এখানে নয়- মেয়েটি বললো- আমি বাইরে বাগানে যাচ্ছি। ওখানে নিয়ে আসো।
মেয়েটি মহল থেকে বের হয়ে বাগানে এক স্থানে গিয়ে বসে। এটি মহলের বাগিচা। রাশেদ চেঙ্গিস আকর্ষণীয় একটি সোরাহীতে করে মদ নিয়ে সেখানে চলে যায়। ওখানেও মেহমানগণ ছড়িয়ে রয়েছে। সকলেই যৌন উন্মাদ। প্রত্যেকের হাতে মদের পেয়ালা আর সঙ্গে একজন করে নারী। এই মেয়েটি একা। এমন রূপসী এক যুবতী একা কেন ভেবে চেঙ্গিস বিস্মিত হয়। মেহমানদের তো এর দেহের চার পাশে মাছির ন্যায় ভন ভন করার কথা ছিলো। এখানে চলে তো এ সবই। যা হোক, চেঙ্গিস মেয়েটির পেয়ালায় মদ ঢালতে শুরু করে। মেয়েটি জিজ্ঞেস করে, তোমার বাড়ি কোথায়? চেঙ্গিস ইউরোপের একটি গ্রামের নাম উল্লেখ করে বললো, কৈশোর থেকেই আমি সম্রাট রেমন্ডের রাজ কর্মচারি।
তুমি কি কিছু সময় আমার কাছে থাকতে পারো?-তরুণী জিজ্ঞেস করলো এবং পেয়ালাটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো- নাও, আমার পেয়ালা তুমি পান করো। আমি পরে পান করবো। মেয়েটির কণ্ঠে অনুনয় ও তৃষ্ণার সুর।
দেখুন, আমি একজন ভৃত্য- চেঙ্গিস বললো- আপনি রাজকন্যা। এ মুহূর্তে ডিউটি ছাড়া আমি অন্য কাজে সময় দিতে পারি না। এখনো আমি ডিউটিতে আছি।
এ মুহূর্তে আমাকে তোমার চাকরানি মনে করো- মেয়েটি রাশেদ চেঙ্গিসের হাত ধরে মুচকি একটা হাসি দিয়ে বললো- তুমি রাজপুত্র। মানুষের মনই বলে দেয় কে কী।
আপনি একা কেন? চেঙ্গিস জিজ্ঞাসা করে।
কারণ, আমার মন সায় দেয় না, যার প্রতি আমার ঘৃণা, তার সঙ্গে হাসবো, খেলা করবো- মেয়েটি জবাব দেয়- আমার যাকে ভালো লাগে, সে এখন আমার সঙ্গে। এখন আমি নিঃসঙ্গ নই, একা নই। কিন্তু তুমি আমার হাত থেকে পেয়ালাটা নাওনি!
কেউ দেখে ফেললে আমাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। চেঙ্গিস বললো।
তুমি যদি আমার পেয়ালা থেকে এক ঢোকও পান না করো, তাহলে আমিই তোমাকে শূলিতে দাঁড় করাবো- মেয়েটি বললো। মেয়েটির মুখে মুচকি হাসি। এবার আরো একটু এগিয়ে রাশেদ চেঙ্গিসের একেবারে কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বললো- পাগল! দেখো, তোমাকে আমার এতোই ভালো লাগে যে, একান্ত বাধ্য হয়েই আমি তোমাকে ডেকে এনেছি। আমাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করো না।
আমি মদপান করবো না। চেঙ্গিস বললো।
তা না করো- মেয়েটি বললো- কিন্তু আমি যখন এবং যেখানে ডাকি, তোমাকে যেতে হবে।
রাশেদ চেঙ্গিস বুদ্ধিমান ও অভিজ্ঞ মানুষ। উচ্চস্তরের একটি রূপসী মেয়ে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব-ভালোবাসার আকাঙ্খা প্রকাশ করছে বলে সে বিন্দুমাত্র বিস্মিত হয়নি। তার এ-ও মনে হয়, মেয়েটি হয়তো কোনো বৃদ্ধ সেনাপতির স্ত্রী কিংবা এমন এক পুরুষের বউ, যে এই মুহূর্তে অন্য কারো স্ত্রীকে নিয়ে আমোদে মেতে আছে। একটা কারণ তো স্পষ্ট যে, রাশেদ চেঙ্গিস সুদর্শন যুবক, যার দেহে আকর্ষণ আছে। কোন নারীর তাকে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা এটাই প্রথম নয়। খৃস্টান সম্রাট ও উচ্চপদস্ত অফিসারদের ভোজসভায় মদ পরিবেশেনকারী মেয়েরা অতিশয় রূপসী এবং চিত্তহারীই হয়ে থাকে। তাদের দুজন ইতিমধ্যে রাশেদ চেঙ্গিসের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানোর চেষ্টা করে ফেলেছে। কিন্তু চেঙ্গিস তাদের পাত্তা দেয়নি। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী তাকে যে দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন, তার দাবি ছিলো, নিজের চারিত্রিক পবিত্রতাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
প্রশিক্ষণের সময় আলী বিন সুফিয়ান তাকে ধারণা প্রদাণ করেছেন, মস্তিষ্ক যদি বিলাসিতার প্রতি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে মন থেকে কর্তব্যবোধ হারিয়ে যেতে শুরু করে। তাকে বুঝানো হয়েছে, নারী এমন এক বিষের ন্যায়, যে মানুষের ঈমান খেয়ে ফেলে। রেমন্ড আর ত্রিপোলীর মহলে তার অবস্থান ছিলো, সে যখন ইচ্ছা যে কোনো চাকর-চাররানিকে চাকুরিচ্যুৎ করতে পারতো। তাছাড়া তার ব্যক্তি চরিত্র ছিলো যাদুর ন্যায় ক্রিয়াশীল। তার এ-ও জানা ছিলো, খৃস্টানদের কোনো চরিত্র নেই। তাদের নারীরা নির্লজ্জতা ও অসচ্চরিত্রকে গৌরব মনে করে থাকে। এসব কারণে চেঙ্গিস এর নিকট এই মেয়েটি এবং তার খোলামেলা প্রেমনিবেদন বিস্ময়কর বিষয় ছিলো না।
রাশেদ চেঙ্গিস যেহেতু একজন যোগ্য গুপ্তচর, তাই সে ততক্ষণাৎ ভাবে, নিজের গোয়েন্দা পরিচয় গোপন রেখেই মেয়েটাকে চরবৃত্তিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই যে মেয়েটি বললো, আমি তোমাকে যখন এবং যেখানে আসতে বলি, আসতে হবে তার এই বক্তব্যে কোন নির্দেশ বা হুমকি নেই। আছে বন্ধুসুলভ সরলতা। তার বাচনভঙ্গির ক্রিয়াও চেঙ্গিসের অজানা নয়। মেয়েটির মুচকি হাসির জবাবে রাশেদ চেঙ্গিসও মুখ টিপে একটা হাসি উপহার দিয়েছিলো। এই হাসির মাধ্যমে শিকারীকে নিজের পাতা জালে আটকানোর প্রচেষ্টা ছিলো।
এবার যেতে পারি কি?- রাশেদ চেঙ্গিস বললো- আমার ডিউটি এখনো শেষ হয়নি। আপনি মেহমানদের মাঝে চলে যান। পরক্ষণে চেঙ্গিস খানিকটা ঝাঝালো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- আপিন কার স্ত্রী?
স্ত্রী নই-গণিকা- মেয়েটি বললো এবং একজন উচ্চপদস্থ কমান্ডারের নাম উল্লেখ করে বললো- অভাগার কাছে ঢের সম্পদ আছে। এখানে এসে আরেকজন পেয়ে গেছে। এখন আর আমার প্রয়োজন নেই। আমাকে মুক্তও করে দেয় না। আমি নিজের পছন্দের বাইরে কিছু করতে পারি না। লোকটাকে আমার একটুও ভালো লাগে না। নিজের পছন্দ-অপছন্দ এমন. একটা বিষয় যে, যার নিজস্ব পছন্দ থাকে, তার যাকে ভালো লেগে যায়, সে রাজা না গোলাম, সেই বিবেচনা করে না। প্রেম প্রেমই। প্রেমের কাছে রাজাও যা, গোলামও তা। তোমার পদমর্যাদায় আমার কোনো কাজ নেই। তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেও না। অন্যথায় আমার প্রতি অবিচার হবে। তুমিই প্রথম মানুষ, আমার হৃদয় যাকে পছন্দ করেছে। আমি দৈহিক পরিতৃপ্তির পিয়াসী নই। আমার আত্মা পিপাসু। তোমার চোখের তারাই পারবে আমার আত্মার পিপাসা নিবারণ করতে। এখন যাও। কাল রাত আমিই তোমাকে খুঁজে নেবে।
