দুদিকেই বৈঠক চলছে।
আইউবী জেরুজালেম জয় করার প্রত্যয় নিয়ে বের হয়েছিলেন রেমন্ড বললেন- আমরা একটি তীরও না ছুঁড়ে তাকে মিসর ফিরিয়ে দিয়েছি। তারই হাতে আমরা সেই মুসলিম শাসকদের বেকার করে দিয়েছি, যারা যে কোনো সময় আমাদের বিরুদ্ধে তার শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারতো। এর চেয়ে বড় সফলতা আর কী চাই! এখন বিজয় অর্জনে আমাদের সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না।
সাফল্যটা অতো বিরাট নয়, যতোটা বড় করে আপনি দেখালেন খৃস্টান সম্রাট বল্ডউইন বললেন- আমরা আক্রমণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছি মাত্র। আসল কাজ তো আক্রমণ। আক্রমণ করে বিজয় অর্জন করলেই তবে তাকে সাফল্য বলবো। দ্রুত বাহিনী প্রস্তুত করো। সম্মুখপানে রওনা হও এবং আইউবীকে আত্মসংবরণ করার সুযোগ দিও না।
আমরা যদি নিজেদেরকে খুব তাড়াতাড়ি সামলে নিতে সক্ষম না হই, তাহলে পরিণতি কী হবে জানি না- সুলতান আইউবী তাঁর সালার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বললেন- আজ থেকেই নতুন ভর্তি শুরু করে দাও। আরোহী সৈনিকের সংখ্যা বেশি হওয়া চাই। সেই সুদানী যুবকদেরও ভর্তি করে নাও, সাত বছর আগে বিদ্রোহের অপরাধে পদচ্যুৎ করে শাস্তিস্বরূপ যাদের দ্বারা কৃষি জমি আবাদ করানো হয়েছিলো। এখন আর তারা ধোকা দেবে না। যেসব যুবক ঘোড়সওয়ারী ও তরবারী চালনা জানে, তাদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ দাও। আমি তাড়াতাড়ি মিসর থেকে বের হতে চাই। খৃস্টানদের মাথা যদি খারাপ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলেই আরব জগত তাদের দখলদারিত্ব থেকে রক্ষা পাবে। অন্যথায় আমার অনুপস্থিতির সুযোগে এক্ষুনি তাদের হামলা করা উচিত। তারা আনাড়ি নয়। এই যে। আমি মিসর ফিরে আসতে বাধ্য হলাম, পরিস্থিতিটা তাদেরই সৃষ্ট। এতে তাদের উদ্দেশ্য আছে। একটি মাত্র পন্থা অবলম্বন করলে তারা আমাদের থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস রক্ষা করতে পারবে- অধিকৃত অঞ্চল ত্যাগ করে তাদেরকে আমাদের এলাকায় এসে লড়াই করতে হবে। এই যুদ্ধে আমার অনেক সৈন্যের প্রয়োজন।
আমি এক্ষুনি দুশ পঞ্চাশজন নাইট (বর্মপরিহিত কমান্ডার) ময়দানে নিয়ে আসতে পারি- ত্রিপোলীর কনফারেন্সে বিখ্যাত খৃস্টান সম্রাট রেনাল্ট অফ খুনিন বললেন- এই আক্রমণের নেতৃত্ব আমার বাহিনী দেবে। আমি তার পরিকল্পনাও প্রস্তুত করে রেখেছি। আমরা সালাহুদ্দীন আইউবীর ন্যায় চোরের মতো যুদ্ধ করবো না। আমরা ঝড় ও স্রোতের ন্যায় এগিয়ে যাবো। আমরা যখন সবাই একত্রিত হয়ে রওনা হবো, তখন আপনি বুঝতে পারবেন, মানুষ ও ঘোড়ার এই ঝড়-স্রোত আরব দুনিয়াটাকে খড়-কুটোর ন্যায় ভাসিয়ে মিসরকেও পিষে ফেলবে এবং তার গতি সুদান গিয়ে ক্ষান্ত হবে।
খৃস্টানরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আসে, তাহলে আরবের মাটি আমাদের থেকে এতো রক্ত কামনা করবে, যাতে মরুভূমির বালিকণা সাঁতার কাটবে- সুলতান আইউবী বললেন- এবার আমরা মাথায় কাফন বেঁধে যাবো। আমার বন্ধুগণ! আমাদেরকে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং পুরোপুরি সংবরণ করে ময়দানে অবতীর্ণ হতে হবে।
আইউবীকে মিসরে আটকে রাখার জন্য আমাদেরকে অরাজক কর্মকাণ্ড তীব্রতর করতে হবে- রেমন্ড বললেন এবং খৃস্টান ইন্টেলিজেন্স প্রধান হারমানকে উদ্দেশ করে বললেন- হারমান! মিসরের উপর তোমার হামলা আরো জোরদার করো। আইউবী স্থির হয়ে বসে থাকবার কথা নয়। তার বাহিনীর জীবনহানি প্রচুর হয়েছে। বিলম্ব না করে তিনি নতুন ভর্তি শুরু করে দেবেন। তোমাকে চেষ্টা করতে হবে, যেনো তিনি ভর্তি না পান। যদি তাতে সফল না হও, তাহলে মিসরের বাহিনীকে ধ্বংস করতে থাকো। সেখানকার বাহিনীর উপর দৃষ্টি রাখো। ওখানে আমাদের কর্তব্যরত গোয়েন্দাদের বলো, সালাহুদ্দীন আইউবীর যে কোনো গতিবিধির সংবাদ যেনো দ্রুত আমাদের কাছে পৌঁছাতে থাকে।
আর হারমান!- এক খৃস্টান কমান্ডার বললেন- মিসরের সংবাদ পাওয়া যাক আর না যাক এখানকার কোন সংবাদ যেনো বাইরে যেতে না পারে। আমাদেরকে স্বীকার করতে হবে, আইউবী যেভাবে যুদ্ধের ময়দানে আমাদের জন্য আপদ হিসেবে আবির্ভূত হন, তেমনি গুপ্তচরবৃত্তির ময়দানেও তিনি আমাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকেন। আমাদের মাঝে তার চর থাকা বিচিত্র নয়। এখানকার মুসলিম পরিবারগুলোর উপর নজর রাখতে হবে। কারো প্রতি সামান্যতম সন্দেহ সৃষ্টি হলেই তাকে বন্দি করে ফেলো। প্রয়োজনে হত্যা করে ফেলল। আমি তোমাকে এ ব্যাপারে পূর্ণ ক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রদান করলাম।
আমি তো কারো অন্তরে প্রবেশ করতে পারি না- সুলতান আইউবী বললেন- গাদ্দার কারো গায়ে লেখা থাকে না। গাদ্দারদের মাথায় শিংও থাকে না। আমি আলী বিন সুফিয়ান ও গিয়াস বিলবীসকে অনুমতি প্রদান করছি, যাকে খৃস্টানদের চর বলে সন্দেহ হবে, তাকেই হত্যা করে ফেলো। তার প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে চাইলে কারাগারে ফেলে রাখো। যে সময়টায় খৃস্টানরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আসছে, সেই সঙ্গিন পরিস্থিতিতে আমি কাউকে ক্ষমা করতে পারি না। আমি তদন্ত ও সুবিচারের ধরণ-পদ্ধতি পরিবর্তন করতে চাই।… আর আলী বিন সুফিয়ান! আমি নিশ্চিত, তুমি অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে তোমার জাল বিছিয়ে রেখেছে। খৃস্টানদের ভেতরে আরো কিছু লোক পাঠিয়ে দাও এবং সেখানকার গোয়েন্দাদের বলে দাও, কোন তথ্য-সংবাদ যেনো বেশি সময় নিজেদের কাছে না রাখে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও যেনো তীর গতিতে কায়রোতে সংবাদ পৌঁছায়। আমাকে অন্ধ করে দিও না আলী! আর সতর্ক থাকো, এখান থেকে কোনো সংবাদ যেনো বের হতে না পারে।
