আমি জানতাম, তুমি সাঁতার জানো- মাহদী আল-হাসান সাঁতার কাটতে কাটতে বললেন- সব বিদ্যায় পারদর্শী বানিয়েই তোমাদেরকে আমাদের দেশে পাঠানো হয়। বেশি পরিশ্রম করো না। আমরা যেদিকে যাচ্ছি, স্রোতের গতিও সেদিকেই।
মেয়েটি সাঁতার কাটা অবস্থায় মাহদী আল-হাসানকে নিজের রূপবান টাটকা শরীরটা শেকলে আবদ্ধ করার চেষ্টা করে; কিন্তু তার প্রচেষ্টা বিফল যায়।
বেশ কিছুদূর পথ অতিক্রম করার পর মাহদী আল-হাসান ভাবলেন বিপদের আর কোনো শঙ্কা নেই। তিনি মুখে দুটি আঙুল ঢুকিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে পদ্ধতিতে শিশ বাজান। এখন তিনি সাঁতার কাটছেন আর কিছুক্ষণ পর পর শিশ বাজান। অল্পক্ষণ পর তিনি দূর থেকে অনুরূপ একটি শিশ শুনতে পান। পরক্ষণেই দুদিক থেকে শিশ বিনিময় হতে হতে একটি নৌকা তাদের নিকটে এসে পৌঁছে।
মাহদী আল-হাসানের জানা ছিলো, যেভাবে সীমান্ত এলাকায় দেশের সীমান্ত নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে টহা সান্ত্রীরা ঘুরে বেড়ায়, তেমনি নদীতেও টহল প্রহরা থাকে। বিপদ দেখা দিলে একজন অন্যজনকে ডাকার জন্য এভাবে শিশ বাজিয়ে থাকে। এই নৌকাটাও টহল সান্ত্রীদের। মাহদী আল-হাসান তাদেরকে নিজের পরিচয় প্রদান করেন। সান্ত্রীরা তাকে ও মেয়েটিকে নৌকায় তুলে নেয়।
মেয়েটির সাঙ্গরা তাকে পাহাড়ে হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছে।
***
আলী বিন সুফিয়ান গভীর নিদ্রায় ঘুমিয়ে আছেন। এক চাকর তাঁকে জাগিয়ে বললো, মাহদী আল-হাসান নামক এক লোক একটি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। মাহদী আল-হাসান নামটাই যথেষ্ট ছিলো। আলী বিন সুফিয়ান ধড় মড় মরে উঠে দাঁড়ান এবং ছুটে বাইরে চলে আসেন।
মাহদী আল-হাসান ও মেয়েটির পরিধানের কাপড় থেকে টপ টপ করে পানি ঝরছে। আলী বিন সুফিয়ান উভয়কে কক্ষে নিয়ে বসান। কক্ষে বাতি জ্বলছে। প্রদীপের আলোতে প্রথমবারের মতো মাহদী আল হাসান মেয়েটির মুখাবয়ব দেখলেন এবং ভাবলেন, মেয়েটি তো ঠিকই বলেছিলো- আমাকে আলোতে দেখলে তুমি সবকিছু ভুলে যাবে।
মাহদী আল-হাসান হাকীমের নাম উল্লেখ করে বললেন- এক্ষুনি তার ঘরে অভিযান চালান।
মাহদী!–আলী বিন সুফিয়ান হঠাৎ বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে বললেন- কার কথা বলছো?
কেন? ঈমান বিক্রয় নতুন খবর নাকি?-মাহদী আল-হাসান বললেন এবং মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করেন- কি, হাকীম তোমাদের সঙ্গী না? এখানে মিথ্যা বললে পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে।
মেয়েটি মাথাটা নত করে ফেলে। আলী বিন সুফিয়ান তার ভেজা মাথায় হাত রেখে বললেন- এখানে তোমার সঙ্গে সেই আচরণ করা হবে না, তুমি যার আশঙ্কা করছো। তোমার রূপ-যৌবনের জন্য আমরা পাথর। আর অসহায় নারীর ইজ্জত রক্ষার সময় আমরা রেশমের ন্যায় কোমল। বলো, হাকীম কি তোমাদের সঙ্গী?
মেয়েটি মাথা দুলিয়ে হ্যাঁ বাচক উত্তর দেয়।
মাহদী আল-হাসান কী করে এসেছেন এবং কীভাবে হাকীম তাকে প্রেতাত্মার ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেছিলো, সংক্ষেপে তার বিবরণ প্রদান করেন।
আলী বিন সুফিয়ান তার চাকর-নওকর ও রক্ষী সেনাদের তলব করেন। তাদেরকে বিভিন্ন কমান্ডারের নিকট বার্তা দিয়ে প্রেরণ করেন। কোতোয়াল বিলবীসকেও তলব করেন। তিনি এরূপ বিশেষ পরিস্থিতির জন্য বিপুলসংখ্যক সৈন্যের একটি দল তৈরি করে রেখেছেন, যারা কয়েক মিনিটের মধ্যে অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে সক্ষম।
মাহদী আল-হাসানের রিপোর্ট অনুযায়ী বাহিনী তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত হয়ে যায়। আলী বিন সুফিয়ান গিয়াস বিলবীসকে দায়িত্ব প্রদান করেন, তিনি হাকীমের ঘরে হানা দিয়ে তাকে গ্রেফতার করবেন এবং তার বাড়ি ও দাওয়াখানা সীল করে দেবেন। গিয়াস বিলবীস এক ঘোড়ায় মাহদী আল-হাসানকে এবং আরেক ঘোড়ায় মেয়েটিকে তুলে নিয়ে বাহিনীসহ রওনা হন।
মেয়েটির দলের লোকেরা এতোক্ষণে তাকে অনুসন্ধান করে নিরাশ হয়ে পড়েছে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ওখান থেকে বেরিয়ে পালাবে। তাদের আশংকা হলো, মেয়েটি যদি কায়রো পৌঁছে যায়, তাহলে তাদের আস্তানার কথা বলে দিতে বাধ্য হবে। তবে দলে মতবিরোধ হয়ে গেছে। কেউ বলছে, মাহদী আল-হাসানের উট এখন এখানে। তথাপি যদি সে বেরিয়ে গিয়েই থাকে, তবু অতো তাড়াতাড়ি কায়রো পৌঁছতে পারবে না। এই মতানৈক্যের কারণে তারা এলাকা ত্যাগ করতে বিলম্ব করে ফেলেছে। অবশেষে তারা মালামাল গুটিয়ে গুহাসম কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। এমন সময় অনেকগুলো ধাবমান ঘোড়ার পদশব্দ তাদের কানে আসতে শুরু করে। বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
আলী বিন সুফিয়ানের সৈন্যরা প্রদীপ জ্বালিয়ে পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মেয়েটি তাদের সঙ্গে আছে। সে তার সঙ্গীদের আস্তানা চিহ্নিত করে দেয়। বাহিনী সেখানে গিয়ে পৌঁছে! গুহার ভেতর থেকে চার-পাঁচজন লোক ধরা পড়ে। উদ্ধার হয় নানা রকম জিনিসপত্র- দাহ্য পদার্থ, তীর ধনুক ও খঞ্জর ইত্যাদি। একটি মজবুত বাক্সে সোনা-রূপার সেই মুদ্রা, যা মিসরে সচল। ধৃতদের মধ্যে একজন মাত্র খৃস্টান। অন্যরা কায়রোর মুসলমান। তাদের নির্দেশনা মোতাবেক অন্য সঙ্গীদের অনুসন্ধান শুরু হয়। সারারাত এবং পরের পুরো দিন তল্লাশী চলে। ধরা পড়ে সব সদস্য। তন্মধ্যে দুজন মেয়ে- ঠিক মাহদী আল-হাসানের ধৃত মেয়েটির ন্যায়, যাদেরকে আলোতে দেখলে সব ভুলে যেতে হয়।
