ভিক্টর গভীর ভাবনায় হারিয়ে যায়। রাশেদ চেঙ্গিস মদের নেশায় ঝিমুতে শুরু করে।
চেঙ্গিস যখন ভিক্টরের কক্ষে প্রবেশ করে, তখন অদূরে অবস্থিত অফিসারদের বেডরুমগুলোর একটিতে মেয়েটিও প্রবেশ করে। কক্ষের বাসিন্দা ঘুমিয়ে আছে। মেয়েটি কক্ষে ঢুকেই অবলীলায় তার একপা ধরে সজোরে ঝটকা টান দেয়। লোকটি বিড় বিড় করে ওঠে। মেয়েটি হেসে বললো- ওঠো, ওঠো, শিকার মেরে এসেছি।
লোকটি ধড়মড় করে শয্যা ছেড়ে উঠে বসে বাতি জ্বালায়। তারপর মেয়েটিকে বাহুতে জড়িয়ে ধরে বিছানায় ফেলে দেয়। কিছু সময় অশ্লীলতার নগ্ন প্রদর্শনী চলে। তারপর মেয়েটি যে সোরাহীতে করে চেঙ্গিসের জন্য মদ নিয়ে গিয়েছিলো, তার অবশিষ্টটুকু দুটি পেয়ালায় ঢেলে দুজনে মিলে পেয়ালা দুটো খালি করে ফেলে।
এবার বলল, কী সংবাদ নিয়ে এসেছো?
লোকটি গোয়েন্দা- মেয়েটি বললো- আর মুসলমান।
তাহলে তো হারমানের সন্দেহ সঠিক প্রমাণিত হলো।
সম্পূর্ণ সঠিক- মেয়েটি বললো- মদ আর আমার যাদু ক্রিয়া করেছে। অন্যথায় হারমানের ন্যায় অভিজ্ঞ গোয়েন্দাও তাকে ধরতে পারতেন না। যদি তার কৃত্রিম দাড়ি আমার হাতে না পড়তো, তাহলে বোধয় আমিও ব্যর্থ হতাম। আমার সন্দেহ তো সেদিনই দূর হয়ে গিয়েছিলো, যেদিন প্রথম সে মদপান করতে অস্বীকার করে। মুসলমান না হলে মদপান করবে না কেন। তাতেই আমি বুঝে ফেলেছি, লোকটা মুসলমান। আমি তাকে বলেছি, আমি পবিত্র ভালোবাসার জন্য ছটফট করছি। তখনই সে সূরলমনে আমাকে ভালোবেসে ফেলে-পবিত্র ভালোবাসা। এটাও প্রমাণ করে লোকটা মুসলমান। আমাদের লোকেরা তো ভালোবাসার কথা বলে প্রথমে বস্ত্ৰ উদোম করে থাকে।
ভালোবাসা পবিত্র হোক কিংবা অপবিত্র নারীর দেহ পাহাড়কেও চূণবিচূর্ণ করে দিতে সক্ষম- লোকটি বললো- এই দুর্বলতা প্রত্যেক মুসলমানের মধেও বিরাজমান। আমি তোমাকে বলেছিলাম, তোমার রূপ তার মুখোশ উন্মোচিত করে দিতে সক্ষম হবে। নারী সশরীরে কাছে থাকুক কিংবা নিছক কল্পনায়, মানুষকে অপ্রকৃতিস্থ করে তোলে।
লোকটা খৃস্টানদের ইন্টেলিজেন্স বিভাগের অফিসার এবং হারমানের নায়েব। হারমানের কোনোভাবে সন্দেহ হয়ে গিয়েছিলো, চেঙ্গিস গুপ্তচর। একে তো তিনি একজন অভিজ্ঞ গোয়েন্দা; তদুপরি তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কাউকে গোয়েন্দা বলে সামান্যতম সন্দেহ হলেও তাকে ধরে ফেলল। রাশেদ চেঙ্গিসকে সম্ভবত রাতে তিনি মসজিদে যেতে দেখেছিলেন। তাই নায়েবকে নির্দেশ দেন, কোনো নারীর ফাঁদে ফেলে দেখো লোকটা সন্দেহমুক্ত নাকি সন্দেহভাজন। এ বিভাগে বেশ কজন নারী কাজ করছে, যারা একজন অপেক্ষা অপরজন বেশি রূপসী। হারমানের নায়েব এই মেয়েটিকে নির্বাচন করে চেঙ্গিসের পেছনে লেলিয়ে দেয়। মেয়েটি তার বিদ্যায় অভিজ্ঞ। অত্যন্ত নৈপুণ্যের সাথে সে একটি নাটক মঞ্চস্থ করে, যার বিস্তারিত আপনারা পড়েছেন। চেঙ্গিস কখনো ভাবেনি, প্রতি রাতে ইমামের নিকট যাওয়ার সময় এই যে মেয়েটি তার পথ আগলে দাঁড়ায়, আসে কোথা থেকে এবং কীভাবে জানে যে সে যাচ্ছে? মেয়েটি ছায়ার মতো তার পিছে লাগা ছিলো। তার প্রতিটি গতিবিধিই সে প্রত্যক্ষ করতো।
আমি তাকে তোমার গড়ে দেয়া বেদনাদায়ক কাহিনী শোনালে সে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে- মেয়েটি বললো- তৎক্ষণাৎ সে বিশ্বাস করে নেয়, আমি মুসলমান এবং সত্যি সত্যিই আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করছি।
মুসলমান আবেগপ্রবণ জাতি- হারমানের নায়েব বললো- বরং এরা এক বিস্ময়কর ও অভিনব সম্প্রদায়। মুসলমানরা ধর্মের নামে এমন সব ত্যাগ স্বীকার করে বসে, যা অন্য কোন জাতি পারে না। যুদ্ধের ময়দানে একজন মুসলমান দশ-পনেরজন খৃস্টানের মোকাবেলা করতে সক্ষম এবং করছেও। একে তারা ঈমানী শক্তি বলে অভিহিত করে। আটজন, দশজন কমান্ডো সৈনিকের আমাদের পেছনে চলে যাওয়া, গেরিলা আক্রমণ করা, আমাদের খাদ্যসামগ্রীতে অগ্নি সংযোগ করে উধাও হয়ে যাওয়া, ঘেরাও এর মধ্য থেকে বেরিয়ে যাওয়া, বের হতে না পারলে নিজেদেরই লাগানো আগুনে স্বেচ্ছায় ভষ্মীভূত হওয়া কোন সাধারণ বীরত্ব নয়। এ এক অস্বাভাবিক শক্তি। আমি তাদের এই শক্তিকে অলৌকিক বিষয় মনে করি। আমাদের কিছু বিশেষজ্ঞ আছেন, যারা মানব চরিত্রের দুর্বল শিরাগুলো চেনেন। তারা মুসলমানদের এই শক্তিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে এমন কতিপয় পন্থা আবিষ্কার করে নিয়েছেন, যেগুলোর মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় উন্মাদনাকে তাদের দুর্বলতায় পরিণত করছে। এখন তারা যাকে ধর্মীয় চেতনা বলে মনে করে, সেটাই মূলত তাদের দুর্বলতা। এক্ষেত্রে ইহুদীরা অনেক কাজ করেছে। আমরা কতিপয় ইহুদী ও খৃস্টানকে মুসলমানদের আলেমের রূপে প্রেরণ করে এই সাফল্য অর্জন করেছি। মুসলিম অঞ্চলের বেশকটি মসজিদের ইমাম মূলত ইহুদী কিংবা খৃস্টান। তারা কুরআন হাদীসের এমন ব্যাখ্যা সর্বসাধারণের মাঝে গ্রহণযোগ্য করে দিয়েছেন, যার উপর ভিত্তি করে মুসলমান ভুল বিশ্বাস ও কুসংস্কারের অনুসারী হয়ে চলেছে। তাদের সফল তৎপরতার ফলে মুসলমান এখন এমন সব কর্মকাণ্ডকে ইসলাম বা দীন বলে বিশ্বাস করে, যা মূলত ইসলাম পরিপন্থী। এখন তাদেরকে ধর্মের নামে ভাইয়ের বিরুদ্ধে লড়ানো যায়, আমরা যার মহড়া করিয়ে দেখিয়েছি। মুসলমানদের মাঝে আমরা যৌন উন্মাদনাও সৃষ্টি করে দিয়েছি। এখন যে মুসলমানের হাতে বিত্ত আর ক্ষমতা আসে, আগে সে হেরেম তৈরি করে এবং তাকে সুন্দরী যুবতীদের দ্বারা সাজায়। এই নারীপূজা এখন মুসলমানদের উচ্চস্তর থেকে শুরু করে নিম্নস্তরেও ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা একাধিক পন্থায় মুসলিম মেয়েদের মাঝে কল্পনাপূজা ও মনস্তাত্ত্বিক বিলাসিতা ঢুকিয়ে দিয়েছি। তাছাড়া মুসলমান একটি আবেগপ্রবণ জাতি। তুমি তো দেখেছো, তোমার শিকার মুসলমানটির আবেগে খোঁচা দিয়েছো আর অমনি সে তোমার জালে ফেঁসে গেলো। আবেগ বড় একটি দুর্বলতা। হারমান বলে থাকেন, অদূর ভবিষ্যতে এই জাতিটা কল্পনার দাস হয়ে যাবে এবং বাস্তব থেকে দূরে সরে যাবে। তখন আর আমাদের যুদ্ধ-বিগ্রহের প্রয়োজন হবে না। চিন্তা-চেতনার দিক থেকে মুসলমান আমাদের দাসানুদাস হয়ে যাবে। নিজেদের নীতি-আদর্শ ত্যাগ করে তারা আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি গ্রহণ করে গৌরববোধ করবে।
