আমি মদ পছন্দ করি না। চেঙ্গিস বললো।
খোদা তোমাকে পুরুষালী রূপ আর চিত্তাকর্ষক দেহবল্লরী দান করেছেন- মেয়েটি বললো- কিন্তু মদপান না করে প্রমাণ করছো, তুমি পাথরের নিষ্প্রাণ একটি মূর্তি বৈ নও।
অনেক্ষণ পর্যন্ত পীড়াপীড়ি ও প্রত্যাখ্যানের সংঘাত চলতে থাকে। অবশেষে চেঙ্গিস রূপসী মেয়েটাকে জালে আটকানোর নিমিত্তে তার হাত থেকে মদের পেয়ালাটা নিয়ে নেয়। তারপর পেয়ালায় মুখ লাগায়। মেয়েটি তার পেয়ালায় আরো মদ ঢেলে দেয়। চেঙ্গিস কম্পিত হাতে পেয়ালাটা পুনরায় ঠোঁটের সঙ্গে লাগিয়ে ধীরে ধীরে পেয়ালাটা খালি করে ফেলে। খানিক পর সে অনুভব করতে শুরু করে, যেনো তার কল্পনার জগতে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। তার আশপাশে প্রাচীরসমূহ ভেঙে পড়ছে এবং সে স্বাধীন হয়ে গেছে মনে করে আনন্দে আপ্লুত হয়ে ওঠে। যেনো তাকে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি তাকে দেয়া হয়েছে।
রাশেদ চেঙ্গিস নারীর পরশের সাথে পরিচিত ছিলো না। বিয়েও করেনি। অবিবাহিত হওয়া এবং পেছনে লেজুড় না থাকার কারণেই তাকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য বেছে নেয়া হয়েছিলো। এটি তার প্রাথমিক গুণ। কিন্তু একটি অতিশয় রূপসী মেয়ে তাকে মদপান করিয়ে যখন তার গা ঘেঁষে বসে পড়লো, তখন অবিবাহিত পরিচয়টাই তার জন্য দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ালো। মেয়েটি তাকে কোন পাপের আহ্বান জানাচ্ছে না। তার কাছে সে সেই ভালোবাসা প্রত্যাশা করছে, যা তার আত্মাকে শান্তি দেবে। যেহেতু চেঙ্গিসের চরিত্রে পাপ প্রবণতা ছিলো না, তাই এ মুহূর্তেও তার মনে কোন বাজে ইচ্ছা জাগ্রত হলো না। কিন্তু রূপসী মেয়েটির রেশমী চুলের পরশ, পিপাসু আবেগময় বক্তব্য, সুডৌল বাহু আর সুকোমল গণ্ডদেশ রাশেদ চেঙ্গিসকে সেই চেঙ্গিস থাকতে দিলো না, যা সে দুটেক মদ কণ্ঠনালীতে প্রবেশের আগে ছিলো।
রাত কেটে যাচ্ছে।
রাশেদ চেঙ্গিস যখন আলাদা হওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়, তখন মেয়েটি তাকে জিজ্ঞেস করে- তুমি আমাকে যুদ্ধ সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করেছিলে। আমার সবকিছু জানা নেই। তুমি যদি সবগুলো প্রশ্নের উত্তর পেতে চাও, তাহলে এসব প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করে আগামী রাতে আবার দেখা করবো।
অকস্মাৎ চেঙ্গিসের মধ্যে সেই চেঙ্গিস জেগে ওঠে, সে সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা ছিলো। তার কর্তব্যের কথা মনে পড়ে যায়। এ অনুভূতিও জেগে ওঠে, তার উপর মদ ও নারীর নেশা আচ্ছন্ন হয়ে আছে এবং তাকে অনেক সতর্ক থাকতে হবে। সে মেয়েটিকে বললো- তোমার মতো আমারও যুদ্ধের প্রতি কোনো আন্তরিকতা নেই। আমি শান্তির জীবনে বিশ্বাসী। ফৌজ অভিযানে রওনা হলে মদ নিয়ে আমাকেও তো যেতে হবে। তাই জানতে চেয়েছিলাম, আসলেই সহসা কোনো যুদ্ধ হচ্ছে কিনা এবং হলে কোথায় হবে এবং ফৌজ কোন্ পথে অগ্রসর হবে।
***
ফিরে এসে রাশেদ চেঙ্গিস ভিক্টরকে তখনই ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা সমীচীন মনে করলো না। তার কষ্টটা হলো, সে ইমামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রওনা হয়েছিলো; কিন্তু পথে মেয়েটি তাকে আটকে দিলো এবং তাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেলো। সময়টা রাতের শেষ প্রহর। খৃস্টানদের এই বিলাসী জগতে সকাল সকাল জাগ্রত হওয়ার কোনো নিয়ম নেই। চেঙ্গিস ইমামের কাছে যেতে পারতো। কিন্তু মুখে মদের গন্ধ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করার সাহস হলো না। তার মনে অনুভূতি জাগ্রত হলো, মদপান গুরুতর পাপ। কিন্তু পাপটা সে করে ফেলেছে। তথাপি যখন মেয়েটি তার মনের পর্দায় ভেসে ওঠলো, তার মধ্যে কোন দোষ দেখতে পেলো না। প্রেমের মাদকতা তাকে নতুন করে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। নারীর কল্পনার সঙ্গে কোনো পাপের সংশ্লিষ্টতা ছিলো না। এটি পবিত্র ভালোবাসার আনন্দ, যা ত্যাগ করতে চেঙ্গিস প্রস্তুত নয়।
চেঙ্গিস শুয়ে পড়ে। তার দুচোখের পাতা বুজে আসে।
ভিক্টর চেঙ্গিসকে জাগিয়ে তোলে। সূর্যটা মাথার উপর উঠে এসেছে। ভিক্টরই প্রথম কথা বলে- ইমামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসেছো? কী কথা হয়েছে?
না- চেঙ্গিস ভিক্টরকে অবাক করে দেয়- মসজিদ পর্যন্ত যেতে পারিনি।
চেঙ্গিস ভিক্টরকে ঘটনার ইতিবৃত্ত শুনিয়ে বললো- যদি মদপান না করতাম, তাহলে মেয়েটি থেকে আলাদা হওয়ার পরও ইমামের কাছে যেতে পারতাম। সময় ছিলো।
মদপান করে ভালো করোনি- ভিক্টর বললো- আগামীতে আর পান করো না। মেয়েটিকে হাত করার জন্য দুঢোক পান করেছে বেশ; কিন্তু কর্তব্য পালনে ত্রুটি করা ঠিক হয়নি। ইমামের কাছে যাওয়া তোমার কর্তব্য ছিলো। ইমাম সাহেব তোমার অপেক্ষায় পেরেশান হয়ে থাকবেন। দিনের বেলা যাওয়া ঠিক হবে না। আজ রাতে অবশ্যই যেতে হবে।
ভিক্টর চেঙ্গিসকে জিজ্ঞেস করে- তুমি তো আনাড়ি নও চেঙ্গিস। নিজেই তো বুঝতে পারো মেয়েটির উদ্দেশ্য কী এবং সত্যিই সে অন্তর থেকে তোমাকে ভালোবাসে কিনা? তোমাকে বুঝতে হবে, সে তোমাকে ধোকা দিচ্ছে, নাকি তোমাকে মনোরঞ্জনের উপকরণে পরিণত করতে চাচ্ছে। তার ফেরেশতাও তো জানে না তুমি গুপ্তচর। আমি তোমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া আবশ্যক মনে করি যে, নারীর যাদু ফেরাউনদের ন্যায় রাজাদেরকেও সিংহসান থেকে নামিয়ে খড়-কুটোর মধ্যে গুম করে ফেলেছে। নিজের জাতিটাকেই দেখো না, খৃস্টানদের প্রেরিত চিত্তহারি মেয়েরা মিসরে বিদ্রোহের আগুন পর্যন্ত প্রজ্বলিত করেছে এবং সুলতান আইউবীর অতিশয় বিশ্বস্ত সালারদেরকে গাদ্দারে পরিণত করেছে!
