আমি এতো কাঁচা নই ভিক্টর- চেঙ্গিস বললো- মেয়েটাকে মজলুম মনে হচ্ছে। ও যে রক্ষিতা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু রাজকন্যা বা বেশ্যা নয়। চাল-চলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, গহনা-অলংকার এসবের উপর ভিত্তি করে আমি তাকে শাহজাদি মনে করি। কিন্তু মনের দিক থেকে সে নির্যাতিতা। মেয়েটা পবিত্র ভালোবাসার প্রত্যাশী। তার সকরুণ নিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে চাইনি আমি। তুমি ভেবো না আমি তার হয়ে যাবো। তার ভালোবাসা প্রয়োজন- আমি তা তাকে দেবো। আমার তথ্য প্রয়োজন তা আমি তার কাছ থেকে নেবো।
তুমি মন থেকেই তাকে কামনা করছো বুঝি? ভিক্টর সন্দেহ প্রকাশ করে।
হা ভিক্টর- চেঙ্গিস জবাব দেয়- আমি তোমার থেকে কিছুই লুকাবো না। মেয়েটি আমার হৃদয়ে ঢুকে পড়েছে।
অন্তরে ঢুকে পড়া মেয়েরা পায়ের বেড়িতে পরিণত হয়ে যায় চেঙ্গিস।- ভিক্টর বললো- আমি তোমাকে এর চে বেশি আর কী বলতে পারি যে, কর্তব্যই সবার বড় ও সবচে পবিত্র। কর্তব্য ও প্রেমের মাঝে, নেশা ও চেতনার মাঝে, ঈমান ও আবেগের মাঝে এমন কোনো প্রাচীর থাকে না, যা অতিক্রম করা দুঃসাধ্য। থাকে চুলের ন্যায় সরু একটি রেখা, যা সামান্য পদস্খলনে মুছে যায় এবং মানুষ একদিক থেকে অন্যদিকে চলে যায়। এমনটা যেনো না হয় রাশেদু! তার থেকে তথ্য নিতে নিতে তুমিই বরং নিজেকে তার সম্মুখে উন্মোচিত করে ফেলো।
রাশেদ চেঙ্গিস একটা অট্টহাসি দিয়ে ভিক্টরের উরুতে চাপড় মেরে বললো- এমনটা হবে না দোস্ত, এমনটা হবে না।
আর স্মরণ রেখো বন্ধু!- ভিক্টর বললো- মদের সম্পর্ক শয়তানের সঙ্গে। শয়তানের যততগুলো গুণ আছে, সব মদের মধ্যে আছে। এই অভ্যাসটা গড়ে না ওঠে যেনো। মেয়েটাকে খুশি রাখার জন্য যতোটুকু পান করে চৈতন্য ঠিক রাখা যায়, তার বেশি পান করো না।
আচ্ছা, ইমামকে জানানো দরকার, রাতে বিশেষ কারণে আমি যেতে পারিনি। আজ রাতে আসবো। চেঙ্গিস বললো।
বাজারে চলে যাও। ভিক্টর বললো।
ভিক্টর নিজেই বাজারে চলে যায়। তাদের দু-চারজন সঙ্গী বাজারে ব্যবসার আড়ালে দায়িত্ব পালন করছে। ইমামের কাছে ছোটখাট সংবাদ তাদেরই মাধ্যমে পৌঁছানো যায়। ভিক্টর তাদের একজনকে সংবাদ বলে ফিরে আসে।
***
পরবর্তী রাত। চেঙ্গিস কাজ-কর্ম সেরে তাড়াতাড়ি অবসর হয়ে যায়। কক্ষে প্রবেশ করে ডিউটির পোশাক খুলে অন্য পোশাক পরে কৃত্রিম দাড়িগুচ্ছ পোশাকের তলে লুকিয়ে নেয়। তার ভয়, মেয়েটি হঠাৎ দেখে ফেললে দাড়ির রহস্য ফাঁস হয়ে যাবে। তার পরিকল্পনা, ইমামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ফিরে আসার পথে মেয়েটির সঙ্গে নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হবে। যাবেও সে পথেই। এ পথটি নিরাপদ এবং সংক্ষিপ্ত। চেঙ্গিস গাছ গাছালিতে পরিপূর্ণ এলাকাটিতে ঢুকে পড়ে। মাঝামাঝি স্থানে গিয়ে পৌঁছুলে একদিক থেকে একটি পরিচিত ছায়া এগিয়ে আসতে দেখে। চেঙ্গিসের পালানো সম্ভব নয়। ছায়াটা আত্মপ্রকাশ করেছে নিকট থেকে। তৎক্ষণাৎই তার সম্মুখে এসে পৌঁছে বলে ওঠে- আজ তুমি আগে-ভাগে এসে পড়েছে, এটা আমার ভালোবাসার ক্রিয়া।
আর তুমি এতো তাড়াতাড়ি এসে এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেননা? চেঙ্গিস জিজ্ঞেস করে- মধ্যরাতের ঘণ্টা তো এখনো বাজেনি।
আমার মন বলছিলো তুমি ঘণ্টা বাজার আগেই এসে পড়বে। মেয়েটি বললো।
কিন্তু আমি ভাবিনি তুমি এতো তাড়াতাড়ি এসে পড়বে–চেঙ্গিস বললো- আমি একটি কাজে যাচ্ছিলাম। এ পথেই ফেরার ইচ্ছা ছিলো।
কাজটা যদি বেশি জরুরী হয়, তাহলে যাও- মেয়েটি বললো- প্রয়োজন হলে তোমার অপেক্ষায় আমি সারারাত এখানে দাঁড়িয়ে থাকবো।
কিন্তু এখন তো আমি এখান থেকে নড়তেই পারবো না–চেঙ্গিস মেয়েটিকে বাহুতে জড়িয়ে ধরতে ধরতে বললো।
মেয়েটির উন্মুক্ত রেশমী চুলের সৌরভ এবং গায়ের পোশাকে মাখানো সুগন্ধি চেঙ্গিসকে মাতোয়ারা করে তোলে। চেঙ্গিস ইমামের নিকট যাওয়ার পরিকল্পনা মুলতবী করে দেয়। ভাবে, যা-ই হোক না কেনো মেয়েটি খৃস্টান তো বটে। হৃদয়ে প্রভুর প্রতি অনীহা থাকতে পারে। কিন্তু নিজের জাতি এবং ক্রুশকে তো ধোঁকা দিতে পারে না। চেঙ্গিস আশঙ্কা করে, সে যদি ইমামের নিকট যায়, তাহলে মেয়েটি সন্দেহবশত তার পিছু নিতে পারে। তাই ভালোবাসার তীব্রতা প্রকাশ করে সম্মুখে কাজে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়।
মেয়েটি পেয়ালা দুটো মাটিতে রেখে তাতে সোরাহী থেকে মদ ঢেলে একটি পেয়ালা চেঙ্গিসের দিকে এগিয়ে দেয়। চেঙ্গিস অনিচ্ছা প্রকাশ করে তুমি যদি বিষের পেয়ালাও দাও পান করবো; কিন্তু মদপান করবো না।
খৃস্টান হয়ে মদকে ঘৃণা করছো কেনো? মেয়েটি জিজ্ঞেস করে।
মদের নেশা তোমার রূপ ও ভালোবাসার নেশার উপর জয়ী হয়ে যায় চেঙ্গিস বললো- কৃত্রিম ও দৈহিক হওয়ার কারণে তোমার অন্তর যেমন বিত্ত-বৈভব ও ভোগ-বিলাসকে গ্রহণ করেনি, তেমনি আমার হৃদয় মদকে বরণ করছে না। কারণ, এর নেশাও কৃত্রিম। আমার উপর তুমি তোমার নেশা আচ্ছন্ন করে দাও।
মেয়েটি মাথাটা রাশেদ চেঙ্গিসের কোলের মধ্যে ঢেলে দিয়ে তার উপর নিজের নেশা আচ্ছন্ন করে দেয়। রাশেদ চেঙ্গিস এতোক্ষণ তার সঙ্গে যেসর কথাবার্তা বলেছে, তা ছিলো কৃত্রিম ও মিথ্যা। কিন্তু এবার সত্যি সত্যি মেয়েটির নেশা তাকে পেয়ে বসেছে। চেঙ্গিস নারীর স্বাদ অনুভব করতে শুরু করে। এখন সে আসক্ত নারীর আসক্ত। এই আসক্তির মধ্যে নিজেই পেয়ালাটা তুলে এক নিঃশ্বাসে সবটুকু গিলে ফেলে।
