কৃত্রিম দাড়ি দেখেই তুমি কীভাবে নিশ্চিত হলে যে, আমি গোয়েন্দা?
তুমি যে ধারায় আমার কাছে খৃস্টানদের যুদ্ধ ইত্যাদি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলে, সে ধারাটা গোয়েন্দাদের- মেয়েটি বললো আমাকে তুমি যেসব প্রশ্নের উত্তর এনে দিতে বলেছিলে, সেসব প্রশ্ন গোয়েন্দা ছাড়া অন্য কারো জানার বিষয় নয়। আর মদপান করতে অস্বীকার করে শুধু মুসলমানরাই।
মেয়েটি বলতে বলতে থেমে যায়। নিজের একটা বাহু চেঙ্গিসের কাঁধের উপর রেখে তার গালের সঙ্গে গাল লাগিয়ে বললো তুমি আমাকে ভয় করছে। তোমার কি বিশ্বাস হচ্ছে না, আমি মুসলমান? আমার অন্তরটা তোমাকে কীভাবে দেখাবো। আমরা দুজন একই পথের পথিক। আমি তোমাকে সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা মনে করে হৃদয়ে স্থান দেইনি। তবে তোমাকে আমার কেন যে ভালো লাগলো, বলতে পারবো না। আমার এমনটা মনে হয়েছিলো, তুমি আর আমি আকাশেও একত্রে ছিলাম, পৃথিবীতেও একত্রিত হয়েছি এবং দুজনে এক সাথেই উত্থিত হবো। তুমি বললে আমি তোমার গোয়েন্দা হওয়ার পক্ষে আরো একাধিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারি। কিন্তু আমি তোমাকে রক্ষা করবো। আমি এই সংকল্পও করে রেখেছি, আমরা দুজন অনেক মূল্যবান তথ্য নিয়ে এখান থেকে একত্রে বেরিয়ে যাবো। এসব তথ্য যদি সময়মতো কায়রো না পৌঁছে, তাহলে হাররান, হাব, হামাত, দামেক ও বাগদাদ খৃস্টানদের সয়লাবে ডুবে যাবে। মিসরকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। সুলতান আইউবী এখানকার আয়োজন-প্রস্তুতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-খবর। সময় নষ্ট করো না। আমার পক্ষে এখান থেকে একাকি বের হওয়া সম্ভব ছিলো না। আমাকে তোমার সঙ্গ প্রয়োজন। আমি তোমাকে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণের নামে শহর থেকে বেরিয়ে যেতে পারবো। তুমি আমার রক্ষী সাজবে। তাহলে কেউ আমাদেরকে সন্দেহ করবে না।
রাশেদ চেঙ্গিসের মুখে কোন কথা নেই। মেয়েটি পেয়ালায় মদ ঢালে। মদভর্তি পেয়ালাটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আবেগমাখা কণ্ঠে বললো তুমি ভয় পেয়ে গেছে। মদটা পান করে নাও। এটি মদের শেষ পেয়ালা। এরপর আমরা তওবা করে নেবো।
মেয়েটি চেঙ্গিসের উপর নিজের রেশমী চুলগুলো ছড়িয়ে দিয়ে পেয়ালাটা তার ঠোঁটের সঙ্গে লাগিয়ে ধরে। চুলের কোমল ছোঁয়া আর সৌরভ, নারী দেহের নরম পরশ আর উত্তাপ এবং মদ সবকিছু মিলে চেঙ্গিসের মুখ খুলে দেয়- তুমি সত্যিকার অর্থেই গোয়েন্দা। অন্যথায় দেড়টি বছর সব গোয়েন্দার প্রধান গুরু হারমানের ছায়ায় থাকা সত্ত্বেও তিনি ধরতে পারেননি আমি গোয়েন্দা। আমি তোমার বিচক্ষণতার কাছে হার মানলাম। তুমি ঠিকই বলেছো, আমরা একই পথের পথিক। আমার সঙ্গে তুমি কায়রো চলো।
অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে- মেয়েটি বললো- আগামীকাল এখানে এসে সাক্ষাৎ করবো। আমি তোমাকে আরো এমন সব তথ্য জানাবো, যা জানা তোমার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব হবে না।
***
রাতের শেষ প্রহর। রাশেদ চেঙ্গিস নিজ কক্ষে গিয়ে পৌঁছে। ইতিপূর্বে এতো রাতে ফিরে কখনো সে ভিক্টরকে জাগায়নি। সকালে ঘুম থেকে জেগে, তাকে রাতের কাহিনী শোনাতো। কিন্তু আজ রাত চেঙ্গিসের আনন্দের জোয়ার ধৈর্যের বাধ মানছে না। অন্যরকম এক উত্তেজনা বিরাজ করছে তার হৃদয় জগতে। নিজেকে একজন সফল সেনানায়ক মনে হচ্ছে তার। যে মেয়েটি তাকে হৃদয় দিয়েছিলো, যে সুন্দরী মেয়েটিকে সে ভালোবেসেছিলো; সে মুসলমান এবং সুলতান আইউবীর একজন অভিজ্ঞ গুপ্তচর। একটি রূপসী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ত্রিপোলী ত্যাগ করতে যাচ্ছে, এটিও কম আনন্দের বিষয় নয়।
রাশেদ চেঙ্গিস তখনই ভিক্টরকে জাগিয়ে তোলে এবং জানায়, আরে, মেয়েটি তো আমাদেরই গোয়েন্দা সদস্য! চেঙ্গিস ভিক্টরকে মেয়েটির রাতের পুরো কাহিনী শোনায়।
তুমি কি তাকে বলে দিয়েছো তুমি গোয়েন্দা? ভিক্টর জিজ্ঞেস করে।
হ্যাঁ- চেঙ্গিস জবাব দেয়- বলাই প্রয়োজন ছিলো।
আমার কথাও বলেছো?
না- চেঙ্গিস উত্তর দেয়- তোমার সম্পর্কে কোনো কথা হয়নি। ভিক্টরকে চুপচাপ দেখে চেঙ্গিস বললো- তুমি কি মনে করছে, আমি ভুল করেছি? আমি আনাড়ি নই ভিক্টর!
আমার কথা না বলে তুমি ভালো করেছো- ভিক্টর বললো- আর এ দাবিটা করো না, তুমি আনাড়ি নও।
আমি কি ভুল করেছি? চেঙ্গিস পুনরায় জিজ্ঞেস করে।
হতে পারে তুমি অনেক ভালো কাজ করেছো- ভিক্টর বললো- আর যদি ভুল করে থাকো, তাহলে এই ভুল সাধারণ ভুল নয়। তুমি সম্ভবত ভুলে গেছে, একজন মাত্র গুপ্তচর একটি বাহিনীর জয়ের কারণ হতে পারে। আবার হতে পারে পরাজয়ের কারণও। তুমি জানো, সুলতান আইউবী খৃস্টানদের এই প্রস্তুতি সম্পর্কে অনবহিত। আমরা যদি ধরা পড়ে যাই আর এই তথ্য আমাদের সঙ্গে কয়েদখানায় চলে যায় কিংবা জল্লাদের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তাহলে সকল যুদ্ধে বিজয়ী সেনানায়ক বলে খ্যাত সুলতান আইউবী ইতিহাসে পরাজিত সিপাহসালার আখ্যায়িত হবেন।
না- চেঙ্গিস পূর্ণ আস্থা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো- সে আমাকে ধোকা দেবে না। সে মুসলমান। আমি আগামী রাতে আবার তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো। আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করবো। এখন আর আমাদের ইমামের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এই তথ্য আমি নিজেই কায়রো নিয়ে যাবো। আমার হৃদয়ের রাণী আমার সঙ্গে থাকবে। তবে আমার অবর্তমানে কারো মনে সন্দেহ জাগবে না, আমি এখান থেকে তথ্য নিয়ে পালিয়ে গেছি। কারণ, মেয়েটিও যেহেতু আমার সঙ্গে যাবে, তাই প্রচার করে দিও তুমি আমাকে ও তাকে গোপনে মিলিত হতে দেখেছে এবং আমি মেয়েটিকে নিয়ে জেরুজালেমের দিকে চলে গেছি। ঘটনাটিকে প্রেমঘটিত বলে প্রচার করতে হবে।
