বৃদ্ধ জানতো না লোকটা পালায়নি; বরং আমি তাকে পাতাল থেকে সরিয়ে উপরের এক কক্ষে রেখেছি। আমার মনিব যখন আমাকে লোকটার পলায়নের খবর শোনাচ্ছিলেন, সেই পলাতক গোয়েন্দা উক্ত শহরেই অবস্থান করছিলো। আমি আমার এক মুসলমান চাকরের মাধ্যমে তার আত্মগোপনের ব্যবস্থা করেছিলাম। সেও তোমারই ন্যায় সুদর্শন যুবক ছিলো। পাতাল কক্ষ তাকে লাশে পরিণত করেছিলো। আমি তাকে ভিটামিন ওষুধ ও পুষ্টিকর খাবার খাইয়ে সুস্থ করে তুলেছিলাম। রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে আমি তার কাছে যেতাম। সে আমার সত্ত্বার মধ্যে ঈমান জাগ্রত করে দিয়েছে। আমি তাকে বলে দিয়েছিলাম, আমি মুসলিম কন্যা। এখন তোমাকে যে কাহিনী শোনাচ্ছি, তাকেও শুনিয়েছিলাম। সে আমাকে বলেছিলো, তুমি আমার সঙ্গে চলল। আমি বললাম, আমাকে গুপ্তচরবৃত্তির কৌশল শিখিয়ে দাও। আমি নিজের জাতি ও ধর্মের জন্য কিছু করতে চাই। সে আমাকে আক্রার তিনজন লোকের নাম-ঠিকানা বলেছিলো। পরে তাদের সঙ্গে সাক্ষাতেরও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো।
লোকটা সুস্থ্য হয়ে উঠলে আমি তাকে শহর থেকে বেরিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে দেই। তার চলে যাওয়ার পর আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তার সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে থাকি। তারা আমাকে গুপ্তচরবৃত্তির পাঠ শেখাতে থাকে। কোর্স সমাপ্ত করে একসময় আমি তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ কাজ করতে শুরু করি। একে তো আমি উচ্চপদসস্থ একজন সেনা অফিসারের রক্ষিতা, তদুপরি আমার রূপ-যৌবনের কারণে অন্য বহু অফিসার আমার বন্ধুত্বের প্রত্যাশী ছিলো। এগুলোকে আমি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। সম্ভ্রম তো আগেই খুইয়ে ফেলেছি। নির্লজ্জতা এবং যার-তার বিছানায় রাত কাটানো আমার স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। পাপী লোকদের সঙ্গে জীবন যাপন করে আমি একজন প্রতারক হয়ে ওঠেছিলাম। তাদেরকে অনেক সুদর্শন টোপ দিয়েছি এবং মুসলমানদের অনেক দামি দামি তথ্য দিয়েছি। এই যে গোয়েন্দার কাহিনী শোনালাম, সে আমাকে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর কথা শোনাতো। আমি আইউবীকে ফেরেশতা মনে করি। আমার মনে আকাঙ্খ জাগে, আমি জাতির জন্য কিছু করে যাবো এবং একবারের জন্য হলেও সুলতান আইউবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো আর সেই সাক্ষাতকেই আমি আমার হজ্ব মনে করবো। এখন আমি সেই কমান্ডারের সঙ্গে এখানে এসেছি। না এসে পারিনি। খৃস্টানরা বিপুল শক্তি নিয়ে মুসলমানদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করতে যাচ্ছে। আমি তাদের সমস্ত তথ্য জেনে নিয়েছি। এখন আমার এমন একজন লোক প্রয়োজন, যে আইউবীর গুপ্তচর।
এতো বীরত্বের সঙ্গে তুমি এসব তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছো কেনো? চেঙ্গিস মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে- তুমি সত্যিই যদি গোয়েন্দা হয়ে থাকো, তাহলে তুমি একেবারেই আনাড়ি। তুমি আমার ভালোবাসার উপর নির্ভর করছে। যদি বলি, আমি তোমা অপেক্ষা কুশকে বেশি ভালোবাসি এবং আমার অফাদারী ক্রুশের প্রতি, তাহলে তুমি কী করবে? বুদ্ধিমান গোয়েন্দা কর্তব্যের খাতিরে নিজের সন্তানকেও কুরবান করে থাকে।
যদি আসল কথাটা বলি, তাহলে মানতে বাধ্য হবে। আমি আনাড়ি নই- মেয়েটি বললো- আমি জানি, নিশ্চিত করেই জানি, তুমি খৃস্টান নও-তুমি মুসলমান এবং মিসরের চর।
রাশেদ চেঙ্গিস নিজের অলক্ষ্যেই চমকে ওঠে, যেনো মেয়েটি তাকে দংশন করেছে। মদের নেশা আর রোমাঞ্চকর আবেগের মাদকতা সহসা এমনভাবে উবে যায়, যেনো ধনুক থেকে তীর বেরিয়ে গেছে। চেঙ্গিস কিছু বলার চেষ্টা করে। কিন্তু মনে হলো যেনো তার কিছুই বলার নেই। মেয়েটি তো ঠিকই বলেছে।
রাশেদ চেঙ্গিস মেয়েটির চাপা হাসির শব্দ শুনতে পায়। মেয়েটি বললো- বলো, আমি কি আনাড়ি?
কোন উত্তর দেয়া চেঙ্গিসের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। মেয়েটি সত্যিই যদি মুসলমান হয়ে থাকে, তাহলে নিজের পরিচয়টা কি স্বীকার করে নেয়া উচিত? নিয়ম তো ছিলো এক দলের গোয়েন্দা নিজ দেশেরই অপর দলের কাছেও পরিচয় গোপন রাখবে। চেঙ্গিস তো এও জানে না, মেয়েটা কোন্ স্তরের গোয়েন্দা। এমনও তো হতে পারে, সে যা বলেছে সবই মিথ্যা এবং আসলেই সে খৃস্টানদের গুপ্তচর। তাছাড়া সুলতান আইউবীর তো কোন নারীকে গুপ্তচরবৃত্তিতে ব্যবহার করেন না। এই মেয়েটি যদি মুসলমানদের চরবৃত্তি করে থাকে, তাহলে সম্পূর্ণ নিজের থেকেই করছে। এমন একটি মেয়েকে বিশ্বাস করা ঠিক হয়নি।
চুপ হয়ে গেলে কেন?- মেয়েটি জিজ্ঞাসা করে- আমি কি ভুল বলেছি?
সম্পূর্ণ ভুল বলেছে- রাশেদ চেঙ্গিস জবাব দেয়- তুমি আমাকে নমস্যায় ফেলে দিয়েছে।
কীরূপ সমস্যা? মেয়েটি জানতে চায়।
এই যেমন আমি তোমাকে গ্রেফতার করাবো, নাকি ভালোবাসার খাতিরে চুপ থাকবো–চেঙ্গিস বললো- আমি খৃস্টান এবং পাক্কা ক্রুসেডার।
দুজনই মাটিতে বসা। মেয়েটি নিজের উরুর নীচ থেকে কিছু একটা বের করে চেঙ্গিসের কোলের মধ্যে রেখে দিয়ে বললো- এই নাও তোমার দাড়ি। কাল যখন তুমি আমার কাছে ছিলে, তখন তোমার চোগার পকেট থেকে এগুলো বের করেছিলাম। আজো বের করে নিয়েছি। কিন্তু তুমি কালও টের পাওনি, আজও না।
রাশেদ চেঙ্গিস মেয়েটির ভালোবাসা এবং মদের নেশায় এমনই মজে গিয়েছিলো যে, তার কোনো হুশ-জ্ঞান ছিলো না।
এক রাতে এই দাড়ি আমি তোমার মুখে দেখেছিলামও- মেয়েটি বললো- এই দাড়ি স্থাপন করে তুমি কক্ষ থেকে বের হয়েছিলে। আমি তোমাকে পথে থামিয়ে দেই এবং তুমি যখন আমাকে বাহুতে জড়িয়ে ধরেছিলে, তখন তোমার চোগার উভয় পকেটে হাত ঢুকিয়ে ছিলাম। আমার হাত দাড়ি অনুভব করেছিলো।
