আমাদের বাহিনীর কমান্ড যদি যৌথ হয়, তাহলে আমরা আরো বেশি ভালো ও কার্যকর পন্থায় লড়াই করতে পারবো। রেমন্ড বললেন।
আমি ঐক্যের উপর জোর দেবো, যৌথ কমান্ডের উপর নয়- রেনাল্ট বললেন- যৌথ কমান্ডের কিছু ক্ষতিকর দিকও থাকে। যুদ্ধের ময়দানে আমাদেরকে একে অপরের সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং একে অন্যের পথে চলা থেকে বিরত থাকতে হবে। অগ্রযাত্রার জন্য আমরা এলাকা ভাগ করে নেবো। সতর্ক থাকতে হবে, যেনো আমাদের গতিবিধি ফাঁস না হয়ে যায়।
***
উভয় দিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। সুলতান আইউবীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা খৃস্টানদের এবারকার প্রত্যয়। সুলতান বিক্ষত। খৃস্টানদের মদদপুষ্ট তিনটি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়েছে তাঁকে। প্রায় তিনটি বছর মুসলিম সৈনিকরা পরস্পরের রক্ত ঝরিয়েছে। সুলতান আইউবী তিন মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে এনেছেন এবং তারা সুলতানের আনুগত্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু সুলতানের মতে এই জয় উম্মাহর নিকৃষ্টতম বিজয়। কারণ, খৃস্টানদের ষড়যন্ত্র সফল হয়েছে। এই ভ্রাতৃঘাতি গৃহযুদ্ধে আল্লাহর হাজার হাজার সেই সৈনিকরা মৃত্যুবরণ করেছে কিংবা আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করেছে, যাদের খৃস্টানদের হাত থেকে ফিলিস্তীনকে মুক্ত করার কথা ছিলো।
ইত্যবসরে খৃস্টানরা তাদের সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করে নিয়েছে। বাহিনীকে বিশ্রাম গ্রহণের সুযোগও দিয়েছে। তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি এখন সম্পন্ন। তাদের দাবি ভিত্তিহীন ছিলো না যে, তারা ঝড়ের গতিতে আসবে এবং আরব বিশ্বকে খড়ের ন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। বিপরীত দিকে সুলতান আইউবীর বাহিনীর অভিজ্ঞ অনেক সৈনিক ও কমান্ডার শাহাদাতবরণ করেছে, যার ফলে সুলতান এখন নতুন ভর্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। অনভিজ্ঞ নতুন সৈনিকদের দ্বারা যুদ্ধ করানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু সুলতান আইউবীর এছাড়া উপায় নেই। এ মুহূর্তে মিসরেও অনেক সৈন্য রাখা প্রয়োজন। কারণ, সুদানের দিক থেকেও আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে। সর্বোপরি দেশজুড়ে নাশকতা ও বিশ্বাসঘাতকতার সমস্যা তো আছেই।
খৃস্টানরা ঝড়ের বেগে ধেয়ে আসার পরিকল্পনা প্রস্তুত করছে। কিন্তু সুলতান আইউবী তাঁর নিজস্ব রণকৌশল থেকে সরে আসতে চাচ্ছেন না। তার সিদ্ধান্ত, তিনি গেরিলা হামলা চালাও আর পালিয়ে যাও এই রীতি অনুযায়ীই লড়াই করবেন। খৃস্টানদের বর্তমানকার পরিকল্পনায় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেনো সুলতান আইউবীর কমান্ডো অপারেশন সফল হতে না পারে। তারা আইউবীর বাহিনীকে বেষ্টনীর মধ্যে নিয়ে এসে সামনাসামনি লড়াবার কৌশল ভাবছে। উভয়পক্ষের জোর প্রচেষ্টা, আপন আপন যুদ্ধ প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও গতিবিধি যেনো গোপন থাকে এবং প্রতিপক্ষের গোপন তথ্য বের করে আনা যায়। এ লক্ষ্যে উভয়পক্ষের মধ্যেই প্রতিপক্ষের গুপ্তচর ঢুকে রয়েছে।
খৃস্টান কমান্ডার প্রমুখ মোটের উপর জানে, তাদের মধ্যে সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা আছে। কিন্তু ত্রিপোলীর সম্রাট রেমন্ড ও অপরাপর খৃস্টান সম্রাটদের জানা নেই, খোদ তাদের এই কনফারেন্সে দুজন মুসলমান গোয়েন্দা উপস্থিত রয়েছে। একজন রাশেদ চেঙ্গিস। অপরজন ভিক্টর। রাশেদ চেঙ্গিস তুর্কি মুসলমান। ভিক্টর ফরাসী। এরা খৃস্টানদের উচ্চ পর্যায়ের কর্মচারি। খৃস্টান সম্রাট ও উচ্চপদস্থ কমান্ডারদের সভা নিমন্ত্রণ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে মদ-খাবার ইত্যাদি পরিবেশনের দেখা-শোনা এদের দায়িত্ব। রাশেদ চেঙ্গিস ছদ্মনাম। ঠিক খৃস্টানদের নামের ন্যায়। তুর্কি হওয়ার কারণে গায়ের রংটা ইউরোপিয়ানদের মতো। তাছাড়া অত্যন্ত চালাক ও বাকপটু। ভিক্টরের ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ নেই, সে খৃস্টান। ফ্রান্সের বাসিন্দা। কিন্তু ছদ্মনামটা রেখেছে গ্রীক খৃস্টানদের।
খৃস্টানদের এই কনফারেন্সেও তারা দুজন তাদের বিশেষ পোশাকে উপস্থিত আছে। কারণ, খৃস্টানরা মদ ছাড়া কোনো কাজই করতে পারে না। এরা মদ পরিবেশন করছে আর সতর্কতার সাথে মনোযোগ সহকারে তাদের কথোপকথন শুনছে। অত্যন্ত মূল্যবান আলোচনা, যা কিনা এই মুহূর্তে কায়রো পৌঁছে যাওয়া একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু আলোচনা ও সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। খৃস্টানদের পূর্ণ পরিকল্পনা জ্ঞাত হয়ে যে কোনো মূল্যে সেসব তথ্য কায়রো পৌঁছাতে হবে। এই দুই গোয়েন্দার উপর আলী বিন সুফিয়ানের পরিপূর্ণ আস্থা আছে।
***
মিসরে সেনাভর্তির কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে দুতিনটি ইউনিট গঠনও হয়ে গেছে। সামরিক কুচকাওয়াজ ও খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। দ্রুতগামী দূত মারফত মসজিদের ইমামদের নিকট সুলতান আইউবীর বার্তা পৌঁছিয়ে দেয়া হয়েছে, আপনারা জনগণকে জিহাদের গুরুত্ব বর্ণনা করুন, তাদেরকে বলুন, কাফেররা পূর্ণ শক্তি নিয়ে ইসলামী সুমিয়ার উপর আক্রমণ কয়তে ধেয়ে আসছে। প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাসকে কাফেরদের স্থল থেকে মুক্ত করতে হবে। এমতাবস্থায় প্রত্যেক মুসলমানের উপর জিহাদ ফরয হয়ে গেছে। ইমামদের বলা হলো, আপনারা যুবকদেরকে মিসরের সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করুন।
ইসলাম ও জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যুবা-তরুণরা ভর্তি হতে শুরু করেছে। তাদের সম্মুখে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পরিষ্কার। কিন্তু বহু যুবক ভর্তি হয়েছে গনীমতের লোভে। এরা পল্লী অঞ্চলের মানুষ। তাদের কানে ইমামদের আওয়াজ পৌঁছেনি। তারা সাক্ষাৎ পেয়েছে সেনা অফিসারদের, যারা এই লোকগুলোকে এই বলে উদ্বুদ্ধ করেছে, আসো, যুদ্ধ করে। আমরা খৃস্টানদের এমন সব এলাকা জয় করবো, যেখানে বিপুল সম্পদ আছে। তোমাদেরকে সেই সম্পদের ভাগ দেয়া হবে। ফলে তারা জিহাদী জযবায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভর্তি হওয়ার পরিবর্তে হাসিমুখে গনীমতের লোভে ভর্তি হয়েছে। এই অনভিজ্ঞ ও আনাড়ী অফিসারগণ সুলতান আইউবীর আকাঙ্খর বিপরীত বিপুলসংখ্যক যুবককে ভর্তি করে নেয়। যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হয়ে এই সৈনিকরা সুলতান আইউবীর জন্য বিরাট এক সমস্যারূপে আবির্ভূত হয়।
