***
রাশেদ চেঙ্গিসের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। সবুজঘেরা এলাকা দিয়ে অতিক্রম করার সময় মেয়েটি ঠিকই তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে যায়। চেঙ্গিস কখনো মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করেনি, সে কোথায় থাকে এবং কীভাবে দেখে ফেলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও প্রশ্নটা করার ফোরসত পায়নি সে। কারণ, সাক্ষাৎ মাত্রই দুজনে প্রেমে মজে যাচ্ছে আর মেয়েটি একথা ওকথায় তাকে ব্যস্ত রাখছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সে ওখানেই ধারে কাছে কোথাও থাকে এবং চেঙ্গিসের পায়ের শব্দ শুনেই বেরিয়ে আসে। কিন্তু চেঙ্গিস বিষয়টি ভেবে দেখেনি। আজ রাতেও বরাবরের ন্যায় একই ঘটনা ঘটলো। চেঙ্গিস ইমামের কাছে যেতে পারলো না। কিন্তু তার মনে কোন অনুতাপও জাগলো না। মুহূর্ত মধ্যে মেয়েটি তাকে প্রেমে মজিয়ে ফেলে। আজ সে এই প্রথম করুণভাবে নিজের অসহায়ত্ব ও দুঃখের কাহিনী শোনাতে শুরু করে যে, চেঙ্গিসের পা উপড়ে যায়।
আমাকে তোমার আশ্রয়ে নিয়ে নাও- মেয়েটি গভীর আবেগের সাথে কম্পিত কণ্ঠে বললো- দর্শকরা আমাকে রাণী-রাজকন্যা মনে করে। কিন্তু বাস্তবে আমার জীবনটা এমন একটা জাহান্নাম, যাকে কাছে থেকে দেখলে তোমার মাথার চুলের আগা থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত সমস্ত শরীর কেঁপে ওঠবে। আমি মুসলিম পিতা-মাতার সন্তান। কিন্তু রূপ আমাকে এমন এক অত্যাচারের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে নির্যাতন থেকে মুক্তি লাভের কোন লক্ষণ আমি দেখতে পাচ্ছি না। আমার বয়স যখন পনের বছর ছিলো, তখন আমার পিতা আমাকে এক আরব ব্যবসায়ীর নিকট বিক্রি করে দেন। আব্বা গরীব ছিলেন না। তবে ছিলেন অর্থের কুমির। আমরা ছয় বোন ছিলাম। তিনি আমাদেরকে একদম দেখতে পারতেন না। আমার বড় দুবোন পিতার আচরণে বিরক্ত হয়ে দুব্যক্তির হাত ধরে চলে যায়। আর আমাকে তিনি বিক্রি করে দেন। এক বছর পর ব্যবসায়ী আমাকে উপহারস্বরূপ এক খৃস্টান অফিসারের হাতে তুলে দেন।
কিছুদিন পর অফিসার যুদ্ধে নিহত হলে আমি তার সংসার থেকে পালিয়ে আসি। কিন্তু যাবো কোথায়! এক খৃস্টান আমাকে আশ্রয় প্রদান করে। কিন্তু আশ্রয়ের নামে সে আমার শরীরকে উপার্জনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলে। আমি বেশ্যা ছিলাম না। কিন্তু সে আমাকে কয়েক দিনের জন্য খৃস্টান বাহিনীর উচ্চস্তরের অফিসারদের গণিকা হিসেবে ভাড়া দিতে থাকে। সেই লোকটি এবং সে যাদের কাছে আমাকে প্রেরণ করতো, সবাই আমাকে অলংকার দিয়ে লাল করে দেয় এবং রাজকন্যার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে। এদিক থেকে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও সুখী ছিলাম। কিন্তু আত্মিক শান্তি আমার কপালে জুটেনি। এই পেশার সুবাদে বড় বড় সামরিক অফিসার-কর্মকর্তার সঙ্গে আমার উঠাবসা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ধীরে ধীরে আমি অভিজ্ঞ হয়ে উঠি। আমি সম্রাট ও শীর্ষ স্তরের কমান্ডারদের শয্যা পর্যন্ত পৌঁছে যাই। তারা আমাকে গুপ্তচরবৃত্তির প্রশিক্ষণ দিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে শুরু করে।
একবার আমাকে বাগদাদ পাঠানো হলো। দায়িত্ব দেয়া হলো নূরুদ্দীন জঙ্গীর এক সালারকে তার বিরুদ্ধে উস্কে দেয়া। আমি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্বটা পালন করেছি। আমি যদি তোমাকে আমার গুপ্তচরবৃত্তির পুরো কাহিনী শোনাতে শুরু করি, তাহলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবে। বোধ হয় বিশ্বাসও করবে না। কাহিনী অনেক দীর্ঘ। যা হোক সেই কমান্ডার আমাকে গণিকা হিসেবে রেখে দেয়। লোকটা বৃদ্ধ। তবে আমাকে নিয়ে বেশ ফুর্তি করতো। সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াতো। সম্ভবত অন্যদের বুঝাতে চাইতো, সে বৃদ্ধ নয় এবং আমার মতো একটি রূপসী যুবতীকে আনন্দে রাখতে সক্ষম। লোকটি আমার সকল আবদার-আকাঙ্খা পূরণ করতো। চাহিদার কথা মুখ দিয়ে বের করতে দেরি; কিন্তু দিতে বিলম্ব করতো না। আমি তার সঙ্গে আক্ৰায় ছিলাম। সেখানে ঘটনাক্রমে এক মুসলমান গোয়েন্দার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিলো। সে দামেশক থেকে এসেছিলো।
তার নাম কী? চেঙ্গিস জিজ্ঞেস করে।
নাম শুনে তোমার কী লাভ হবে? মেয়েটি উত্তর দেয়- তুমি তো তাকে চেনো না। আমার কথা শোনো। তোমার ভালোবাসা আমার মুখের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে, আমার হৃদয়ের দ্বার খুলে দিয়েছে। আমি তোমার সম্মুখে এমন সব তথ্যাদি ফাঁস করে দিচ্ছি, যা আমাকে কারাগারে পাঠাতে পারে, যেখানে মানুষরূপী হায়েনারা আমাকে অসহনীয় নির্যাতনে মেরে ফেলবে। কিন্তু আমি তোমার জন্য জীবন দিতে কুণ্ঠাবোধ করবো না। যা হোক, আমি বলছিলাম দামেশকের কথা। সেই গোয়েন্দা ধরা পড়েছিলো এবং তাকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হয়েছিলো।
আমি অনেক বড় একজন অফিসারের রক্ষিতা ছিলাম। সেই গোয়েন্দার তামাশা দেখার জন্য আমি পাতাল কক্ষে চলে গেলাম। তাকে এমন নিষ্ঠুর ও নির্মম অত্যাচার করা হচ্ছিলো যে, আমার গা শিউরে ওঠে। তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছিলো, তোমার সঙ্গীরা কোথায় এবং এ যাবত তুমি কী কী তথ্য জ্ঞাত হয়েছে? লোকটির পিঠ থেকে রক্ত ঝরছিলো। চেহারাটা নীল বর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু তারপরও সে বলছিলো- আমার শিরায় মুসলমান পিতার রক্ত প্রবাহমান। আমি আমার কোনো সহকর্মীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবো না। শুনে আমার শিরাগুলো সব সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভাবি, আমার শিরায়ও তো মুসলিম পিতামাতার রক্ত আছে। আমার মধ্যে ভূমিকম্পের ন্যায় এক ধরনের দোলা খেলে যায়। আমি সংকল্প করি এই মুসলমানটাকে পাতাল প্রকোষ্ট থেকে বের করবো। আমি আমার মনিবের পদমর্যাদা, নিজের রূপের জাল আর তিন-চার টুকরো সোনা ব্যবহার করি। একদিন সকালে আমার মনিব আমাকে খবর শোনালেন পাতাল কক্ষ থেকে মুসলমান গোয়েন্দাটা পালিয়ে গেছে।
