***
রাশেদ চেঙ্গিস যে সময়ে মেয়েটির সঙ্গে বাগিচায় অবস্থান করছিলো, সে সময়ে তার সঙ্গী ভিক্টর মেহমানদের মাঝে ঘোরাফেরা করছিলো। এই ফাঁকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে ফেলেছে সে। খৃস্টানরা অগ্রযাত্রা কোন্দিকে করবে, আক্রমণ কোথায় করবে ইত্যাদি সকল তথ্য জেনে ফেলেছে ভিক্টর। কিন্তু বিষয়গুলো এখনো প্রস্তাব ও পরামর্শের পর্যায়েই রয়েছে। রাশেদ চেঙ্গিসও মেহমানদের মাঝে ফিরে গেছে এবং রেনাল্টের আশপাশে ঘুরতে শুরু করেছে। রেনাল্ট সঙ্গীদের সামনে তার সেই প্রত্যয়ের কথাই পুর্নব্যক্ত করছে, যা তিনি কনফান্সে ব্যক্ত করেছিলেন। তার হাতে এতো প্রবল সামরিক শক্তি রয়েছে, যার উপর ভিত্তি করেই তিনি এতো বড় দাবি করছেন।
রাত কেটে গেছে। পরদিন চেঙ্গিসের নিকট তার দলের এক গোয়েন্দা এসে পৌঁছে। চেঙ্গিস তাকে মধ্য রাতের পর ইমামের কাছে যেতে বলে। দিন কেটে রাত এলো। চেঙ্গিস ও ভিক্টর রেমন্ডের ভোজসভায় ডিউটিতে চলে যায়। যখন অবসর হয়, তখন গভীর রাত। চেঙ্গিস ভিক্টরকে এখনো বলেনি, একটি মেয়ে তাকে প্রেম নিবেদন করেছে। ডিউটি থেকে অবসর হয়ে সে ভিক্টরকে বললো, আমি পোশাক পরিবর্তন করে ইমামের কাছে যাচ্ছি। ভিক্টর ইমামকে অবহিত করার জন্য তাকে বেশ কিছু তথ্য প্রদান করে।
চেঙ্গিস পোশাক পরিবর্তন করে এবং মুখে কৃত্রিম দাড়ি স্থাপন করে মুখমন্ডলটা ঢেকে কক্ষ থেকে বের হয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। ভবনটির খানিক দূরে সবুজ ভূমি, যাতে বিপুল গাছ-গাছালির সমারোহ। আশপাশে কোনো বসতি নেই। এই প্রাকৃতিক বাগিচাটির মধ্য দিয়েই চেঙ্গিসকে যেতে হচ্ছে।
চেঙ্গিস সবে বাগানে ঢুকেছে। অমনি একটি বৃক্ষের আড়াল থেকে এক ছায়ামূর্তি আত্মপ্রকাশ করে তার দিকে এগুতে শুরু করে। চেঙ্গিস ঝটপট মুখমন্ডল থেকে কৃত্রিম দাড়িগুলো খুলে চোগার পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে। তার ধারণা, এখানে এখানকারই তার পরিচিত কোনো চাকর ছাড়া অন্য কেউ আসতে পারে না। সে হাঁটার গতি কমিয়ে দিয়ে ধীর পায়ে পায়চারি করতে শুরু করে।
ছায়াটা ডান দিক থেকে আসছিলো। নিকটে এসেই বলে ওঠলো বলেছিলাম না, আমিই তোমাকে খুঁজে নেবো। চেঙ্গিস একটি নারীকণ্ঠ শুনতে পায়। গত রাতের সেই মেয়েটি।
এতো মেহমান, এতো কাজ- আমার মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছে চেঙ্গিস বললো- হাওয়া খাওয়ার জন্য এদিকে চলে আসলাম।
আমি তোমার কক্ষের দিকে আসছিলাম- মেয়েটি বললো- তোমাকে এদিকে আসতে দেখলাম। কিন্তু তোমার পেছনে পেছনে না এসে ওদিক দিয়ে আসলাম। যাতে কেউ দেখতে না পায়। বসবে, নাকি পায়চারিই করবে? আমি সোরাহী আর দুটি পেয়ালা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। মেয়েটি হেসে ওঠে।
রাশেদ চেঙ্গিস মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলো না, তুমি থাকো কোথায় আর এতো রাতে কোথা থেকে লাফিয়ে পড়েছো? এ কথাও জানতে চায়নি, তুমি যার গণিকা, এই গভীর রাতে সে তোমাকে খুঁজবে কিনা। তার বিশ্বাস, মেয়েটি আবেগ দ্বারা তাড়িত এবং মাথায় ঝুঁকি বরণ করে নিচ্ছে। তথ্য নেয়ার জন্য চেঙ্গিস তাকে জিজ্ঞেস করলো- তুমি তোমার কমান্ডার প্রভু থেকে মুক্তি পেতে চাচ্ছো। এটা তখন সম্ভব হবে, যখন তিনি যুদ্ধে চলে যাবেন। কিন্তু এমন সম্ভাবনা চোখে পড়ছে না। আচ্ছা, তিনি কোন্ ফৌজে আছেন?
তিনি বল্ডউইনের ফৌজের হাইকমান্ডের সেনাপতি- মেয়েটি উত্তর দেয়- সম্ভবত যুদ্ধে চলে যাবেন। কিন্তু তিনি আমাকে ও অন্যান্য মেয়েদেরকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন।
যুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা আছে নাকি?–চেঙ্গিস জিজ্ঞেস করে- এখানে কেননা এসেছো?
বল্ডউইন তাকে এখানে এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছেন যে, তিনি যুদ্ধের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবেন। মেয়েটি উত্তর দেয়।
সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ কোথায়? চেঙ্গিস জিজ্ঞেস করে।
তা তো জানি না- মেয়েটি বললো- তোমার প্রয়োজন হলে জিজ্ঞেস করে বলবো।
রাশেদ চেঙ্গিস মেয়েটিকে আরো বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করে। মেয়েটির যা যা জানা ছিলো বলে দেয় এবং যা জানা ছিলো না, সে সম্পর্কে বলে, আমি জেনে তোমাকে পরে জানাবো।
আচ্ছা, কে লড়াই করলো আর কে জয়লাভ করলো, তাতে তোমার কী আসে-যায়?- মেয়েটি আবেগময় ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে- তিনি যদি আমাকে যুদ্ধের মাঠে যেতে বলেন, আমি যাবো না। আমি তো তার স্ত্রী নই। আমি না আমার বর্তমান প্রভুর দাসী, না সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে আমার শত্রুতা আছে। আমাকে এতোই অপদস্থ করা হয়েছে যে, এদের প্রত্যেককে যারা নিজেদেরকে ক্রুশের মোহাফেজ মনে করে বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলতে ইচ্ছে হয়।
আবেগে আপ্লুত হয়ে মেয়েটি রাশেদ চেঙ্গিসকে ধরে বসিয়ে ফেলে। পেয়ালা দুটো মাটিতে রেখে তাতে মদ ঢালে এবং একটি পেয়ালা চেঙ্গিসের হাতে দিয়ে বললো- এমন নির্জন আর গভীর অন্ধকার রাতের রোমাঞ্চকে যুদ্ধের আলাপ দিয়ে নষ্ট করো না, নাও পান করো।
চেঙ্গিস সমস্যায় পড়ে যায়। দেড় বছর যাবত এই মদ্যপদের মাঝে জীবন অতিবাহিত করছে চেঙ্গিস। নিজ হাতে তাদের মদপান করাচ্ছে। কিন্তু নিজে কখনো এক ঢোকও পান করেনি। এই পাপপূর্ণ পরিবেশে যেখানে প্রতি মুহূর্তে চলে লোভনীয় পাপের আহ্বান, সেখানেও চেঙ্গিস নিজের ঈমানে কলঙ্কের দাগ পড়তে দেয়নি। এখন এমন একটি মেয়ে তার হাতে এসে ধরা দিয়েছে, যার মাধ্যমে সে নিজের কর্তব্য ভালোভাবে পালন করতে পারতো। কিন্তু মেয়েটি তার ঠোঁটের সামনে মদের পেয়ালা এগিয়ে ধরলো। আশঙ্কা হচ্ছে, আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে মেয়েটি ফসকে যেতে পারে। চেঙ্গিসের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে কর্তব্য পালনের খাতিরে পেয়ালাটা হাতে নিয়ে দুঢোক পান করে নেবে, নাকি এমন মূল্যবান মেয়েটাকে হাতছাড়া করে ফেলবে।
