আজ এ পর্যন্তই- বল্ডউইন বললেন- আমাদের আজকের এই কনফারেন্স প্রাথমিক আলাপ-আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলো। আপাতত সিদ্ধান্ত হলো, আমাদের গোপন তৎপরতা গৃহযুদ্ধের আদলে মুলমানদের কোমর ভেঙে দিয়েছে এবং সালাহুদ্দীন আইউবী এদিকে আসার পরিবর্তে মিসর চলে গেছেন। তাই অতিশীঘ্র আমাদেরকে জোরদার আক্রমণ চালাতে হবে। আজকের এই সভায় আমরা আক্রমণের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। এখন দু-চারদিন আমরা আলাদা আলাদাভাবে চিন্তা-ভাবনা করবো। যারা এ বৈঠকে অনুপস্থিত আছেন, তাদেরকেও তলব করবো। তারপর একদিন বসে আক্রমণের পরিকল্পনা প্রস্তুত করে নেবো। আমাদের বাহিনীগুলো প্রস্তুত আছে। এই ফাঁকে হারমানকে গোয়েন্দা তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে। আইউবীর গুপ্তচরদের পাতাল থেকে হলেও বের করে এনে আটক করতে হবে। এখানকার প্রত্যেক মুসলমানের উপর কড়া নজর রাখতে হবে। প্রতিটি মুসলিম পরিবার ও ব্যক্তির প্রতি মুহূর্তের গতিবিধির, উপর চোখ রাখতে হবে। হারমান! আপনাকে বিশেষভাবে আরো একটি কাজ করতে হবে। পুরুষ হোক কিংবা নারী, এখান থেকে যে-ই বের হবে নিশ্চিত হতে হবে সে শত্রুর চর কিনা।
তা-ই হবে-হারমান বললেন- আমাকে না জানিয়ে এখান থেকে পক্ষিটিও বের হতে পারবে না।
***
রাশেদ চেঙ্গিস ও ভিক্টর। খৃস্টানদের দুই বিশ্বস্ত পরিচারক। নিয়োগ দেয়া হয়েছে গভীর যাচাই-বাছাইয়ের পর। তারপরও এরা সুলতান আইউবীর গুপ্তচর। অতিশয় বিচক্ষণ গোয়েন্দা। হারমানের ন্যায় বিজ্ঞ গোয়েন্দা প্রধানকে পরাজিত করে ঢুকে গেছে খৃস্টানদের একেবারে ভিআইপি কক্ষে। খৃস্টানদের এই কনফারেন্সের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আগা-গোড়া সব আলোচনা- সকল সিদ্ধান্ত তাদের জানা। মধ্যরাতের পর সভা মুলতবি হয়ে গেলে তারা নিজ কক্ষে চলে যায়।
ডিউটি থেকে অনুপস্থিত থাকা আমাদের কারো পক্ষেই সম্ভব নয় ভিক্টর বললো- এসব তথ্য অন্য কারো মাধ্যমে কায়রো পৌঁছাতে হবে। এমন লোক কে আছে?
ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বলে দেখা যাক- রাশেদ চেঙ্গিস বললো তিনি-ই ভালো জানবেন, কাকে পাঠানো যায়। দ্রুতগতিতে কায়রো পৌঁছার জন্য বিশেষ কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন হবে। তবে তাদের পূর্ণ পরিকল্পনা জানার পরই কায়রোকে সংবাদ দেয়া উচিত। অসম্পূর্ণ সংবাদ জেনে সুলতান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে পারেন।
ইমাম সাহেবকে এতোটুকু সংবাদ তো জানানো প্রয়োজন যে, খৃস্টানরা অনেক বড় আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে- ভিক্টর বললো- যাতে তথ্য পেয়ে সুলতান অন্তত তার বাহিনীকে প্রস্তুত করতে পারেন এবং অতি দ্রুত ক্ষয়-ক্ষতি পুরণ করে নিতে সচেষ্ট হন। আর শোন, তারা যখন আক্রমণ নিয়ে আলোচনা করছিলো, তখন আমি তোমার দিক তাকিয়েছিলাম। তুমি রেমন্ডের সামনে মদের পেয়ালা রাখতে রাখতে থেমে গিয়েছিলে। তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছিলো, তুমি মনোযোগ সহকারে আলোচনা শুনছো। আমি তোমার চেহারা দেখেছিলাম। তাতে আমি লক্ষ্য করার মতো ঔজ্বল্য দেখেছি। আমি জানি, এতোটা মূলবান তথ্য প্রাপ্তিতে উত্তেজনা ও আনন্দের অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তোমাকে ভুলে গেলে চলবে না, এ জাতীয় সভা-সমাবেশে হারমানও উপস্থিত থাকেন। হারমান। আমাদের আলী বিন সুফিয়ানের সমপর্যায়ের গোয়েন্দা। আমি তোমার প্রতি তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ হারমানের প্রতিও তাকিয়েছিলাম। আমার মনে হলো, তিনি তোমাকে লক্ষ্য করছেন। সাবধান থেকো ভাই! জানো তো আমরা দুশমনের পেটের মধ্যে বসবাস করি।
হারমানের কাছে আমরা অপরিচিত নই- রাশেদ চেঙ্গিস বললো আমাদের ব্যাপারে তিনি নিঃসন্দেহ। ভয়ের কোনো কারণ নেই।
ভয় নয়- সতর্ক থাকা প্রয়োজন- ভিক্টর বললো- হারমান ন কী নির্দেশনা পেয়েছেন, শুনেছো নিশ্চয়। এখন তিনি যে কাউকে সন্দেহের চোখে দেখবেন। আচ্ছা, তুমি একটা কাজ করো- মসজিদে চলে যাও। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। খৃস্টানরা আজ কী কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, ইমামকে জানাও। কেউ কায়রো যাওয়ার থাকলে সংবাদটা আলী বিন সুফিয়ানকে জানাতে বলল। আর ওদিক থেকে কেউ আসলে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে যায় না যেন।
নগরীর এক মসজিদের ইমাম সুলতান আইউবীর গুপ্তচর। মসজিদটি গুপ্তচরবৃত্তির গোপন ঠিকানা। সুলতান আইউবীর গোয়েন্দারা মসজিদে গিয়ে ইমামকে সংবাদ পৌঁছায় এবং তার থেকে নির্দেশনা গ্রহণ করে। ভিক্টর কখনো মসজিদে যায়নি। লোকটা নামায পড়ার নিয়ম-কানুন ও মসজিদের আদব-কায়দা কিছুই জানে না। তাই তার ভয়, মসজিদে গেলে খৃস্টানদের কোন মুসলমান গুপ্তচর তাকে ধরিয়ে দিতে পারে। আশঙ্কাটা অমূলক নয়। খৃস্টানদের গুপ্তচরদের মধ্যে এমন অনেক মুসলমান ছিলো, যারা মুসল্লি বেশে মসজিদে যাওয়া-আসা করতো এবং মুসলমানদের কথা বার্তা শুনে তথ্য সংগ্রহ করতো। এভাবে তারা বহু মুসলমানকে খৃস্টানদের হাতে গ্রেফতারও করিয়েছে। রাশেদ চেঙ্গিস যেহেতু নিজেকে মুসলমান পরিচয় দিয়ে রেখেছিলো, তাই দিনের বেলা সে মসজিদে যেতো না। খৃস্টান কমান্ডার প্রমুখ রাতের আসর ও ভোজ-ভাজির অনুষ্ঠান থেকে বিদায় নেয়ার পর প্রয়োজন হলে মধ্য রাতের পর মসজিদ সংলগ্ন ইমামের বাসায় যেতো।
***
রাশেদ চেঙ্গিস পোশাক পরিবর্তন করে। জুব্বা ও পাগড়ি পরিধান করে। মুখে কৃত্রিম দাড়ি স্থাপন করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যায়। এ সময়ে খৃস্টানদের এই কেন্দ্রে রাতেও জাকজমক অব্যাহত থাকে। রেমন্ডের বাহিনী তো আছেই, রেনাল্টও তার অনেক অফিসারসহ এখন এখানে অবস্থান করছেন। আছে তার কয়েকটি সেনা ইউনিটও। এই সেনা অফিসার এবং অন্যান্য খৃস্টান কমান্ডাররা আমোদ-বিনোদনের মধ্যদিয়ে রাত অতিবাহিত করছে। পেশাদার মেয়েদের নাচ-গান ও প্রমোদ চলছে। সারারাত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্ত্রী-গণিকারাও সঙ্গে থাকছে। কে কার স্ত্রী, বাছ-বিচার থাকছে না। চলছে নারী বেঁচা-কেনাও।
