কক্ষ থেকে বের হয়ে রাশেদ চেঙ্গিসের লুকিয়ে লুকিয়ে যেতে বেশ বেগ পেতে হয়। কক্ষে কক্ষে ও তাঁবুতে তাঁবুতে তো বেহায়াপনা চলছেই, বাইরেও কোথাও কোথাও একই আচরণ চোখে পড়ে। তাদের এড়িয়ে ভিন্ন পথ ধরতে হলো রাশেদ চেঙ্গিসকে। অবশেষে সে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটা নিরাপদে অতিক্রম করে ফেলে এবং নগরীর গলিপথে ঢুকে পড়ে। তারপর মসজিদের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
রাশেদ চেঙ্গিস এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে যখন মসজিদে প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন সে অনুভব করে, কে যেনো গলির মধ্যে পা টিপে টিপে হেঁটে এসে একদিকে মোড় নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। রাশেদ চেঙ্গিস হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাবে। কিন্তু পরক্ষণে কুকুর-বিড়াল বা অন্য কোন প্রাণী হতে পারে মনে করে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়। সে মসজিদের বারান্দায় ঢুকে পড়ে এবং ইমামের কক্ষের দরজায় বিশেষ পদ্ধতিতে করাঘাত করে। দরজা খুলে যায়। রাশেদ চেঙ্গিস ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং ইমামকে ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট প্রদান করে।
খৃস্টানদের বেশির ভাগ সৈন্য এখানে সমবেত হবে–চেঙ্গিস বললো এরা হবে রেনাল্টের ফৌজ। এখানকার বাহিনী তো পূর্ব থেকেই এখানে উপস্থিত আছে। এই বাহিনীর অভিযান এবং প্রত্যয়ের সংবাদ তো কায়রো পেয়েই যাবে। আমরা চেষ্টা করলে যাত্রার আগেই বাহিনীর কিছু ক্ষতিসাধন করতে পারি এবং তাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে পারি।
অর্থাৎ- তুমি বলতে চাচ্ছো, আমাদের কমান্ডো বাহিনীকে বলবো, তারা যেনো খৃস্টান বাহিনীর রসদে আগুন ধরিয়ে নষ্ট করে দেয়- ইমাম বললেন- এ কাজটা আমি করাতে পারি। কিন্তু করাবো না। তুমি নিশ্চয় এমন বহু ঘটনা শুনেছো, যে অধিকৃত অঞ্চলে আমাদের কমান্ডো সেনারা খৃস্টানদের ক্ষতিসাধন করেছে, সেখানকার মুসলমান বাসিন্দাদের জীবন জাহান্নামের চেয়েও কঠিনতর করে তোলা হয়েছে। ঘরে ঘরে তল্লাশী হয়েছে। আমাদের সম্ভ্রান্ত মা-বোনদের লাঞ্চিত করা হয়েছে। যুবতী মেয়েদেরকে খৃস্টানরা তুলে নিয়ে গেছে। সর্বোপরি বন্দিত্ব ও হত্যা-নির্যাতন শুরু হয়ে গেছে। আমি দূত মারফত সুলতান আইউবীকে সমস্যাটা অবহিত করেছি। সুলতান সম্পূর্ণ আমার আশানুরূপ উত্তর প্রেরণ করেছেন। তিনি বলেছেন, এখন থেকে মুসলিম অধিবাসীদের মর্যাদা, জীবন ও সম্পদের খাতিরে কোন শহরে গোপন ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা বন্ধ থাকবে। দুশমনের রসদ বাহিনীর সঙ্গে আসতে দাও, আমার গেরিলা সৈনিকরা সেগুলো রণাঙ্গনে যেতে দেবে না।
পূর্ণাঙ্গ সংবাদ আমি আপনাকে দু-চারদিনের মধ্যেই জানাতে পারবো- চেঙ্গিস বললো- আপনি এখন আরো সতর্ক হয়ে যান। এখানকার গুপ্তচররা অস্বাভাবিক রকম তৎপর হয়ে ওঠেছে। এখন থেকে তারা এখানকার পশু-পাখিগুলোকেও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখবে।
একজনকে কায়রো পাঠিয়ে দেয়া হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে চেঙ্গিস মসজিদ থেকে বেরিয়ে যায়। এখন আর তার মধ্যে কোন লুকোচুরি নেই, যাতে কেউ সন্দেহ না করে। গলির দিকে মোড় নেয়ামাত্র আবারো যেনো কারো পায়ের শব্দ কানে এলো। চেঙ্গিস মোড় ঘুরিয়ে তাকায়। গলিটা অন্ধকার। কিছুই দেখতে ফেলো না। চেঙ্গিস সামনের দিকে হাঁটা দেয়। গন্তব্যের কাছাকাছি গিয়ে কৃত্রিম দাড়ি খুলে কাপড়ের নীচে লুকিয়ে ফেলে। পোশাকে তাকে সন্দেহ করার কোন কারণ নেই। এমন পোশাক খৃস্টানরাও পরে থাকে।
এখন ভিক্টর ও চেঙ্গিসের প্রচেষ্টা, কীভাবে খৃস্টানদের আক্রমণ পরিকল্পনার বিস্তারিত জানা যায়। খৃস্টান বাহিনী কোথায় কোথায় আক্রমণ করবে এবং তাদের রওনা হওয়ার প্রোগ্রাম কী ইত্যাদি। অধিক থেকে অধিকতর সৈন্য সমাবেশ ঘটানোর জন্য আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। দূতদের দৌড়ঝাঁপ চলছে। এখানকার জন্য রেমন্ড হলেন মেজবান। এটি তার রাজধানী। এক রাতে তিনি সকল খৃস্টান সম্রাট, উচ্চপদস্থ কমান্ডার ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিমন্ত্রণ করেন। মেহমানগণ ভোজ সভায় উপস্থিত। ভিক্টর ও চেঙ্গিস মহাব্যস্ত নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ নেই। যেহেতু মেহমানদের মধ্যে সম্রাটগণও আছেন, তাই তাদের মদ ইত্যাদি পরিবেশনের জন্য ভিক্টর-চেঙ্গিসকে প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে। তবে তাদের জানা আছে, এই সতর্ক প্রস্তুত ততোক্ষণ পর্যন্ত থাকতে হবে, যতক্ষণ মেহমানদের চেতনা ঠিক থাকে। পরে যখন মদ মাতাল হয়ে তারা অসামাজিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তখন চাকর-নকরদের ব্যস্ততা কমে যায়।
আজকের আসরে যতোজন পুরুষ, ততোজন নারী। রূপসী যুবতীরা আছে। আছে এমন নারীও, যারা বার্ধক্যে উপনীত হয়ে গেলেও তরুণী সেজে ধোকা দিচ্ছে। ভিক্টর ও চেঙ্গিস খাবার-মদ ইত্যাদি পরিবেশনের দায়িত্বে নিয়োজিত চাকরদের কাজ তদারকি করছে এবং ছুটোছুটি করছে। এক ইউরোপীয় তরুণী চেঙ্গিসের নিকট দু-তিনবার মদ চায়। প্রতিবারই চেঙ্গিস কোনো চাকর বা চাকরানিকে ডেকে বলে দেয়, একে মদ দাও। সে সময়ে মেহমানগণ রেমন্ডের মহলে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিলো। মেয়েটি অত্যন্ত রূপসী। চেঙ্গিসকে বারবার চাকরদের ডেকে মদ দিতে বলছে দেখে সে মুচকি হেসে বললো- আমি তোমার হাতে পান করতে চাচ্ছি আর তুমি কিনা চাকরদের নির্দেশ দিয়ে এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছো।
আজ্ঞে, আমিই এনে দিচ্ছি।- চেঙ্গিস ভৃত্যসুলভ ভঙ্গিতে বললো।
