***
কায়রোতে হাকীমের বাসভবনটি ঘেরাও করে দরজায় করাঘাত করলে এক চাকর দরজা খুলে দেয়। গিয়াস বিলবীস কয়েকজন সৈন্য নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন। তারা হাকীমের বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালাতে শুরু করে। তাদের হাতে প্রদীপ। হাকীমের শয়নকক্ষটা ভেতর থেকে বন্ধ। আওয়াজ দিলে অর্ধনগ্ন এক মেয়ে দরজা খুলে দেয়। হাকীম পালঙ্কের উপর অর্ধ-উলঙ্গ পড়ে আছেন। পালঙ্কের কাছে মদের পিপা ও পেয়ালা। হাকীম নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অচেতন পড়ে আছেন। তার একজন রোগী কিংবা ভক্ত বিশ্বাসই করবে না, তিনি এ পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন। মেয়েটি তার স্ত্রী নয়, মুসলমানও নয়- খৃস্টানদের প্রেরিত উপহার। তার গৃহ থেকে উদ্ধারকৃত সম্পদ-ঐশ্বর্য নিঃসন্দেহে তার হালাল পন্থায় উপার্জিত নয়।
হাকীমের যখন চৈতন্য ফিরে আসে, তখন সে আলী বিন সুফিয়ানের কয়েদখানায় শিকলপরা অবস্থায় বন্দি। গিয়াস বিলবীসকে সংবাদ দেয়া হলো, হাকীম জাগ্রত হয়েছেন। তিনি হাকীমের নিকট চলে যান। বললেন, গোপন রাখার চেষ্টা করে লাভ নেই। কিছুক্ষণ ইতস্তত করলেও শেষ পর্যন্ত হাকীম অপরাধ স্বীকার করে নেন। তিনি দুজন নায়েব সালারের নাম উল্লেখ করে বললেন, তারা সুলতান আইউবীকে ক্ষমতাচ্যুত করার তৎপরতায় লিপ্ত আছে। তারা খৃস্টানদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছে। উপহারস্বরূপ এই মেয়েটিকে এবং আরো বিপুল পরিমাণ সোনা-দানা দিয়ে হাকীমকেও এই দলে যুক্ত করে নেয়া হয়েছে। তিনি শর্ত দিয়েছিলেন, নতুন সরকারে আমাকে মন্ত্রী বানাতে হবে। তার এই শর্তও মেনে নেয়া হয়। দেশের বিখ্যাত ও বড় হাকীম এবং বিশ্বস্ত ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি যখন যা বলতেন, নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করা হতো। এই গ্রহণযোগ্যতার সুযোগে তিনি সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে বিষোদগার চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
কায়রোতে নাশকতার যতো ঘটনা ঘটেছিলো, সবগুলোতে হাকীম জড়িত। ব্যক্তিত্বশীল লোক হওয়ার সুবাদে তিনি আলী বিন সুফিয়ানের বেশ কজন গোয়েন্দাকেও কিনে নিয়েছিলেন। মাহদী আল-হাসান তাদের একজন। হাকীম তার সঙ্গীদের নিয়ে প্রথমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, মাহদী আল-হাসানকে হত্যা করে ফেলবেন। কিন্তু পরে এই ভেবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়, মাহদী অতিশয় সাহসী ও যোগ্য লোক। হত্যা না করে বরং তাকে জালে আটকিয়ে নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে হবে। সেই বুদ্ধি তাদের আছে। ইতিমধ্যে আলী বিন সুফিয়ানের কতক গোয়েন্দাকে হাত করে নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে তারা। অথচ, গোয়েন্দা বিভাগে এখনো তারা বিশ্বস্ত কর্মী হিসেবে বিচেঁচিত। অবশেষে হাকীম মাহদী আল-হাসানকে জালে আটকানোর পন্থা অবলম্বন করেন।
হাকীম পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন, মাহদী আল-হাসান তার সুদর্শন প্রেতাত্মারর ফাঁদে এসে পড়বে। তারপর তাকে হাত করা ও নিজেদের মতো করে প্রস্তুত করার জন্য আছে হাশিশি ও খৃস্টান বিশেষজ্ঞরা।
মিসরের যে দুজন কমান্ডার রহস্যময় উপায়ে খুন হয়েছিলেন, তাদের সম্পর্কে হাকীম তথ্য প্রদান করেন। ঔষধের নামে হাকীম তাদেরকে এমন বিষ খাইয়ে হত্যা করেছেন, যাতে বিন্দুমাত্র তিক্ততা অনুভূত হয়নি। এমন বিষ, যা সেবন করে মানুষ নিজের মধ্যে কোন প্রকার যন্ত্রণা কিংবা পরিবর্তন অনুভব করে না এবং সেবনের বারো ঘন্টার মাথায় হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
তাদেরকে কেন খুন করা হলো? প্রশ্নের জবাবে হাকীম জানান, তারা সুলতান আইউবী ও তাঁর সরকারের অনুগত এবং দীনদার মুসলমান ছিলেন। তাদের ঈমান ক্রয় করার চেষ্টা করা হয়েছিলো। কিন্তু তারা ঈমান বিক্রি করার পরিবর্তে ক্রয়কারীদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠেছিলেন। হাকীম প্রথমে তাদের একজনের সঙ্গে এমনভাবে মিলিত হন, যেনো সাক্ষাৎটা হঠাৎ হয়ে গেছে। কথায় কথায় হাকীম তার মনে কোনো একটি রোগের ভয় ধরিয়ে দেন এবং নিজের দাওয়াখানায় নিয়ে গিয়ে ঔষধের নামে বিষ খাইয়ে দেন। এই বিষ হাশিশিদের আবিষ্কার। দিন কয়েক পর হাকীম অপর কমান্ডারের সাথেও অনুরূপ হঠাৎ সাক্ষাৎ করে বসেন এবং একই কায়দায় তাকেও বিষ প্রয়োগ করেন।
এসব চাঞ্চল্যকর ও হৃদয় কাঁপানো তথ্য হাকীম আপনা থেকে দেননি। পাতাল কক্ষের নির্যাতন তাকে মুখ খুলতে বাধ্য করেছে। তিনি জানান, দেশের সেনা বাহিনীতে একদিকে অস্থিরতা ছড়ানো, অন্যদিকে তাদের মাঝে নেশা ও যৌনতার স্বভাব সৃষ্টি করা হচ্ছে। সেনা অফিসারদেরকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি দৃঢ় চেতনাসম্পন্ন শক্ত ঈমানদারদেরকে রহস্যময় উপায়ে হত্যা করার ধারা চলছে। সুদানের ফৌজ অতিসত্বর মিসরের সীমান্ত ও সীমান্ত চৌকিগুলোর উপর হামলা চালাতে যাচ্ছে। এসকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দেবে স্বয়ং খৃস্টানরা। সীমান্ত এলাকার অধিবাসীদেরকে সুদানীরা হাত করে নেবে।
আলী বিন সুফিয়ান ও গিয়াস বিলবীস তাদের গ্রেফতার অভিযান, অনুসন্ধান ও তথ্য প্রাপ্তির এসব খবরাখবর মিসরের অস্থায়ী গবর্নর আল-আদিলকে অবহিত করতে থাকেন। কিন্তু অন্য কাউকে এসব ব্যাপার-স্যাপার কিছুই জানতে দিচ্ছেন না। হাকীম ও তার অপর সঙ্গীরা যেসব নায়েব সালার ও কর্মকর্তাদের নাম বলেছেন, তাদের গ্রেফতার করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। কিন্তু সুলতান আইউবীর ভাই আল-আদিল সাহস করছেন না। তিনি এই রহস্যকে রহস্যই রাখার নির্দেশ প্রদান করে বললেন, পরিস্থিতিটা এতই স্পর্শকাতর যে, আমি মনে করি, সুলতান আইউবী এসে যদি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তবে ভালো হবে। অবস্থাটা আসলে স্পর্শকাতরই ছিলো। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, নিজে সুলতান আইউবীর নিকট যাবেন এবং তাকে মিসর ফিরে আসতে বলবেন কিংবা তার থেকে নির্দেশনা গ্রহণ করবেন।
