তুমি আমাকে ধোকা দিচ্ছে না তো?- মেয়েটি চাপা কণ্ঠে চেঙ্গিসকে জিজ্ঞেস করে- তোমার ভালোবাসা আমাকে এমন অসহায় বানিয়ে দিয়েছে যে, আমি আমার এমন স্পর্শকাতর তথ্যাবলী তোমাকে দিয়ে দিয়েছি।
মেয়েটি এক হাতে চেঙ্গিসের কোমর ধরে গায়ে গা মিশিয়ে তাকে সেই জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে মদের সোরাহী ও পেয়ালা রাখা আছে। চেঙ্গিসকে বসিয়ে পেয়ালায় মদ ঢেলে বললো- নাও, জয়ের আনন্দে এক পেয়ালা।
চেঙ্গিস এতোই উৎফুল্ল যে, সঙ্গে সঙ্গে পেয়ালাটা হাতে তুলে নেয় এবং গল গল করে পেয়ালাটা খালি করে ফেলে। মেয়েটি শূন্য পেয়ালায় আবারো মদ ঢালে। চেঙ্গিস তাও পান করে ফেলে।
তাদের থেকে আট-দশ কদম দূরে একটি বৃক্ষ। পেছন থেকে কে যেন হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এসে গাছটার আড়ারে বসে পড়ে। রাতের নীরবতা খা খা করছে। বৃক্ষের আড়ালে বসা লোকটি চেঙ্গিস ও মেয়েটির কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছে। তারা খানিকটা উচ্চস্বরেই কথা বলছে।
এবার বল, কী খবর নিয়ে এসেছো? চেঙ্গিস মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে।
এমন সংবাদ এনেছি, যা সুলতান আইউবী জীবনে স্বপ্নেও শুনেননি মেয়েটি বললো- আমি খৃস্টানদের মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে এসেছি। মেয়েটি চেঙ্গিসকে খৃস্টানদের পরিকল্পনা ও অগ্রযাত্রার পথ বলে দেয়। আক্রমণ কোথায় হবে তাও অবহিত করে। খৃষ্টান বাহিনীর রসদ কোন্ পথে যাবে এবং রওনা কবে হবে, সব বলে দেয়।
এখান থেকে আমাদেরকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে যাওয়া দরকার চেঙ্গিস বললো- কাল রাতেই যাবে?
না- মেয়েটি বললো- আমাদের যেসব তথ্যের প্রয়োজন ছিলো, পেয়ে গেছি। কিন্তু আমার হৃদয়ে প্রতিশোধের যে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে, তা না নিভিয়ে যাবো না। খৃস্টানরা তাদের বাহিনীর জন্য বিপুল পরিমাণ রসদ সংগ্রহ করেছে। অস্ত্র আর তাঁবুর তো কোনো হিসাবই নেই। তরল দাহ্য পদার্থের মটকাও আছে। আছে তরিতরকারীর সম্ভার। এসব দূর দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। এগুলো ধ্বংস করা কঠিন কিছু নয়। পাহারা এটুকু ব্যবস্থা আছে যে, মাত্র সাত-আটজন সিপাহী রাতে টহল দেয়। এই ভাণ্ডার খৃস্টানরা তিন-চার মাসে সংগ্রহ করেছে। আমরা যদি এগুলো ধ্বংস করে দিতে পারি, তাহলে তাদের আক্রমণ তিন-চার মাসের জন্য পিছিয়ে যাবে। এ সময়ের মধ্যে সুলতান আইউবী তার প্রস্তুতি পরিপূর্ণ করে নিতে পারবেন। তুমি তো হারমানকে জানো। আমি তার হৃদয় থেকেও তথ্য বের করে এনেছি। তিনি বলেছেন, সুলতান আইউবী নতুন ভর্তি নিচ্ছেন। তার আগেকার বাহিনীটি আপন ভাইদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, এখন আর তাদের যুদ্ধ করার শক্তি নেই। এই অভাগা খৃস্টানরা আইউবীর সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে চাচ্ছে। এ সময় প্রয়োজন হলো খৃস্টানদের অভিযান বিলম্বিত করে দেয়া। তার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাদের রসদ জ্বালিয়ে দেয়া। তাদের যে হাজার হাজার ঘোড়া আছে, সেগুলোও ধ্বংস করার ব্যবস্থা হতে পারে।
রসদে আগুন লাগাবে কে? চেঙ্গিস জিজ্ঞেস করে।
তুমিই বলতে পারো, এখানে তোমাদের কতো লোক আছে- মেয়েটি বললো- এদের মধ্যে কমান্ডোও আছে নিশ্চয়ই। দায়িত্বটা তাদের উপর ন্যস্ত করা যেতে পারে। এখানে তোমাদের কতোজন কমান্ডো সেনা আছে?
সুলতান আইউবী নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, অধিকতৃ অঞ্চলে নাশকতা চালানো যাবে না। কেননা, কমান্ডোরা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে এদিক-ওদিক সরে যায়। তার শাস্তি ভোগ করে নিরীহ সাধারণ মুসলমান- চেঙ্গিস বললো খৃস্টানরা তাদের ঘরে ঘরে প্রবেশ করে নারীদের উপর নির্যাতন চালায়। এ কারণে আমরা আমাদের কমান্ডোদের ফেরত পাঠিয়েছি। যে কজন আছে, সবাই গুপ্তচর। তবে তারা নাশকতাও চালাতে জানে। তাছাড়া তারা এখানকার কিছু যুবককেও প্রস্তুত করতে পারে।
তাদেরকে কি কোনো এক স্থানে একত্র করার ব্যবস্থা করা যায়? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে এবং চেঙ্গিসের পেয়ালায় মদ ঢেলে পেয়ালাটা তার হাতে ধরিয়ে দেয়।
আমরা একটি মসজিদকে আমাদের আস্তানা বানিয়ে রেখেছি- মদের পেয়ালাটা খালি করে চেঙ্গিস বললো। মসজিদের অবস্থান জানিয়ে সে বললো- উক্ত মসজিদের ইমাম আমাদের নেতা। অত্যন্ত যোগ্য ও সাহসী মানুষ। আজ রাতই আমি এ বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলবো। কালই তিনি যুবকদেরকে মসজিদে একত্রিত করবেন। তারা সকলে নামাযের নাম করে মসজিদে এসে হাজির হবে।
শুধু একজন যোগ্য ও সাহসী লোক দ্বারা কাজ হবে না- মেয়েটি বললো- ইমামের সঙ্গে তুমিও থাকবে। তাছাড়া আরো তিন-চারজন বিচক্ষণ লোকের প্রয়োজন, যাতে এই নাশকতা পরিকল্পনাটা নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করা যায়। আর এই সম্ভার তখন ধ্বংস করতে হবে, যখন আমরা দুজন এখান থেকে বেরিয়ে যাবো। কারণ, ঘটনার পরপরই শহর সীল হয়ে যাবে। তখন আর আমরা বেরুতে পারবো না।
শুধু ইমাম নন–চেঙ্গিস বললো- এখানে আমাদের একজন থেকে অপরজন অধিক যোগ্য লোক আছে। চেঙ্গিস কয়েকজন লোকের নাম বললো- আমি এদের প্রত্যেককে মসজিদে উপস্থিত করতে পারি।
চেঙ্গিস থেকে এসব তথ্যই নিতে চাচ্ছে মেয়েটি। সে চেঙ্গিসকে তার দল সম্পর্কে আরো জিজ্ঞাসা করে, যা চেঙ্গিস অকপটে বলে দেয়। অবশেষে বললো- জানো, এই প্রাসাদেও আমি একা নই, ভিক্টর নামক যে লোকটি আমার সঙ্গে কাজ করে, সেও আমার দলের সদস্য।
