সন্ধ্যার সময় একটি খঞ্জর ক্রয় করলাম। সমুদ্রের কূলে গিয়ে পায়চারী করতে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে রাতের আঁধার নেমে এলো। এবার আমি একদিকে হাঁটা দিলাম। আমার বোন যে গৃহে বন্দী, সে গৃহের আলো চোখে পড়লো। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। সতর্কপদে চলে গেলাম মহলের পিছনে। আমি স্বল্পবুদ্ধির হাবাগোবা ধরনের মানুষ। কিন্তু এক্ষণে এক বুদ্ধি খেলে যায় আমার মাথায়।
আমি মহলের পিছন দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লাম। একটি কক্ষ থেকে কোলাহলের শব্দ কানে ভেসে এলো। মদের আড্ডা বসেছিলো বোধ হয়। আমি একটি কক্ষে ঢুকতে চাইলাম। সামনে এসে দাঁড়ায় চাকর, বাধা দেয় আমাকে। তার বুকে খঞ্জর ধরে বোনের নাম বলে জিজ্ঞেস করলাম, ও কোথায় আছে বল। চাকর সিঁড়ি বেয়ে আমাকে উপরে নিয়ে গেলো। আমাকে নিয়ে একটি কক্ষের দ্বারে দাঁড়িয়ে বললো, এখানে। আমি ভিতরে ঢুকে পড়লাম; অমনি বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে যায় কক্ষের দরজা। ভিতরটা শূন্য।
কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে গেলো। বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত ঢুকে পড়লো কতগুলো মানুষ। হাতে তাদের তরবারী আর লাঠি। আমি কক্ষের জিনিসপত্র তুলে তুলে তাদের প্রতি ছুঁড়ে মারতে লাগলাম। পাগলের মতো যেখানে যা পেলাম, ভেঙ্গে চুরমার করলাম। তারা আমাকে ধরে ফেললো, অনেক মারলো। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।
আমার যখন জ্ঞান ফিরে এলো, তখন আমি হাতকড়া আর ডান্ডা-বেড়ীতে বাঁধা। আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে অভিযোগ দায়ের করা হলো, আমি ডাকাতি করেছি, বাদশাহর একজন দরবারীর ঘরে ভাংচুর করেছি, হত্যা করার উদ্দেশ্যে তিনজনকে জখম করেছি।
আমার আর্জি-ফরিয়াদ, আকুতি-মিনতি কেউ শুনলো না। ত্রিশ বছরের। দণ্ডাদেশ মাথায় নিয়ে আমি নিক্ষিপ্ত হলাম কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। কেটেছে মাত্র পাঁচ বছর। এতদিনে আমি মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছি। কারাজীবনের কষ্ট তোমরা জানো না। দিনে পশুর মত খাটান হয় আর রাতে কুকুরের মতো জিঞ্জির পরিয়ে ফেলে রাখা হয় অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। এ পাঁচ বছরে আমি জানতে পারিনি, আমার অন্ধ মা এবং স্ত্রী সন্তানেরা বেঁচে আছেন কি-না। ভয়ঙ্কর ডাকাত মনে করে আমার সঙ্গে সাক্ষাত করার সুযোগ পর্যন্ত দেয়া হয়নি কাউকে।
আমি সর্বক্ষণ ভাবতাম, খোদা সত্য না আমি সত্য। শুনেছিলাম, খোদ নিরপরাধ লোকদের শাস্তি দেন না। তাই প্রশ্ন জাগে, তিনি আমায় কোন্ পাপের শাস্তি দিলেন? কোন অপরাধের কারণে আমার নিষ্পাপ সন্তানদের তিনি অসহায় বানালেন?
পাঁচ পাঁচটি বছর এ ভাবনা আমার মাথায় তোলপাড় করতে থাকে। এই কিছুদিন আগে দুজন সেনা অফিসার যান কারাগারে। এখন আমরা যে মিশন নিয়ে এসেছি, তারা তার জন্য লোক খুঁজছিলেন। আমি প্রথমে নিজেকে পেশ করতে চাইনি। কারণ, এসব হল রাজা-বাদশাদের লড়াই। আর কোন রাজার প্রতি-ই আমার শ্রদ্ধা নেই। কিন্তু যখন আমি শুনলাম, কয়েকটি খৃষ্টান মেয়েকে মুসলমানদের কজা থেকে উদ্ধার করতে হবে, তখন আমার বোনের কথা মনে পড়ে যায়। আমাকে বলা হয়েছিলো, মুসলমান একটি ঘূণ্য জাতি। আমি মনস্থ করলাম, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও আমি এ অভিযানে অংশ নেবে। মুসলমানদের কবল থেকে খৃষ্টান মেয়েদের উদ্ধার করে আনবো। খোদা যদি সত্য হয়ে থাকেন, তাহলে এর বদৌলতে আমার বোনকে তিনি খৃষ্টানদের কবল থেকে মুক্ত করে দেবেন। অফিসারদের কাছে আমার সিদ্ধান্ত জানালাম। তারা আমাকে আরো বললেন, একজন মুসলমান রাজাকে হত্যা করতে হবে। আমি সে দায়িত্বও মাথায় তুলে নিলাম। নিজেকে পেশ করলাম তাদের হাতে। তবে শর্ত দিলাম, এর বিনিময়ে আমাকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দিতে হবে, যা আমি আমার পরিবারের হাতে তুলে দেবো। তারা আমাকে প্রতিশ্রুতি দিলেন। বললেন, যদি তুমি সমুদ্রের ওপারে মারাও যাও, তবু তোমার পরিবারকে আমরা এতে পরিমাণ অর্থ দেবো, যা তারা জীবনভর খেয়ে বাঁচতে পারবে, তাদের কারো কাছে হাত পাততে হবে না।
দুজন সঙ্গীর প্রতি ইঙ্গিত করে মিগনানা মারিউস বললো, এরা দুজনও আমার সঙ্গে কারাগারে ছিলো। এরাও নিজেদেরকে অফিসারদের হাতে তুলে দেয়। খুটিয়ে খুটিয়ে তারা আমাদের নানা কথা জিজ্ঞেস করে। আমরা নিশ্চয়তা দেই, নিজের জাতি ও ধর্মের সঙ্গে আমরা প্রতারণা করবো না। আমরা মূলত নিজেদের পরিবার-পরিজনের জন্য-ই জীবন বিক্রি করে দিয়েছি।
কারাগার থেকে বের হওয়ার প্রাক্কালে এক পাদ্রী আমাদেরকে বললেন, মুসলমান হত্যা কুরলে খোদা সব গুনাহ মাফ করে দেন। আর যদি তোমরা খৃষ্টান মেয়েদের মুক্ত করে আনতে পারো, তাহলে সোজা জান্নাতে চলে যাবে। আমি পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, খোদা আছেন কোথায়? জবাবে তিনি যা বললেন, তাতে আমি সান্ত্বনা পেলাম না। ক্রুশের উপর হাত রেখে আমি শপথ করলাম।
আমাদেরকে কারাগার থেকে বের করে আনা হলো। আমাকে বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হলো। আমার সামনে আমার পরিবারকে প্রচুর অর্থ দেয়া হলো। আমি । আশ্বস্ত হলাম। আমার বন্ধুরা! তোমরা আমাকে এখন সেই শপথ পূরণ করতে দাও। খোদা কোথায় আছেন, দেখতে চাই আমি। আচ্ছা, একজন মুসলমানকে হত্যা করলে আমি খোদাকে দেখতে পাবো তো?
তুমি একটা বদ্ধ পাগল। এতক্ষণ যা বব করলে, তাতে আমি বিবেক-বুদ্ধির গন্ধও পেলাম না। বললো কমাণ্ডার।
