কেন, ইনি বেশ চমৎকার কথা বলেছেন। আমি এর সঙ্গে যাবো। বললো মিগনানার এক সঙ্গী।
আমার একটি মেয়ের প্রয়োজন–মিগনানা মারিউস মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললো–আমার সঙ্গে যে মেয়েটি যাবে, তার জীবন-সম্ভ্রমের দায়িত্বও আমার। মেয়ে ছাড়া সালাহুদ্দীন আইউবীর নিকট পৌঁছতে পারবো না। এসে অবধি আমি ভাবছি, আইউবীর সঙ্গে একাকী কিভাবে সাক্ষাৎ করতে পারি।
বসা থেকে উঠে মিগনানা মারিউসের পার্শ্বে গিয়ে দাঁড়ায় মুবী। বলে–আমি যাবো এর সঙ্গে।
শোন মুবী! আমরা তোমাদের বড় কষ্টে মুক্ত করে এনেছি। এখন আমি তোমাকে এমন বিপজ্জনক মিশনে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারি না। বললো কমাণ্ডার।
আমাকে সম্ভ্রম হারাবার প্রতিশোধ নিতেই হবে। আমি সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর শয়নকক্ষে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারবো। আমি জানি, মুসলমানদের মর্যাদা যতো উঁচু, সুন্দরী নারীর প্রতি তারা ততো দুর্বল। আমি এমন কৌশল অবলম্বন করবো, আইউবী বুঝতেই পারবে না, এ-ই তার জীবনের সর্বশেষ নারীদর্শন। বললো মুবী।
দীর্ঘ আলোচনা-তর্কের পর মিগনানা মারিউস তার এক সঙ্গী ও একটি মেয়েকে নিয়ে কাফেলা ত্যাগ করে রওনা হয়। তাকে দুআ দিয়ে সকলে বিদায় জানায়। দুটি উট নেয় সে। একটিতে সওয়ার হয় মুবী, অপরটিতে তারা দুজন। তাদের সঙ্গে আছে মিসরী মুদ্রা, সোনার আশরাফী। মিগনামা ও তার সঙ্গীর পরনে জুব্বা। এতদিনে মিগনানার দাঁড়িগুলো বেশ লম্বা হয়ে গেছে। কারাগারের অসহনীয় গরম এবং হাড়ভাঙ্গা খাটুনির কারণে তার গায়ের রং এখন আর ইতালীদের মত গৌর নয়; অনেকটা কালো হয়ে গেছে। এখন তাকে ইউরোপিয়ান বলে সন্দেহ করার উপায় নেই। ছদ্মবেশ ধারণের জন্য আলাদা পোশাক দিয়ে পাঠান হয়েছিলো তাদের। কিন্তু সমস্যা হলো, মিগনানা মারিউস ইতালী ছাড়া আর কোন ভাষা জানে না। মিসরের ভাষা জানা আছে মুবীর। অপরজনও মিসরী ভাষা জানে না। এর একটা বিহিত না করলেই নয়।
তারা রাতারাতি-ই রওনা দেয়। অত্র অঞ্চলের পথ-ঘাট সব মুবীর চেনা। সে কায়রো থেকে-ই এসেছিলো। তার গায়েও একটি চোগা পরিয়ে দেয় মিগনানা। মাথায় পরিয়ে দেয় দোপাট্টার মত একটি চাদর।
***
ভোরের আলোতে সুলতান আইউবীর প্রেরিত বাহিনী ঘোড়ার পদচিহ্ন অনুসরণ করে রওনা হয়ে পড়ে। খৃষ্টান কমাণ্ডোরা মেয়েদের নিয়ে রাত পোহাবার আগেই সমুদ্র অভিমুখে রওনা হয়ে যায়। তারা তীব্রগতিতে এগিয়ে চলছে।
সূর্যাস্তের এখনো অনেক বাকি। হঠাৎ এক স্থানে আইউবী বাহিনীর চোখে পড়ে কয়েকটি লাশ। আলী বিন সুফিয়ানের নায়েব দেখেই বলে ওঠেন, এ-যে বালিয়ানের লাশ! মুখাবয়ব তার সম্পূর্ণ অবিকৃত। পার্শ্বেই এলোপাতাড়ি পড়ে আছে তার ছয় বন্ধুর মৃতদেহ। শকুন-হায়েনারা তাদের দেহের অনেক গোশত খেয়ে ফেলেছে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে কাফেলা। বিষয়টি বুঝে উঠতে পারছে না তারা। রক্ত বলছে, এরা মরেছে বেশীদিন হয়নি। লোকগুলো বিদ্রোহের রাতে মারা গিয়ে থাকলে এতদিনে রক্তের দাগ মুছে যেতো, থাকতো শুধু হাড়গোড়। বিষয়টি দুর্ভেদ্য ঠেকে তাদের কাছে।
অশ্বখুরের চিহ্ন ধরে আবার রওনা হয় কাফেলা। তীব্রগতিতে ঘোড়া হাঁকায়। আধ মাইল পথ অতিক্রম করার পর এবার উটের পায়ের দাগও চোখে পড়ে তাদের। এগিয়ে চলছে অবিরাম। সূর্য অস্ত যাওয়ার পরও তারা থামেনি। এখন, তারা যে স্থানে চলছে, সেখান থেকে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে উঁচু উঁচু মাটির টিলা। সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার আঁকা বাঁকা একটিমাত্র পথ।
খৃষ্টান কমাণ্ডোরাও এগিয়ে যাচ্ছে এ পথে-ই। বিস্তীর্ণ পার্বত্য এলাকার পরে বিশাল ধূ ধূ বালু প্রান্তর। পার্বত্য এলাকা অতিক্রম করে-ই থেমে যায় পশ্চাদ্ধাবনকারী মুসলিম বাহিনী। রাত কাটায় সেখানে।
ভোর হতেই আবার রওনা দেয় তারা। পাড়ি দেয় বিশাল মরু এলাকা। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর তারা সামুদ্রিক আবহাওয়া অনুভব করে। তার মানে সমুদ্র আর বেশী দূরে নয়। কিন্তু শিকার এখানেও চোখে পড়ছে না। পথে একস্থানে খাদ্যদ্রব্যের উচ্ছিষ্ট প্রমাণ দিলো, রাতে এখানে কোন কাফেলা অবস্থান নিয়েছিলো। ঘোড়া বাঁধার এবং পরে ঘোড়াগুলোর সমুদ্রের দিকে চলে যাওয়ার আলামতও দেখা গেলো। তারা মাটিতে ঘোড়ার পদচিহ্ন অনুসরণ করে আরো দ্রুত ঘোড়া হাঁকায়।
সম্মুখে এক স্থানে অবতরণ করে কাফেলা। ঘোড়াগুলোকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম দিয়ে, পানি পান করিয়ে আবার ছুটে চলে। সমুদ্রের বাতাসের তীব্রতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। সমুদ্রের লোনা ঘ্রাণ অনুভূত হচ্ছে নাকে। আস্তে আস্তে চোখে পড়তে শুরু করে উপকূলীয় টিলা।
ঘোড়া যত সামনে এগুচ্ছে, উপকূলীয় টিলাগুলো ততো স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। একটি টিলার উপরে দুজন মানুষ নজরে পড়ে মুসলিম বাহিনীর। এক নাগাড়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তারা কাফেলার প্রতি। তারপর তীব্রবেগে নেমে পড়ে সমুদ্রের দিকে। পশ্চাদ্ধাবনকারী কাফেলার ঘোড়াগুলোর গতি আরো বেড়ে যায়। টিলার নিকটে এসে হঠাৎ থেমে যেতে হয় তাদের। কারণ, টিলার পিছনে যাওয়ার একাধিক পথ। উপরে উঠে সম্মুখে দেখে আসার জন্য প্রেরণ করা হয় একজনকে। লোকটি ঘোড়া থেকে নেমে দৌড়ে যায় সেদিকে। একটি টিলায় উঠে শুয়ে শুয়ে তাকায় অপরদিকে। সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসে পেছনে। সেখান থেকেই ইঙ্গিতে সঙ্গীদের বলে, ঘোড়া থেকে নেমে জলদি পায়ে হেঁটে এসো। আরোহীরা নেমে পড়ে ঘোড়া থেকে। দৌড়ে এসে দাঁড়ায় টিলার নিকট। সর্বাগ্রে উপরে ওঠেন আলী বিন সুফিয়ানের নায়েব। সম্মুখে তাকান তিনি। তৎক্ষণাৎ পিছনে সরে নেমে আসেন নীচে। মুহূর্তের মধ্যে তার বাহিনীকে ছড়িয়ে দেন তিন দিকে। এক একজনুকে পজিশন নিয়ে দাঁড়াতে বলেন এক এক স্থানে।
