আমার ঘুম আসছে- মেয়েটি বিরক্ত কণ্ঠে বললো- আমি তোমাকে একটি শিকার দিয়েছি। তুমি ওটাকে এখনই গ্রেফতার করে নাও।
না- নায়েব বললো- তোমার কাজ এখনো শেষ হয়নি। গ্রেফতার করতে চাইলে তার সঙ্গে এ নাটক খেলার প্রয়োজন ছিলো না। তোমাকেও এতো কষ্ট দেয়া হতো না। আমরা তো সামান্যতম সন্দেহেও কাউকে গ্রেফতার করতে পারি। আমরা এখনই তাকে গ্রেফতার করবো না। তার মাধ্যমে তার সেই সকল সহকর্মীর সন্ধান বের করতে হবে, যারা ত্রিপোলীতে গোয়েন্দাগিরি করছে। তাদের মধ্যে নাশকতাকারী কমান্ডোও থাকতে পারে। তার মাধ্যমে অন্যান্য শহরের শত্রু গোয়েন্দাদেরও চিহ্নিত করা যেতে পারে। তুমি তার সঙ্গে আবারও দেখা করো। তাকে বলবে, আমি সকল তথ্য সংগ্রহ করেছি। এখন আরো কয়েকজন গোয়েন্দার প্রয়োজন। এ-ও বলবে, এক স্থানে খৃস্টানরা বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ ও মূল্যবান মালামাল মজুদ করে রেখেছে। আক্রমণে যাওয়ার সময় এগুলো সূঙ্গে নিয়ে যাবে। আমাদেরকে এগুলো ধ্বংস করতে হবে। এ কাজের জন্য তুমি আমাদের এখানকার কমান্ডোদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ করিয়ে দাও।
আমি বুঝে গেছি- মেয়েটি বললো- কিন্তু এমনও তো হতে পারে, সে তার সঙ্গীদের তথ্য ফাঁস করবে না।
হারমানের নায়েব মেয়েটির মাথার চুল, নগ্ন কাধ ও বুকে হাত বুলিয়ে বললো- কেন, তোমার এসব অস্ত্র কি অকর্মণ্য হয়ে গেছে? নিজের মুখোশ খুলে দিয়ে লোকটা দুর্গের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এবার তোমাকে ভেতরে ঢুকে কোণায় কোণায় তল্লাশি নিতে হবে। এ কাজটাও তুমি করতে পারবে। আমি সকালে হারমানকে তোমার কৃতিত্বের কথা অবহিত করবো।
রাতের আহারের পর চেঙ্গিস ও ভিক্টর কর্তব্য পালন করছে। এমন সময় হারমান এসে হাজির হন। তিনি চেঙ্গিসের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ হাত মেলান এবং বললেন- তোমার নিশ্চয়ই জানা আছে, আমাদের বাহিনী ইতিহাসের সর্ববৃহৎ আক্রমণ অভিযানে রওনা হতে যাচ্ছে। আমরা তোমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাবো। বহুদূর পর্যন্ত ভ্রমণ করাবো। ভিক্টরও সঙ্গে থাকবে। যেহেতু দু-তিনজন সম্রাট সঙ্গে থাকবেন, তাই তোমাদেরকেও সঙ্গে থাকা আবশ্যক।
আমি প্রস্তুত আছি। চেঙ্গিস বললো।
হারমান রিপোর্ট পেয়ে গেছেন, রাশেদ চেঙ্গিস গুপ্তচর এবং আজ রাত তার বিভাগের এক রূপসী যুবতী তার গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদেরও নাম ঠিকানা উদ্ধার করবে। হারমান মেয়েটিকে নতুন কিছু নির্দেশনা প্রদান করেন এবং নায়েবকে বললেন, চেঙ্গিসের দলের সন্ধান বের না হওয়া পর্যন্ত মেয়েটি একাকি তার সঙ্গে মিলিত হতে থাকবে। পাশাপাশি সতর্ক থাকবে, যেনো চেঙ্গিসের কোনো সন্দেহ জাগতে না পারে।
চেঙ্গিসের কোনো কাজে মন বসছে না। গুনে গুনে ক্ষণ অতিক্রম করছে। এতো বড় সাফল্য তার কখনো অর্জিত হয়নি। একদিকে এতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পেয়েছে গেছে, অপরদিকে একটি অতিশয় রূপসী তরুণীও তার মুঠোয় এসে পড়েছে। এ এক বিরাট অর্জন। এ রাতটাকে সে ব্রিপোলীতে শেষ রাত মনে করছে। আগামী রাত তথ্য ও মেয়েটিকে নিয়ে ত্রিশোলী ত্যাগ করছেই। মনে আনন্দের ঠাই হয় না রাশেদ চেঙ্গিসের।
অবশেষে ডিউটি শেষ করে রাশেদ চেঙ্গিস কক্ষে চলে যায়। ভিক্টরও তার সঙ্গে আছে। চেঙ্গিস পোশাক পরিবর্তন করে। আজ কৃত্রিম দাড়িগুচ্ছ নেয়নি। প্রয়োজন নেই। খঞ্জরটা চোগার পকেটে লুকিয়ে নেয়।
আমি তোমাকে শেষবারের মতো বলছি- ভিক্টর বললো- নারী ও মদের নেশা থেকে মুক্ত থেকে মাথা ঠিক রেখে কথা বলবে। আমার ভয় হচ্ছে, পুরোপুরি যাচাই-বাছাই না করে তুমি তাকে আমাদের গোপন তথ্য দিয়ে দেবে।
শোনো ভিক্টর- চেঙ্গিস বিস্ময়কর এক ভঙ্গিতে বললো। আমি মেয়েটার বিরুদ্ধে কোনো কথা শুনবো না। আমি তার সঙ্গে একাধিকবার দীর্ঘ সাক্ষাৎ করেছি, তার পুরো কাহিনী শুনেছি। সে এখন আমার ভালোবাসার মানুষ। আমি তাকে শতভাগ বিশ্বাস করি। তার সঙ্গে যেহেতু তোমার কোনো কথা হয়নি, তাই তুমি বুঝবে না। তুমি আমাকে পাগল মনে করো না। এটা আমার জীবনের প্রথম ও শেষ ভালোবাসা।
ভিক্টর নীরব হয়ে যায়। চেঙ্গিসের বলার ধরণ থেকেই সে বুঝে ফেলেছে লোকটার হুঁশ-জ্ঞান ঠিক নেই। এখন সে একটি মেয়ের প্রেমে মাতোয়ারা। ভিক্টর বুঝে, রাশেদ চেঙ্গিস একটি সুদর্শন যুবক। এই মেয়েটির চেয়েও অধিক রূপসী ও উচ্চস্তরের নারী তার জন্য পাগলপারা হওয়া বিচিত্র নয়। কিন্তু এই মেয়েটির ব্যাপারে তার ঘোর সন্দেহ, সে চেঙ্গিসকে ধোঁকা দিচ্ছে। আর যদি ধোকা নাও দিয়ে থাকে, তবু চেঙ্গিস নিজের আসল পরিচয় বলে দিয়ে নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই মেয়েটি মুসলমান গুপ্তচরও যদি হয়, তবুও তার উপর নির্ভর করা যায় না। কারণ, তাকে তো সরকারীভাবে পাঠানো হয়নি।
ভিক্টরের যোগ-বিয়োগ মিলছে না।
রাশেদ চেঙ্গিস চলে গেছে। ভিক্টর গভীর ভাবনায় হারিয়ে যায়। চেঙ্গিসের চলে যাওয়ার পর ভিক্টরের ঘুমিয়ে যাওয়ার নিয়ম। কিন্তু আজ তার ঘুম আসছে না। ভিক্টর কক্ষে গিয়ে না শুয়ে অস্থিরচিত্তে পায়চারি করতে থাকে।
***
মেয়েটি একই স্থানে চেঙ্গিসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। তার সন্নিকটে মাটিতে মদের সোরাহী ও দুটি পেয়ালা পড়ে আছে। অন্ধকারে চেঙ্গিসকে ছায়ার ন্যায় আসতে দেখে দৌড়ে গিয়ে তাকে ঝাঁপটে ধরে, যেরূপ ঝাঁপটে ধরে ছোট্ট শিশু তার মাকে। মেয়েটি এমনভাবে প্রেম নিবেদন ও আত্মসমর্পণের ভাব প্রদর্শন করে যে, চেঙ্গিসের বিবেকের উপর যৌনতার মাদকতা আচ্ছন্ন করে ফেলে। রূপসী মেয়েটি তার রূপ-যৌবনের সেই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে, যেগুলোর উপর হাত বুলিয়ে হারমানের নায়েব বলেছিলো, তোমার এসব অস্ত্র অকর্মণ্য হয়ে যায়নি তো।
