ভিক্টরও? মেয়েটি চমকে ওঠে জিজ্ঞাসা করে।
হ্যাঁ- চেঙ্গিস বললো- তুমি কি আমাদের ওস্তাদির প্রশংসা করবে না যে, আমরা একজন খৃস্টানকেও আমাদের গুপ্তচর বানিয়ে রেখেছি?
মেয়েটি অনেকক্ষণ পর্যন্ত নীরব থাকে। তারপর বললো- আগামীকাল দিনের বেলা আমি তোমার কক্ষে আসবো। কেউ আমাকে ঠেকাতে পারবে না।
***
মেয়েটি যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা লোকটি নড়ে ওঠে। বসে বসে কটিবন্ধ থেকে খঞ্জর বের করে এবং আট দশ কদমের দূরত্বটা দুলাফে অতিক্রম করে মেয়েটাকে পেছন থেকে এক বাহু দ্বারা ঝাঁপটে ধরে। তার খঞ্জরধারী হাত উপরে উঠেই তীব্রবেগে নীচে নেমে আসে। খঞ্জর মেয়েটার বুকে গেঁথে যায়। মেয়েটা হাল্কা একটা চীৎকার দিয়ে শুধু বললো- আমার বুকে খঞ্জর ঢুকে গেছে।
চেঙ্গিস ঝটপট নিজের খুঞ্জরটা বের করে বীরত্বের সাথে লোকটার উপর আক্রমণ চালায়। লোকটি মোড় ঘুরিয়ে মেয়েটিকে সামনে নিয়ে আসে এবং বলে- আমি ভিক্টর চেঙ্গিস! এই হতভাগীর বেঁচে না থাকাই উচিত।
মেয়েটি কোকাচ্ছে। ভিক্টর তাকে পেছন থেকে এক বাহুতে ঝাঁপটে ধরে আছে।
তুমি অপদার্থ খৃস্টান- মদের নেশায় বুঁদ হওয়া চেঙ্গিস বললো- সাপের বাচ্চা! চেঙ্গিস মোড় ঘুরিয়ে ভিক্টরের উপর আক্রমণ করতে উদ্যত হয়।
ভিক্টর মেয়েটিকে আবার সামনে নিয়ে এসে তাকে ঢাল বানিয়ে বললো চৈতন্যে আসো চেঙ্গিস! মেয়েটাকে সবকিছু বলে দিয়ে তুমি আমাদের খেলাটা সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছো। ও যদি জীবিত থাকে, তাহলে রাত পোহাবার পরই আমরা সকলে গ্রেফতার হয়ে যাবো।
চেঙ্গিস ক্ষ্যাপা সিংহের মতো ভিক্টরের চার পার্শ্বে ঘুরছে আর হুংকার ছাড়ছে। মেয়েটির এখনো চৈতন্য আছে। সে কোঁকাতে কোকাতে বললো চেঙ্গিস! আমার রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার দায়িত্ব তোমার উপর অর্পণ করলাম। খৃস্টানরা আমাদের বন্ধু হতে পারে না। আমি বাঁচবো না। এই লোকটা আমাদের নয়- খৃস্টানদের গুপ্তচর।
চেঙ্গিস লাফ দিয়ে ভিক্টরের উপর আক্রমণ করে। ভিক্টর তাকে বারবার বোঝাতে চেষ্টা করে, তুমি প্রতারণার শিকার। চলো, মেয়েটাকে হত্যা করে লাশটা দূরে ফেলে আসি। কিন্তু চেঙ্গিস এখন কারো গোয়েন্দা নয়। এখন সে একজন পুরুষ, যার প্রেয়সীকে অন্য এক পুরুষ ধরে রেখেছে এবং তার বুকে খঞ্জর বিদ্ধ করেছে। সম্মুখ থেকে সে মেয়েটাকে সজোরে এক ধাক্কা মারে যে, ভিক্টর পেছন দিকে পড়ে যায় আর মেয়েটি তার উপর ছিটকে পড়ে। চেঙ্গিস ভিক্টরের উপর খঞ্জরের আঘাত হানে। ভিক্টর পূর্ব থেকেই সতর্ক ছিলো। সে একদিকে সরে গিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে যায়। চেঙ্গিস তার উপর পুনরায় আক্রমণ চালায়। খঞ্জর তার কাঁধে গিয়ে আঘাত হানে।
ভিক্টর নিজেকে সামলে নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করে। চেঙ্গিসের বেঁচে থাকাও ঝুঁকিপূর্ণ। ভিক্টরের খঞ্জর চেঙ্গিসের পেটে আঘাত হানে। চেঙ্গিস পাল্টা আঘাত করে। ভিক্টরের বাহু কেটে যায়। ভিক্টর চেঙ্গিসের বুকে খঞ্জর মারে। মদমত্ত চেঙ্গিস দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ভিক্টর তার বুকের উপর আরেকটি আঘাত হানে। চেঙ্গিস লুটিয়ে পড়ে যায়। ভিক্টর মেয়েটার বুকে হাত রাখে। হৃদপিণ্ডটা নীরব। মরে গেছে। চেঙ্গিসও শেষ নিঃশ্বাস গ্রহণ করছে। এখন আর চৈতন্য নেই তার।
ভিক্টরের কাঁধ ও বাহু থেকে রক্ত ঝরছে। মেয়েটির পরিধানের কাপড় ছিঁড়ে বাহুটা বেঁধে নেয় সে। রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য কাঁধের জখমে কাপড় ঢুকিয়ে দেয়। ভিক্টর হাঁটতে শুরু করে।
ভিক্টর দ্রুত হাঁটছে। জখমের রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। তবু তার কোনো পরোয়া নেই। অবলীলায় হাঁটছে ভিক্টর।
ভিক্টর একটি গলিতে ঢুকে পড়ে। দুটি মোড় অতিক্রম করে সে একটি প্রশস্ত গলিতে পৌঁছে যায়। গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন ত্রিপোলী। সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে সর্বত্র। প্রতিটি ঘরের দরজা বন্ধ। একটি মাত্র ঘরের দরজা, খোলা- আল্লাহর ঘর মসজিদের দরজা।
ভিক্টর এই মসজিদে এ-ই প্রথমবার এসেছে। তবে কীভাবে আসতে হবে, এসে কী করতে হবে, তার জানা আছে। বাম দেয়ালে একটি দরজা আছে। এটিই ইমামের বাসার দরজা। ভিক্টর পায়ের জুতো খুলে খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
***
রাতের অর্ধেকটা কেটে গেছে। ইমাম গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। দরজার করাঘাত তাকে জাগিয়ে তোলে। জাগ্রত হয়ে তিনি খানিক অপেক্ষা করেন। পুনরায় করাঘাত পড়ে। ঠিক আছে, আমারই গোয়েন্দাদের বিশেষ সাংকেতিক আওয়াজ। তারপরও তিনি লম্বা খঞ্জরটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খোলেন। ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন- চেঙ্গিস?
ভিক্টর- ভিক্টর জবাব দেয়- ভেতরে চলুন।
রক্তের গন্ধ আসছে কোথা থেকে? ইমাম অন্ধকারে ভিক্টরের বাহু ধরে জিজ্ঞেস করে।
আমার রক্ত। ভিক্টর জবাব দেয়।
ইমাম ভিক্টরকে টেনে ভেতরে নিয়ে যান। বাতি জ্বালালে দেখতে পান ভিক্টরের পরিধেয় রক্তে লাল এবং ভিজা। ইমাম ভিক্টরকে কখনো দেখেননি। পরিচয়টা চেঙ্গিসের মুখে শোনা। ভেতরের খবরাখবর পরিবেশন করা ছিলো তার দায়িত্ব। ইমামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ভিক্টরের কোন প্রয়োজন ছিলো না।
তুমি এসেছো?- ইমাম জিজ্ঞেস করেন- চেঙ্গিস আসেনি কেন?
চেঙ্গিস আর কখনো আসবে না। ভিক্টর উত্তর দেয়।
কেনো?- ইমাম ভীতকণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন- ধরা পড়েছে?
