ওদিকে ত্রিপোলীর সামান্য দূরে খৃস্টান বাহিনী সমবেত হতে শুরু করেছে। ফিলিস্তীনের অধিকৃত শহরগুলোতে দূত প্রেরণ করা হয়েছে যে, তোমরা বাহিনী প্রস্তুত করো। ত্ৰিপোলীতে খৃস্টান সম্রাট রেনাল্ট সবচে বেশি তৎপর। তার সেনাসংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশি, যাদের মধ্যে দুইশত পঞ্চাশজন নাইট রয়েছে। নাইট একটি সম্মানসূচক পদবী। অস্বাভাবিক বিচক্ষণ, সাহসী ও অত্যধিক যোগ্য সামরিক অফিসারদের এই পদবী প্রদান করা হয়। তাদেরকে বিশেষ ধরনের বর্ম দেয়া হয় এবং এরা বিশেষ বিশেষ ইউনিটের কমান্ডার হয়ে থাকেন। প্রতিশোধের আগুন রেনাল্টকে অস্থির করে রেখেছে। প্রিয় পাঠক! আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, ১১৭৪ সালের শুরুর দিকে খৃষ্টানরা সমুদ্রের দিক থেকে আলেকজান্দ্রিয়ার উপর আক্রমণ করেছিলো। কিন্তু সুলতান আইউবী গুপ্তচর মারফত যথাসময়ে সেই আক্রমণ প্রস্তুতির সংবাদ পেয়ে গিয়েছিলেন। তিনি খৃস্টান হামলাকারীদের স্বাগত জানানোর জন্য এমন বন্দোবস্ত করেছিলেন যে, খৃস্টানদের নৌ-বহর সমুদ্রেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো।
সেই অভিযানে একটি আক্রমণ হওয়ার কথা ছিলো স্থল পথে, যার নেতৃত্ব ছিলো রেনাল্টের হাতে। কিন্তু যেহেতু মুসলমান গোয়েন্দারা খৃস্টানদের পূর্ণ পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলো, তাই নুরুদ্দীন জঙ্গী স্থলপথে ফাঁদ পেতে রেখেছিলেন। পেছন এবং উভয় পার্শ্ব থেকেও আক্রমণের ব্যবস্থা করে রাখেন। রেনাল্ট সেই ফাঁদে এসে পা দেন। বাঁচার জন্য তিনি অনেক হাত-পা ছোঁড়েন। কিন্তু এক রাতে জঙ্গীর কমান্ডো সেনারা রেনান্টের হেডকোয়ার্টারের উপর হামলা চালায় এবং রেনাল্টকে ধরে ফেলে। খৃস্টানদের আক্রমণ অভিযান শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং তাদের শোচনীয় পরাজয়ও ঘটে। তাদের জীবন ও সম্পদের বিপুল ক্ষতি সাধিত হওয়া ছাড়াও উল্লেখযোগ্য বড় একটি ক্ষতি এই হয় যে, রেনাল্টের ন্যায় একজন যুদ্ধবাজ সম্রাট বন্দি হন।
রেনাল্ট নুরদ্দীন জঙ্গীর অতিশয় মূল্যবান একজন বন্দি ছিলেন। তার মুক্তির বিনিময়ে তিনি খৃস্টানদের থেকে বড় শর্ত আদায়ের পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু আয়ু তাঁকে সময় দেয়নি। দুমাস পরেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পদস্থ কর্মকর্তা ও সালারগণ তারই এগারো বছর বয়সী পুত্র আল-মালিকুস সালিহকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন। তারা আল-মালিকুস সালিহকে পুতুলের ন্যায় ব্যবহার করে সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করে নেয় এবং তাকে পরাজিত করার লক্ষ্যে খৃস্টানদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করে। এই বন্ধুত্বের প্রথম বিনিময় তারা এই প্রদান করে যে, রেনাল্টের ন্যায় মূল্যবান কয়েদিকে বিনা শর্তে মুক্তি দিয়ে দেয়। সেই থেকে ওস্তাদ নুরুদ্দীন জঙ্গীর পুত্র আল-মালিকুস সালিহর সঙ্গে সুলতান আইউবীর যুদ্ধ-সংঘাত শুরু হয়ে যায়। অন্যান্য আমীরগণও খেলাফত থেকে আলাদা হয়ে যান এবং তারা প্রত্যেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে সম্মিলিত বাহিনী গঠন করে নেন। তাদের এই আত্মঘাতি অবস্থানের ফলে অন্য সব ক্ষতির পাশাপাশি বড় একটি ক্ষতি এই হয়েছিলো যে, রেনাল্ট একটি সামরিক শক্তির রূপ ধারণ করে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধেই নয়- এখন ইসলামী, দুনিয়ার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছেন।
আল-মালিকুস সালিহ রেনাল্টের সঙ্গে আরো যে বন্দিদের মুক্তি দিয়েছিলেন, তারাও ইসলামের জন্য বিরাট সমস্যারূপে আবির্ভূত হয়েছে। রেনাল্ট আর পরাজয় এবং অপমানের প্রতিশোধ নিতেও বদ্ধপরিকর। খৃস্টানদের কনফারেন্সে তিনি সকল খৃস্টান বাহিনী যৌথ কমান্ডের অধীনে কাজ করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। তার বড় কারণ, তিনি স্বাধীন থেকে নিজের প্রত্যয়-পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধ করতে চাচ্ছেন। খৃস্টানদের একটি দুর্বলতা ছিলো, তারা ঐক্যবদ্ধ হতো নাযার যার অবস্থানে থেকে একে অপরকে সহযোগিতা দিয়ে স্বার্থ উদ্ধার করতে চাইতো। তাদের প্রত্যেকের হৃদয়ের আকাঙ্খা ছিলো, একাকি যুদ্ধ করে নিজেই বিজিত এলাকার রাজা হবে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক লিখেছেন, খৃস্টানদের এই দুর্বলতা আরব বিশ্বে তাদের অনেক ক্ষতি করেছে। এতো অধিক ও বিশাল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সুলতান আইউবীর সারিতে যদি গাদ্দার না থাকতো, খৃস্টানদেরকে আরব দুনিয়া থেকে বিতাড়িত করে ইউরোপের জন্যও তিনি বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতেন।
আপনারা যদি সালাহুদ্দীন আইউবীকে পরাজিত করতে চান, তাহলে আমাদের প্রত্যেকে আপন আপন বাহিনীকে যৌথ কমান্ডের অধীনে ছেড়ে দিতে হবে- রেমন্ড বললেন- অন্যথায় বিক্ষিপ্ত হয়ে আমরা ব্যর্থও হয়ে যেতে পারি। প্রধান সেনাপতি কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেবে জোট।
আমি আপনার সঙ্গে দ্বি-মত করবো না- রেনাল্ট বললেন- তবে আমি সেই কমান্ডের অধীনে থেকে যুদ্ধ করবো না। আমাকে আমার বিগত পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই হবে। তার জন্য আমার স্বাধীনতা প্রয়োজন। নুরুদ্দীন জঙ্গী মরে গেছে। জঙ্গী আমাকে বন্দি করে যেভাবে দামেশক নিয়েছিলো, ঠিক তেমনি আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে বন্দি করে আপনাদের সম্মুখে এনে হাজির করবো। অন্যথায় ইতিহাস আজীবন আমাকে অভিশম্পাত করতে থাকবে। আমি আপনাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করতে চাই, নুরুদ্দীন জঙ্গী যখন আমার উপর গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে আমার সৈন্যদের বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছিলো এবং তাদেরকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিলো, তখন আপনাদের কে তার উপর জবাবী হামলা করেছিলেন? কে আমার জন্য সাহায্য নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন? কেউ নন। এখন আপনারা আমার পায়ে শিকল পরাবেন না। আমি এই দিনটির জন্যই বাহিনী প্রস্তুত করেছি। আমার প্রতিশোধের দিন এসে গেছে। আমার ফৌজ আপনাদের কারো ফৌজের পথে প্রতিবন্ধক হবে না। যাকেই আমার সাহায্যের প্রয়োজন হবে, সব রকম ঝুঁকি বরণ করে নিয়ে আমি তাকে সাহায্য করবো। কিন্তু আপনাদের সকলের কাছে আমার নিবেদন, আমাকে শিকলবন্দি করবেন না।
