কেউ এগিয়ে আসলো না। সুলতান আইউবী ঘোড়া থেকে অবতরণ করেন এবং আসামীদের মধ্য থেকে হাকীমকে বাহুতে ধরে টেনে ঘোড়ার নিকটে এনে বললেন- আমার ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসো আর উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দাও, আইউবী মিথ্যা বলছে।
হাকীম সুলতান আইউবীর ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন। কিন্তু তিনি মাথাটা নত করে ফেললেন।
বলো, সুলতান মিথ্যা বলছে। সুলতান আইউবী ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললেন।
হাকীম মাথা তুলে উচ্চকণ্ঠে বললেন- সুলতান আইউবী যা বলেছেন, সত্য বলেছেন। বলেই হাকীম ঘোড়া থেকে নেমে আসেন।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, সঙ্গীরা এই প্রথম সুলতান আইউবীকে ক্রুদ্ধ অবস্থায় দেখেছে।
হাকীম ঘোড়া থেকে নেমে মাথানত করে দাঁড়িয়ে আছেন। সুলতান আইউবী তারবারী বের করে এক আঘাতে হাকীমের মাথাটা দেহ থেকে আলাদা করে ফেলেন। তারপর ঘোড়ার পিঠে চড়ে অত্যন্ত উঁচু কণ্ঠে চীৎকার করে ওঠেন- আল্লাহর সৈনিকগণ! ইসলামের প্রহরীগণ! আমি যদি অবিচার করে থাকি, তাহলে এই নাও, আমারই তারবারী দ্বারা আমার ঘাড় উড়িয়ে দাও। সুলতান আইউবী তরবারীটা বর্শা ছোঁড়ার ন্যায় বাহিনীর দিকে ছুঁড়ে মারেন। তরবারীর আগা মাটিতে গেঁথে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
সর্বসম্মুখের সালার ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ে তরবারীটা তুলে উভয় হাতে করে আদবের সঙ্গে সুলতান আইউবীর হাতে তুলে দিয়ে বললেন- মহামান্য সুলতান! এতো আগেপ্রবণ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বাহিনীর মধ্যে রব উঠে যায়। তারা অপরাধীদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সুলতান আইউবী দুহাত উপরে তুলে সৈন্যদের শান্ত করেন এবং অপরাধীদের শাস্তি ঘোষণা করেন।
সুলতান আইউবী সেদিনই লিখিত বার্তাসহ সুদানে দূত প্রেরণ করেন- সুদানের ফৌজ যদি মিসরের সীমান্তে সামান্যতম অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে, তো আমি তাকে মিসর আক্রমণ বলে বিবেচনা করবো আর তার উত্তরে আমি সুদান আক্রমণের অধিকার সংরক্ষণ করবো। তখন আমরা সুদানে ইসলামের পতাকা উডডীন না করে ক্ষান্ত হবো না।
৬.৩ দায়িত্ব যখন সঙ্গীকে হত্যা করল
দায়িত্ব যখন সঙ্গীকে হত্যা করল
সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর তরবারী থেকে যে খুন টপ টপ করে ঝরছিলো, সেগুলো পরিষ্কার না করেই তিনি তরবারীটা খাপে ঢুকিয়ে ফেলেন। এই রক্ত সেই বিশ্বাসঘাতক হাকীমের, যিনি ক্রুসেডারদের চর ও সন্ত্রাসীর ভূমিকা পালন করছিলেন।
বিশ্বাসঘাতকতা ও শক্রর সঙ্গে হাত মেলানোর অপরাধে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিলো, শিকল বেঁধে তাদেরকে কারাগারে আটক করে রাখা হয়। সুলতান আইউবী তাঁর সালার, নায়েব সালার, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঝে বৈঠকে অস্থিরচিত্তে পায়চারি করছেন। চোখে রক্ত নেমে এসেছে তাঁর। বৈঠকে সববেতেদের উদ্দেশে তিনি অনেক কথা বলেছেন এবং বলতে বলতে এক পর্যায়ে থেমে গেছেন। বৈঠকে যারা উপস্থিত আছেন, তাদের সুলতানের আবেগ-উচ্ছ্বাস সম্পর্কে ভালোভাবেই জানা আছে। আইউবীর চোখে চোখ রাখার সাহস কারো নেই।
মহামান্য সুলতান!–এক সালার বললেন- আমরা খৃস্টানদের কোন ষড়যন্ত্র সফল হতে দেবো না।
সুলতান আইউবী হঠাৎ দ্রুততার সঙ্গে কোষ থেকে তরবারীটা বের করেন। অস্ত্রটা রক্তমাখা। তিনি তরবারীটা সমবেতদের দিকে এগিয়ে ধরে বললেন- এই রক্ত কার? এই রক্ত আপনাদের সকলের। এই রক্ত আমার। এই রক্ত আমাদের সেই ভাইয়ের, যে মসজিদে আমাদের সঙ্গে নামায আদায় করতো। তার ঘরে কুরআনও আছে। এই রক্ত যদি গাদ্দার হতে পারে, তাহলে… তাহলে খৃস্টানদের এই ষড়যন্ত্র সফল হবে। খৃস্টানদের ষড়যন্ত্র সফল হয়ে গেছে। ইসলামের যে সৈনিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফিলিস্তীনকে ক্রুসেডারদের দখল থেকে মুক্ত করার কথা ছিলো, আপসে সংঘাতে জড়িয়ে খৃস্টানরা তাদেরকে এমন দুর্বল করে ফেলেছে যে, আমরা দীর্ঘ সময়ের জন্য ফিলিস্তীন অভিমুখে যাত্রা করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের গন্তব্য বাইতুল মুকাদ্দাস ছিলো। আজ আমাদেরকে কায়রো নয়- জেরুজালেম থাকার কথা ছিলো। কিন্তু ইসলামের সামরিক শক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে।
সুলতান আইউবী তরবারীটা তাঁর দারোয়ানের প্রতি ছুঁড়ে মারেন এবং পরক্ষণেই খাপটাও খুলে তা হাতে দিয়ে বললেন- এই রক্ত যদি কোনো কাফিরের হতো, তাহলে আমি তরবারীটা ধৌত করাতাম না। এ এক গাদ্দারের খুন। খাপে এই রক্তের ঘ্রাণও যেনো না থাকে।
দারোয়ান তরবারী ও খাপ পরিষ্কার করার জন্য বাইরে নিয়ে যায়। সুলতান আইউবী সববেতদের বললেন- খৃস্টানদের ষড়যন্ত্র সফল হয়েছে। তারা চাচ্ছিলো, যেনো আমি হাল্ব অতিক্রম করে সম্মুখে যেতে না পারি। দেখছো না, সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে আমি কায়রো এসে পড়েছি! আমি আপনাদেরকে প্রবঞ্চনার মধ্যে রাখবো না। ক্রুসেডাররা এখন সম্মুখে অগ্রসর হবে। আমরা যে সময়ে আপসে লড়াই করছিলাম, তখন তারা আমাদেরকে সিদ্ধান্তমূলক পরাজয় দানের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলো।
আমরা মুসলমানদেরকে আপসে যুদ্ধ করিয়ে সালাহুদ্দীন আইউবীর গতি ঘুরিয়ে দিয়েছি। ত্রিপোলীর খৃস্টান সম্রাট রেমন্ড বললেন। তারা গোয়েন্দা মারফত সংবাদ পেয়ে গেছেন, সালাহুদ্দীন আইউবী হাল ছেড়ে মিসর চলে গেছেন এবং তার জায়গায় তার ভাই আল-আদিল রণাঙ্গনে এসেছেন। সংবাদটা জেরুজালেম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বড় ক্রুশ এবং প্রধান পাদ্রীর আস্তানা আক্ৰায়ও পৌঁছে গেছে খবরটা। তাই তৎক্ষণাৎ তারা ত্রিপোলীতে এসে বৈঠকে বসেছেন।
