা করতে হবে। চেঙ্গিস যদি এই ভয়ঙ্কর পথ থেকে সরে না আসে, তাহলে তাকেও শেষ করে ফেলতে হবে। দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার লক্ষ্যে একজন মানুষকে হত্যা করা কোনো ব্যাপার নয়। তাছাড়া গোয়েন্দা বিধান তো আছেই যে, কারো প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার সন্দেহ হলে কিংবা কারো মাধ্যমে তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে, তাকে হত্যা করতে হবে। কিন্তু তারপরও আমি সময় নিয়েছি। তাকে রক্ষা করেই জাতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু লোকটি আমাকে খুন করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলো।
এমনও তো হতে পারে, তুমি তাকে ভুল বুঝাবুঝির উপর ভিত্তি করে হত্যা করেছো- ইমাম বললেন- হতে পারে মেয়েটি আসলেই মুসলমান এবং সত্যমনেই আমাদের জন্য কাজ করছিলো।
হতে পারে- ভিক্টর বললো- কিন্তু আমি নিশ্চিত ঘটনা এমন নয়। আমি প্রমাণ পেয়ে নিশ্চিত হয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। আমি মেয়েটিকে সেই ভবন থেকে বের হতে এবং ওখানেই ফিরে যেতে দেখেছি; যে ভবনে হারমানের বিভাগের মেয়েরা থাকে। আমি এও জেনেছি, মেয়েটি কোনো কমান্ডারের রক্ষিতা নয়। আজ রাত আমি চেঙ্গিসের পেছনে চলে গেলাম এবং যে স্থানে চেঙ্গিস মেয়েটিকে নিয়ে উপবিষ্ট ছিলো, আমি সেখান থেকে কয়েক পা দূরে একটি গাছের আড়ালে বসে গেলাম। মেয়েটি চেঙ্গিসের নিকট যেসব তথ্য জানতে চায় এবং যে ধারায় জিজ্ঞেস করে, তা-ই আমাকে নিশ্চিত করার যথেষ্ট ছিলো যে, মেয়েটি খৃস্টানদের গুপ্তচর। মেয়েটি ত্ৰিপোলীতে আমাদের কমান্ডো সেনাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। সে চেঙ্গিসকে জানালো, খৃস্টান বাহিনীর জন্য রসদ ইত্যাদির বিপুল সম্ভার সংগ্রহ করা হয়েছে, যাতে দাহ্য পদার্থের অসংখ্য মটকাও আছে। আমিও গুপ্তচর। আমি ভালো করেই জানি, এখানে কোথাও এতো সম্ভার সগ্রহ করা হয়নি। এই সম্ভার রাখার যে জায়গার কথা বলেছে, সেখানে কিছুই নেই। প্রয়োজন মনে করলে আপনি নিজে গিয়ে দেখে আসুন। চেঙ্গিস মেয়েটির কাছে আমাদের সবগুলো স্পট চিহ্নিত করে দিয়েছে। নাম উল্লেখ করে আমাকেও ফাঁসিয়ে দিয়েছে। মেয়েটি আমার নাম শুনে বিস্ময় লুকাতে পারেনি। এ তথ্য পাওয়ার পর সে অনেকক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চুপ থাকে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে যায়। মেয়েটি আমাদের অতিশয় বিপজ্জনক তথ্য নিয়ে যাচ্ছিলো। এ তথ্য যাচ্ছিলো সোজা হারমানের কাছে। আপনি এর পরিণতি আন্দাজ করতে পারবেন। আমি উঠে প্রথমে মেয়েটিকে ধরে ফেলি এবং খঞ্জরটা তার বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে দেই। চেঙ্গিস মেয়েটির পক্ষ নিয়ে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমি তাকে অনেক বুঝালাম, ঘটনার বাস্তবতা বুঝাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু মদ আর নারীর পরশ তাকে পশু বানিয়ে রেখেছিলো। আমি তার খঞ্জরের আঘাত খেয়েও বুঝালাম। কিন্তু কোনো বুঝ নেয়ার মতো অবস্থা তার ছিলো না। আমি অনুভব করলাম, চেঙ্গিস জীবিত থাকলে আমি তাকে কাবুতে রাখতে পারবো না এবং আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য নস্যাৎ হয়ে যাবে। আমি তাকেও খতম করে দিলাম।
