খৃষ্টান বাহিনীর ক্যাম্পের সকলে জেগে আছে। তারা সফলতার আনন্দে উফুল্ল। কমাণ্ডার সিদ্ধান্ত জানালো, আমরা শেষ রাতের আলো-আঁধারিতে রোম উপসাগর অভিমুখে রওনা হবো। শুনে মিগনানা মারিউস বললো, মিশন তো এখনো সম্পন্ন হয়নি। সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার কাজটা এখনো বাকি আছে। কমাণ্ডার বললো, মেয়েগুলোকে উদ্ধার করার জন্য যদি আমাদের কায়রো পৌঁছুতে হতো, তখন আমাদের এ কাজটাও করা সম্ভব ছিলো। এখন একদিকে আমরা কায়রো থেকে অনেক দূরে। অপরদিকে মেয়েদেরকে পেয়ে গেছি। এদেরকে নিরাপদে ওপারে নিয়ে যাওয়া-ই এ মুহূর্তে আমাদের মূল কাজ। তাছাড়া ওটা তো ছিলো একটা অতিরিক্ত বিষয়। কাজেই সে চিন্তা বাদ দিয়ে চলো, জলদি রওনা হই।
মিগনানা মারিউস বললো–এটা আমার পরম লক্ষ্য। যে কোন মূল্যে কাজটা আমার সমাধা করতেই হবে। মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছু এ মিশন থেকে আমাকে হটাতে পারবে না। আমি সালাহুদ্দীন আইউবীকে হত্যা করার শপথ নিয়েছি। এ শপথ আমি বাস্তবায়ন না করে ক্ষান্ত হবো না। আমার প্রয়োজন একজন পুরুষ সঙ্গী আর একটি মেয়ে।
দেখ, মারিউস! আমি কাফেলার কমাণ্ডার। কী করবো আর কী করবো না, সে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব আমার। তোমার কর্তব্য আমার আনুগত্য করা। বললো কমার।
আমি কারো হুকুমের গোলাম নই, আমরা সকলেই খোদার দাস। বললো মিগনান মারিউস।
ক্ষীপ্ত হয়ে উঠে কমাণ্ডার। শাসিয়ে দেয় মারিউসকে। মিগনানা মারিউসের কাঁধে ঝুলানো তরবারী। সে-ও ক্ষীপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। কাঁধের তরবারীটা চলে আসে হাতে। উঁচিয়ে ধরে কমাণ্ডারের মাথার উপর। অবস্থা বেগতিক দেখে এক সঙ্গী এসে দাঁড়ায় মাঝখানে। নিরস্ত্র করার চেষ্টা করে মারিউসকে। উধ্বে তুলে ধরা তরবারিটা নামিয়ে ফেলে সে। তার চোখ ঠিকরে আগুন ঝরছে যেন। মনে তার প্রচণ্ড ক্রোধ। বলে
আমি খোদার এক বিতাড়িত বান্দা। ত্রিশ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদী। চলে গেছে পাঁচ বছর। আমার মোল বছর বয়সের একটি বোন অপহৃতা হয়েছিলো । আমি গরীব মানুষ। বাবা বেঁচে নেই। মা অন্ধ। আমি ছোট ছোট কয়েকটি সন্তানের জনক। গতর খেটে তাদের ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতাম। আমি গীর্জায় ক্রুশের উপর ঝুলান যীশুখৃষ্টের প্রতিকৃতির কাছে বহুবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমি.গরীব কেন? আমি তো কখনো পাপ করিনি। বিশ্বস্ততার সঙ্গেই তো আমি এত পরিশ্রম করি, কিন্তু সংসারে অভাব কেন? খোদা আমার মাকে অন্ধ করলেন কেন? কিন্তু যীশুখৃষ্ট আমার জিজ্ঞাসার কোন জবাব দেননি ।
যখন আমার কুমারী বোনটি অপহৃতা হয়ে গেলো, তখনও আমি গীর্জায় গিয়ে কুমারী মাতা মরিয়মের প্রতিকৃতির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আমার কুমারী বোনের উপর এভাবে বিপদ নেমে এলো কেন? সে তো জীবনে কখনো অপকর্ম করেনি। তবে কি খোদা তাকে এভো রূপ দিয়ে তার প্রতি জুলুম করলেন? কিন্তু না, মা মরিয়মের পক্ষ থেকেও আমি কোন জবাব পেলাম না।
একদিন এক ধনাঢ্য ব্যক্তির এক চাকর আমাকে বললো, তোমার বোন আমার মনিবের ঘরে আছে। আমার মনিব বড় বিলাসপ্রিয় মানুষ। সে সুন্দরী কুমারী মেয়েদের অপহরণ করে আনে আর তাদের সঙ্গে কদিন ফুর্তি করে কোথায় যেন গায়েব করে ফেলে। রাজ দরবারে লোকটির যাওয়া-আসা, উঠা-বসা। মানুষ তাকে বেশ শ্রদ্ধা করে। বাদশাহ তাকে একটি তরবারীও উপহার দিয়েছেন। এত পাপিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও খোদা তার প্রতি সন্তুষ্ট। দুনিয়ার আইন-কানুন তার হাতের খেলনা।
সংবাদ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমি তার ঘরে গেলাম এবং আমার বোনকে ফিরিয়ে দিতে বললাম। লোকটি ধাক্কা দিয়ে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। আমি আবারো গীর্জায় গেলাম। যীশুখৃষ্ট ও মা মরিয়মের প্রতিকৃতির নিকট দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করলাম। খোদাকে ডাকলাম। কিন্তু আমার আকুল আহ্বানে কেউ সাড়া দিলো না। আমি যখন সেদিন গীর্জায় প্রবেশ করি, তখন গীর্জায় আর কেউ ছিলো না। শেষে পাদ্রী আসলেন। তিনি আমাকে দেখে ধমক দিয়ে বাইরে বের করে দিলেন এবং বললেন–এখান থেকে দুটি মূর্তি চুরি হয়ে গেছে। তুমি জলদি চলে যাও, অন্যথায় তোমাকে আমি পুলিশের হাতে তুলে দেবো। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন, এটা কি খোদার ঘর নয়? তিনি বললেন, আমাকে না বলে তুমি এ ঘরে ঢুকলে কেন? পাপের ক্ষমা-ই যদি চাইতে হয়, তাহলে আমার কাছে এসো; কি পাপ করেছে বলো, আমি খোদাকে বলবো তোমাকে ক্ষমা করে দিতে। খোদা সরাসরি কারো কথা শুনেন না। যাও, বের হও এখান থেকে। এই বলে তিনি খোদার ঘর থেকে আমাকে তাড়িয়ে দিলেন।
মিগনানা মারিউসের করুণ কণ্ঠের স্মৃতিচারণে সকলে অভিভূত হয়ে পড়ে। অশ্রু ঝরতে শুরু করে মেয়েদের চোখ বেয়ে। মরুভূমির রাতের নিস্তব্ধতায় তার কথাগুলো সকলের মনে যাদুর মতো রেখাপাত করে।
কিছুক্ষণ মৌন থেকে মিগনানা আবার বলে, সেদিন আমি পাদ্রী, যীশু-খৃষ্ট, কুমারী মরিয়মের প্রতিকৃতি এবং খোদার প্রতি তীব্র সংশয় নিয়ে বেরিয়ে এলাম। মনে প্রশ্ন জাগলো, এরা যদি সত্য-ই হয়ে থাকে, তাহলে আমার প্রতি এতো অত্যাচার কেন? কেন এরা কেউ আমার আকুতিতে সাড়া দিলো না? বাড়ি গেলে অন্ধ মা জিজ্ঞেস করলেন, বাছা! আমার মেয়েকে নিয়ে এসেছো? স্ত্রী জিজ্ঞেস করলো, জিজ্ঞেস করলো সন্তানরা। যীশু-মরিয়ম-খোদার মত আমিও নীরব রইলাম, কথা বললাম না। কিন্তু আমার সহ্য হলো না। ভেতর থেকে একটি প্রচণ্ড ঝড় উঠে এলো। সঙ্গে সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এলাম। জ্ঞানশূন্যের মত আমি সারাদিন ঘুরতে থাকি।
