আরো দাও। চেঙ্গিস তৃপ্তি ও আনন্দের ঢেকুর তুলে বললো।
মেয়েটি চেঙ্গিসের হাতে ধরা পেয়ালাটা আবার ভরে দেয়। সে ধীরে ধীরে পান করতে থাকে। তারপর মেয়েটির মধ্যে হারিয়ে যায়।
আচ্ছা, আমরা এভাবে আর কতদিন লুকিয়ে লুকিয়ে মিলিত হবো? মেয়েটি বললো- একটু ভেবে দেখো, আমি কতো বড় যন্ত্রণার মধ্যে নিপতিত হয়ে আছি। আমার দেহের মালিক একজন আর হৃদয়ের অধিকারী অন্যজন- তুমি। তোমার ভালোবাসা তার ঘৃণাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন আর লোকটাকে মুহূর্তের জন্যও সহ্য করা আমার পক্ষে
সম্ভব নয়। চলো এখান থেকে পালিয়ে যাই।
কোথায় যাবে? চেঙ্গিস জিজ্ঞেস করে।
পৃথিবীটা অনেক প্রশস্ত- মেয়েটি জবাব দেয়- তুমি আমাকে এখান থেকে বের করো। বৃদ্ধ আমার যৌবনটাকে পিষে ফেলছে।
ঠিক আছে, যাবো–চেঙ্গিস বললো- কটা দিন অপেক্ষা করো। আচ্ছা, আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর এনেছো?
এনেছি- মেয়েটি বললো- আমাদের বাহিনীগুলো সমবেত হচ্ছে। কার বাহিনী কোথায় সমবেত হবে এবং তাদের উদ্দেশ্য কী, মেয়েটি চেঙ্গিসকে বিস্তারিত জানায়। তবে শেষ পরিকল্পনাটা এখনো সে জানতে পারেনি। চেঙ্গসি তাকে খুটিয়ে খুটিয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে।
দুজন আলাদা হয়ে দুদিকে চলে যায়।
এখন তারা দুজনে দুজনার।
***
আমি ইমাম পর্যন্ত পৌঁছতে পারিনি বটে- চেঙ্গিস ভিক্টরকে বললো তবে মেয়েটির নিকট থেকে নতুন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এনেছি। মেয়েটি আমার জালে ধরা পড়েছে এবং আমার হাতে খেলতে থাকবে।
আমার মনে হয় তুমিও তার জালে আটকা পড়ে গেছো- ভিক্টর সন্দেহের আঙুল তোলে- তোমার ভাবগতি বলছে, তার হৃদয় তোমার হৃদয়ে ঢুকে গেছে।
আমি তো তোমাকে আগেই বলে দিয়েছি, মেয়েটি আমার হৃদয়ে আসন গেড়ে বসেছে–চেঙ্গিস বললো- এখন সে এমনও বলেছে, সে আমার সঙ্গে পালিয়ে যাবে। আমি তাকে কদিন অপেক্ষা করতে বলেছি। তাকে নিয়ে আমি এখান থেকে পালিয়ে যাব। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, খৃস্টানদের পরিকল্পনা পুরোপুরি জানা হয়ে গেলে এসব তথ্য নিজেই কায়রো নিয়ে যাবো। আর মেয়েটিকেও সঙ্গে নেবো।
তাকে কখন বলবে, তুমি মুসলমান এবং এখানে গুপ্তচরবৃত্তি করার জন্য এসেছিলে?
মিসরের সীমান্তে প্রবেশ করে- চেঙ্গিস জবাব দেয়। এখানে তাকে সামান্যই বলবো।
চেঙ্গিস প্রেমের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। খৃস্টানদের তথ্য সংগ্রহের জন্য তার যতোটা না চিন্তা, তার চে বেশি ভাবনা কখন প্রেমিকার সঙ্গে মিলনের সময় আসবে। সে নিজেই অনুভব করছে, তার ভাবনার ধরন এবং গতিবিধিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসে গেছে। প্রথমবার মদপান করার পর মনে অনুতাপ জাগ্রত হয়েছিলো। কিন্তু গত রাতে নিজ হাতে পেয়ালা তুলে নিয়ে স্বেচ্ছায় ও স্বাচ্ছন্দ্যে মদপান করেছে। এখন এ কাজের জন্য তার কোনো অনুতাপ নেই। এ এক বিরাট পরিবর্তন।
সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ জানানো হলো, কয়েকজন খৃস্টান সম্রাট ও কমান্ডার আসবেন। তারা রেমন্ডের মেহমান হবেন। চেঙ্গিস তড়িঘড়ি প্রয়োজনীয় আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলে। তার জানা আছে, এসব মেহমানের আপ্যায়নের এক নম্বর উপকরণ মদ।
রাতে যথাসময়ে মেহমানগণ এসে উপস্থিত হন। অল্প কজন বিশিষ্ট মেহমান। চেঙ্গিস ও ভিক্টর বুঝে ফেলে, আজকের অনুষ্ঠানটা মূলত ভোজসভা নয়- গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। ভিক্টর ও চেঙ্গিস আসল কর্তব্য পালনের জন্য বিশেষভাবে তৎপর ও প্রস্তুত। বৈঠকে খৃস্টানদের ইন্টেলিজেন্স বিভাগের প্রধান হারমানও উপস্থিত আছেন। মদপানের পালা এবং আক্রমণ বিষয়ক আলোচনা শুরু হয়ে যায়। এখনকার কথোপকথন প্রস্তাব নয়- সিদ্ধান্ত। আছে পরিকল্পনার কাঠামোেও। তাদের কথাবার্তায় বুঝা গেলো, শীঘ্রই অভিযান শুরু হয়ে যাবে।
হারমানকে তার বিভাগের তৎপরতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। যেসব এলাকায় তাদের ফৌজ অবস্থান করছে, সেসব অঞ্চলের দায়িত্বশীলদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যেনো সালাহুদ্দীন আইউবীর গোয়েন্দাদের খুঁজে বের করে গ্রেফতার করে ফেলে। ত্রিপোলীর যেখানে তাদের সবচে বৃহৎ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, সেখানে আইউবীর গোয়েন্দাদের ধরার বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। হারমান আরো জানায়, এখানে শত্ৰু গোয়েন্দাদের একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদেরকে ব্যর্থ করে দেয়ার প্রচেষ্টা চলছে। একজন লোককে ধরতে পারলে তার মাধ্যমে পুরো গ্যাংটির সন্ধান বেরিয়ে আসবে। কায়রোর গোয়েন্দাদের নিকট নির্দেশনা পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ওখান থেকে গতকালই একজন এসেছিলো। সে বলেছে, সালাহুদ্দীন আইউবী জোরেশোরে ভর্তি ও প্রশিক্ষণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তিনি জেরুজালেম অভিমুখে যাত্রা করার ইচ্ছা রাখেন।
রাশেদ চেঙ্গিস ও ভিক্টর যেটুকু তথ্য পেয়েছে, তা-ই যদি কায়রো পৌঁছিয়ে দেয়া যায়, তা সুলতান আইউবীর জন্য যথেষ্ট ছিলো। খৃস্টানরা অতিসত্বর যাত্রা শুরু করবে এবং হাররান ও হাল্ব তাদের গন্তব্য এই সংবাদটা তাড়াতাড়ি সুলতান আইউবীর কাছে পৌঁছানো দরকার।
বৈঠক ভেঙে যায়। চেঙ্গিস ও ভিক্টর মধ্যরাতের পর ডিউটি শেষ করে। চেঙ্গিসের ইমামের নিকট যাওয়া দরকার। সে প্রতি রাতের ন্যায় পোশাক পরিবর্তন করে এবং কৃত্রিম দাড়িগুচ্ছ পোশাকের ভেতর লুকিয়ে নিয়ে রওনা দেয়। আজ তার যেতে অনেক রাত হয়ে গেছে। তাই পথে মেয়েটির হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কা নেই। চেঙ্গিস নিশ্চিন্তে বেরিয়ে পড়ে।
