আল-আদিলের সুলতান আইউবীর নিকট যাওয়ার বিষয়টি গোপন রাখা হলো। সকল সন্দেহভাজন নায়েব সালার প্রমুখদের সঙ্গে একজন করে গোয়েন্দা ছায়ার ন্যায় জুড়ে রাখা হলো। গোয়েন্দারা তাদের প্রতি মুহূর্তের গতবিধি অনুসরণ করছে।
***
আমি তোমার থেকে কোনো নতুন খবর শুনছি না- হাবের সন্নিকটে নিজ হেডকোয়ার্টারে বসে আল-আদিল থেকে বিস্তারিত শুনে সুলতান আইউবী বললেন- আমি জানি না, জাতির মধ্যে ঈমান বিক্রির যে ব্যাধির জন্ম নিয়েছে, তার চিকিৎসা কী হবে। আমার দৃষ্টি বাইতুল মুকাদ্দাস নয়- ইউরোপের উপর নিবদ্ধ। কিন্তু আমার ঈমান নীলামকারী ভাইয়েরা আমাকে মিসর থেকেই বের হতে দিচ্ছে না! সে যা হোক, এই ময়দান তুমি সামাল দাও। আমি দামেশক যাচ্ছি। সেখান থেকে মিসর চলে যাবো।
সুলতান আইউবী আল-আদিলকে রণাঙ্গনের পূর্ণ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন এবং বললেন, আমার গোয়েন্দারা এতদূর পর্যন্ত চলে গিয়েছে, খৃস্টানরা যদি আক্রমণ করে বসে, তাহলে অন্তত দু-তিনদিন আগে তুমি সংবাদ পেয়ে যাবে। আমার কমান্ডো সৈন্যরা প্রতি মুহূর্তে প্রস্তুত অবস্থায় থাকে। আমি তাদেরকে আক্রমণের সম্ভাব্য স্থানগুলোতে লুকিয়ে রেখেছি। সর্বশেষ টাটকা সংবাদ হলো, ক্রুসেডাররা হামলা করবে না। যদি আমার অনুপস্থিতি থেকে তারা ফায়দা লুটতে চেষ্টা করে, তাহলে ভয় পেয়ে না। দুর্গে আবদ্ধ থেকে লড়াই করো না। দুশমনকে সামনে আসার এবং আগে হামলা করার সুযোগ দেবে। প্রয়োজনে পেছনে সরে যাবে। এখানকার ভূমি যুদ্ধের জন্য আমাদের উপযোগি। উঁচু স্থানগুলোতে দখল বজায় রাখবে।
আর বিশেষভাবে স্মরণ রাখবে- সুলতান আইউবী বললেন- আল মালিকুস সালিহ, সাইফুদ্দীন এবং যেসব আমীর আমাদের আনুগত্য মেনে নিয়েছে, তাদের মস্তিষ্ক থেকে রাজত্বের মোহ দূর হয়নি। চুক্তি মোতাবেক তারা কোন বাহিনী রাখতে পারে না। আমি তাদের মধ্যে গোয়েন্দা প্রেরণ করে রেখেছি। আর জীবনে এই প্রথম আমি আমার নীতি পরিপন্থী সিদ্ধান্ত দিয়ে রেখেছি, আমার এই মুসলমান ভাইয়েরা যদি সামান্যতম বিরোধিতামূলক আচরণ করে, তাহলে তাদেরকে হত্যা করে ফেলবো।
কাজী বাহাউদ্দীন শাদ্দাদ তাঁর রোজনামচায় লিখেছেন, ৫৭২ হিজরীর রবিউল আউয়ালে (মোতাবেক সেপ্টেম্বর ১১৭৬)। সুলতান আইউবী রণাঙ্গন আল-আদিলের হাতে ছেড়ে দিয়ে দামেশক চলে গিয়েছিলেন। তাঁর আরেক ভাই শামসুদ্দৌলা তুরান শাহ ইয়ামান থেকে ফিরে আসেন। ইয়ামানেও ক্রুসেডারদের অপতৎপরতা শুরু হয়ে গিয়েছিলো এবং সেখানকার মুসলমানগণ সালতানাতে ইসলামিয়ার বিদ্রোহী হয়ে ওঠতে শুরু করেছিলো। সুলতান আইউবী আপন ভাই শামসুদ্দৌলাকে সেখানে প্রেরণ করেছিলেন। শামসুদ্দৌলা সাফল্য নিয়ে এসেছেন। সুলতান আইউবী তাকে দামেস্কের গবর্নর নিযুক্ত করে ১১৭৬ সালের অক্টোবর মাসে মিসর রওনা হওয় যান।
সুলতান আইউবী এখন কায়রোতে। কায়রো পৌঁছেই তিনি সন্দেহভাজন ব্যক্তিবর্গকে পদমর্যাদার তোয়াক্কা না করে গ্রেফতার করার নির্দেশ প্রদান করেন। তালিকা প্রস্তুত। তাদের গ্রেফতারীর আগের দিন পার্বত্য অঞ্চলের গুহা থেকে উদ্ধারকৃত সোনা ও ধনভান্ডার পেরেড ময়দানে এনে স্তূপ করেন। সে পর্যন্ত যতো খৃস্টান মেয়েকে পাকড়াও করা হয়েছিলো এবং সর্বশেষ যাদেরকে ধরা হয়েছে, তাদের প্রত্যেককে ধনভান্ডারের স্তূপের নিকট এনে দাঁড় করানো হয়। তাদের মধ্যে হাকীম সাহেবও আছেন। নায়েব সালারও আছেন। আছেন অনেক কমান্ডার। সকলে শিকল পরিহিত। মিসরের সকল সৈন্যকে তাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করিয়ে ময়দানে এনে দাঁড় করানো হয়।
সুলতান আইউবী ঘোড়ার পিঠে চড়ে ময়দানে এসে বাহিনীর সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে যান।
আমি জানতে পেরেছি, তোমাদেরকে সরকারের বিরুদ্ধে উস্কানি দেয়া হচ্ছে- সুলতান আইউবী উচ্চকণ্ঠে গর্জন করে বললেন তোমাদের কেউ যদি আমাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারে যে, সে ইসলামের মর্যাদা ও আল্লাহরর রাসূলের খাতিরে তোমাদেরকে আমার ও আমার সরকারের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করছে এবং প্রথম কেবলা মুক্ত করার ও স্পেন আক্রমণ করে দেশটা পুনরায় সালতানাতে ইসলামিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিজ্ঞা রাখে, তাহলে সে আমার সম্মুখে এসে পড়ুক। সে আমার তারবারীটা নিয়ে নিক এবং আমার ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করুক। দেশের শাসন ক্ষমতা তার হাতে তুলে দিয়ে আমি অবসর গ্রহণ করবো।
সর্বত্র নীরবতা ছেয়ে যায়।
সুলতান আইউবী পেছন দিকে মোড় ঘুরিয়ে আসামীদের উদ্দেশ করে বললেন- আমার স্থান দখল করার মতো লোক তোমাদের মাঝে কেউ আছে কি? আসো, সামনে এগিয়ে আসো। কাবার প্রভুর কসম করে বলছি, আমি আমার ক্ষমতা তোমার হাতে তুলে দেবো এবং নিজে তোমার আনুগত্য মেনে চলবো।
নীরবতা আরো গম্ভীর হয়ে যায়। নিঃশ্বাসটুকু ফেলার শব্দও শোনা যাচ্ছে না।
আল্লাহর সৈনিকগণ!- সুলতান আইউবী তার বাহিনীর দিকে মোড় ঘুরিয়ে বললেন- তোমাদেরকে বিদ্রোহের জন্য না ইসলামের মর্যাদার গাতিরে উত্তেজিত করা হচ্ছে, না রাসূলে খোদা (সা.)-এর আদর্শের স্বার্থে। যে ধনভান্ডার তোমাদেরকে প্রদর্শন করা হয়েছে, যে মেয়েগুলো তোমাদের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে, সেসব সেই পুরস্কার, যেগুলো এদেরকে প্রদান করা হয়েছে। এগুলো এদের ঈমানের মূল্য। আমি এদের প্রত্যেককে বলছি, তোমরা সম্মুখে এগিয়ে আসো আর বলল, আমি যা বলছি মিথ্যা বলছি।
