এই পার্বত্য ভূখন্ডটির অভন্তরে- যে পর্যন্ত কোন পথচারি কিংবা রাখাল গেছে না- এক পাহাড়ের পাদদেশে একটি গুহার মুখ আছে। মুখটি অপ্রশস্ত। তারই পেছনে এতো প্রশস্ত এক গুহা, যেনো ওটা গুহা নয় সুপরিসর একটি কক্ষ। তার মধ্যে বসে আছে বহু সংখ্যক মানুষ। দুটি মেয়েও আছে।
এ যাবত তো তার ফিরে আসার কথা ছিলো। একজন বললো।
এসে পড়বে- অপর একজন বললো- এখানে কোনো বিপদ নেই। আজ সে তাকে নিয়েই আসবে।
লোকটা কাজের- একজন বললো- বেটা অনেক অভিজ্ঞ। আমরা তাকে প্রস্তুত করে নেবো।
এমন সময় এক ব্যক্তি দৌড়ে এসে ভেতরে ঢুকে বললো- গোপাল মৃত পড়ে আছে। মেয়েটির কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। গোপালকে খঞ্জরের আঘাতে মারা হয়েছে!
ওহ, মাহদী আল-হাসান কোথায়? একজন জিজ্ঞাসা করে।
কোথাও পাওয়া যায়নি- আগন্তুক জবাব দেয়- তার উট এখানেই আছে। কিন্তু তাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।
দুটি প্রদীপ হাতে নিয়ে সবাই গুহা থেকে বেরিয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে শুরু করে। তারা সুড়ঙ্গের মুখ পর্যন্ত গিয়ে খোঁজাখোজি করে। ওখানে তাদের সঙ্গীর লাশ পড়ে আছে। তারা সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে দেখে মেয়েটির কাফনটা পড়ে আছে। দলনেতা বললো, দুজন লোক বাইরে চলে যাও। বাইরের দিক থেকে যদি কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সংবাদ দিও। আর তাকে পাওয়া গেলে ধরে ফেলে। মোকাবেলা করলে মেরে ফেলল। অন্যরা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ো। লোকটা এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছে। সকাল পর্যন্ত পাওয়া না গেলে আমাদের এ স্থান ত্যাগ করতে হবে।
মাহদী আল-হাসান মেয়েটিকে কাঁধে নিয়ে এখন মহা বিপাকে। সুড়ঙ্গওয়ালা পাহাড় থেকে তিনি অনেক দূরে চলে এসেছেন। সামনের পাহাড়টি বেশ উঁচুও বটে। যেন একটি প্রাচীর, যার উপর এক সঙ্গে উভয় পা রাখা অসম্ভব। তিনি এই দেয়ালসম পাহাড়টির উপর ঘোড়ার পিঠে বসার মতো বসে পড়েন। বসে বসে সম্মুখের দিকে এগুতে থাকেন। মেয়েটিকে কাঁধের উপর সামলে রাখা এবং তার ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। মেয়েটিও তার ভারসাম্য ব্যাহত করার জন্য নড়াচড়া করতে শুরু করে। মাহদী আল-হাসান বুঝে, এখান থেকে পড়ে গেলে হাড়-গোড় ভেঙে চূর্ণ হয়ে যাবে। তারপরও মেয়েটির এই আত্মঘাতি আচরণ। তা থেকেই তিনি অনুমান করে নেন, এই পার্বত্য এলাকায় যে রহস্য আছে- যার সবকিছু এই মেয়েটির বক্ষে প্রোথিত- এতই মূল্যবান এবং স্পর্শকাতর যে, তাকে লুকাবার স্বার্থে মেয়েটি মাহদী আল হাসানকেসহ পড়ে গিয়ে আত্মহত্যা করতে চাচ্ছে।
মাহদী আল-হাসান এগিয়ে চলছেন। কিন্তু পথ শেষ হচ্ছে না। মেয়েটি তাকে ব্যাঘাত করেই যাচ্ছে। ওদিকে মেয়েটির দলের লোকেরা অনুসন্ধানে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতিটা তাদের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন। আস্তানা ধরা পড়া তাদের জন্য পরাজয় ধরা পড়লে অসহনীয় নির্যাতন আর মৃত্যু অনিবার্য।
মাহদী আল-হাসান মেয়েটির একটি বাহু এমন শক্তভাবে ধরে রেখেছেন যে, তার হাড়-গোড় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। এই মুহূর্তে দৈহিক শক্তি ও সাহসিকতা ছাড়াও তিনি আত্মিক শক্তিও প্রয়োগ করছেন। অবশেষ সব শক্তির বিনিময়ে তিনি প্রাচীর অতিক্রম করে অপর প্রান্তে পৌঁছে যেতে সক্ষম হন।
সামনের চূড়াটা বেশ চওড়া। মাহদী আল-হাসান মেয়েটিকে ধপাস্ করে মাটিতে ফেলে দিয়ে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন- তুমি কি আমার পথ আগলেই বাখবে? ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তিনি মেয়েটিকে চীৎ হওয়া অবস্থায় কয়েক পা হেঁচড়ে নেন এবং বললেন- আর কোনো সমস্যা সৃষ্টি করলে এভাবে টেনে-হেঁচড়েই নিয়ে যাবো। মরতেই যদি চাও, তো মরে যাও।
মাহদী আল-হাসান দূরে নীচে একটি প্রদীপ দেখতে পান। তিনি অতিশয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তবে এই ভেবে আশ্বস্ত হন যে, এখন তিনি আপদমুক্ত। ধরা পড়ার আশঙ্কা আর নেই। কিন্তু এখান থেকে বের হওয়া সহজ হবে না। অথচ, তাকে অতি দ্রুত কায়রো পৌঁছতে হবে। তিনি মেয়েটির পা খুলে দেন। হাত দুটো পিঠমোড়া করে বাঁধা আছে। তাকে নিজের সম্মুখে নিয়ে এসে খঞ্জরের আগা তার পিঠের সঙ্গে লাগিয়ে বললেন- চলো, আমার কথা ছাড়া ডানে-বাঁয়ে তাকাবে না। মাহদী আল-হাসান ও মেয়েটির সন্ধানে ছড়িয়ে পড়া লোকগুলো সুড়ঙ্গ পথ ও তার আশপাশের এলাকায় ঘুরে ফিরছে। তিনি যে পথে ভেতরে যাওয়া-আসা করেছেন, দুব্যক্তি সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়।
***
মাহদী আল-হাসান মেয়েটিকে নিয়ে চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে এমন এক টিলায় এসে পৌঁছান, যার সম্মুখে আর কিছু নেই। তার এতোটুকু দক্ষতা আছে যে, তিনি ঘোর অন্ধকারেও অপরিচিত এলাকার ভাব-গতি আন্দাজ করতে পারেন। তিনি বুঝে ফেললেন, নীচে নদী এবং এটাই নীল নদ। তিনি মেয়েটির হাতের বন্ধন খুলে দেন। মুখের কাপড়ও সরিয়ে নেন। টিলার ঢাল খাড়া। তিনি মেয়েটিকে বললেন, বসো এবং নীচে পড়ে যাও।
উভয়েই নিজেদেরকে টিলার ঢালে ছেড়ে দিয়ে গড়িয়ে নীচে নেমে আসেন। নদীর পানির কলকল ধ্বনি স্পষ্ট শোনা যেতে শুরু করে। মাহদী আল-হাসান ও মেয়েটি এখন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছেন।
মাহদী আল-হাসান মেয়েটিকে বললেন–ঝাঁপ দাও। মেয়েটি বললো- আমি সাঁতার জানি না।
মাহদী আল-হাসান খঞ্জরটা কোষবদ্ধ করে কোমরের সঙ্গে বেঁধে নেন। মেয়েটিকে শক্তভাবে বগলদাবা করে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নদীর গতি কায়রোরই দিকে। কিছুক্ষণ সাঁতার কাটার পর হঠাৎ তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে আস্তে করে মেয়েটিকে ছেড়ে দেন। দেখলেন, মেয়েটি নৈপুণ্যের সাথেই সাঁতার কাটছে।
