সুলতান আইউবী তার ফৌজ, বিশেষত তার জানবাজ সৈন্যদের অন্তরে এই নীতি প্রোথিত করে দিয়েছেন- তোমরা আল্লাহর নামে যতো ঝুঁকি মাথায় তুলে নেবে, তা ঝুঁকি থাকবে না। তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাহায্য লাভ করবে। আজ যদি তোমরা কুসংস্কারে শিকার হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঈমান এতো দুর্বল হবে যে, তারা কুফরের সম্মুখে অস্ত্রসমর্পণ করতে দ্বিধাবোধ করবে না।
এমনি আরো কিছু পাঠ মাহদী আল-হাসানের মনে পড়ে যায়। নিজে কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, সেই অনুভূতিও তার হৃদয়ে জাগরুক হয়ে ওঠে।
***
মাহদী আল-হাসান মেয়েটির হাত-পা বেঁধে তাকে কাঁধে তুলে নিয়ে সুড়ঙ্গের অপর মুখের দিকে এগিয়ে যান। প্রশিক্ষণের সব পাঠ তার মনে পড়ে যায়। এখন তার চার পার্শ্বে সুলতান আইউবীর কণ্ঠ গুঞ্জরিত হচ্ছে একজন বিশ্বাসঘাতক যেমন সমগ্র জাতিকে অপমান ও লাঞ্চনার মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারে, তেমনি একজন স্বাধীনতাকামী ঈমানদার জানবাজও গোটা জাতিকে বড় বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।
মাহদী আল-হাসানের হৃদয়ে এই অনুভূতিটা এক শক্তিশালী চেতনার রূপ ধারণ করে জেগে ওঠে যে, আমার জাতি- দেশবাসী যে গভীর ঘুম ঘুমায়, তা তারই উপর ভরসা করে ঘুমায়। তিনি গোয়েন্দাদের পাতাল যুদ্ধের জানবাজ সৈনিক। তার জানা আছে, দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বিশাল বাহিনী ও অশ্বারোহী সৈন্যদের ঝড় এবং তীর বৃষ্টির মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু দুশমনের গুপ্তচর ও নাশকতাকারীদের মোকাবেলা স্রেফ এক দুজন গোয়েন্দাই করতে পারে। মাহদী আল-হাসান জাতির প্রহরী ও নিরাপত্তার জিম্মাদার। কিন্তু একটি প্রশ্ন তাকে পেরেশান করে ফিরছে তাহলে হাকীম সাহেবও কি দুশমনের নাশকতাকারী চক্রের সদস্য?
এভো বড় একজন আলেম, দেশের এমন নামকরা এজন ডাক্তার প্রশাসনের উচ্চপদস্ত কর্মকর্তাগণ পর্যন্ত যাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকেন দুশমনের সঙ্গী হতে পারেন, মাহদী আল-হাসানের মন মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে পড়ে যায়, প্রশিক্ষণের সময় বলা হয়েছিলো এবং তার বাস্তব অভিজ্ঞতাও যে, কোনো পদমর্যাদা, সুনাম-সুখ্যাতি ঈমান বিক্রয়ের পথে প্রতিবন্ধক নয়। যার আছে, ঈমান সে-ই বিক্রয় করতে পারে। আর বাস্তব অভিজ্ঞতা হচ্ছে, ঈমান উচ্চপদের লোকেরাই বেশি বিক্রয় করে থাকেন। তাদের ঈমানের মূল্য অধিক।,
এখন মাহদী আল-হাসানের সম্মুখে সমস্যা, মেয়েটাকে নিয়ে তিনি কোন পথে বের হবেন এবং উট পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছবেন। মেয়েটার থেকে তিনি পথনির্দেশ নিতে চাচ্ছেন না। কারণ, ভুল নির্দেশনা দিয়ে সে তাকে নতুন কোন ফাঁদে আটকাতে পারে। যে পথে বের হওয়া প্রয়োজন, সে পথ বন্ধ। সুড়ঙ্গের অপর মুখে বের হয়ে কোন্ পথে যেতে হবে, তার জানা নেই।
মাহদী আল-হাসান মেয়েটাকে নিয়ে সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসেন। সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে কিছুদূর নিয়ে এক স্থানে মেয়েটাকে মাটিতে বসিয়ে রাখেন এবং তার মুখ থেকে কাপড়টা খুলে দিয়ে বললেন- বলবে কি আমি কোন্ পথে যাবো, যে পথে তোমার কোন লোক নেই?
বলবো, যদি একা যাও।
তুমিও আমার সঙ্গে যাবে–মাহদী আল-হাসান বললেন- আমাকে ফাসাবার চেষ্টা করলে তোমাকে বেঁচে থাকতে দেবো না। প্রয়োজন হলে নিজেও জীবন দেবো।
তুমি যেসব ভেদ জানতে চাচ্ছো, আমি সব বলে দেবো। তবু তুমি একাকি যাও।
সব ভেদই আমার জানা হয়ে গেছে- মাহদী আল-হাসান বললেন তুমি আমাকে পথ দেখাও।
একটিবার মাত্র আমাকে আলোতে দেখে নাও-মেয়েটি বললো তারপর আমাকে নিজের মনে করো। একটিবারের জন্য আমার সঙ্গে চললো। আমি তোমাকে ধোকা দেবো না।
মেয়েটি মাহদী আল-হাসানের পৌরুষে সুড়সুড়ি জাগানোর চেষ্টা চালায়, সোনা-জহরতের প্রলোভন দেখায়; কিন্তু রাস্তা দেখাচ্ছে না। মাহদী আল-হাসান পুনরায় কাপড় দ্বারা তার মুখটা বেঁধে ফেলেন এবং আপনা থেকে একটি নিরাপদ রাস্তা আবিষ্কার করে নেন। এই পথটা পর্বতমালার উপর দিয়ে। তিনি হাত-পা বাঁধা মেয়েটাকে সেখানেই বসিয়ে রেখে নিজে উপরে আরোহণ করতে শুরু করেন। কিন্তু নীচে কানো শব্দ শুনে সেখানেই থমকে দাঁড়ান। এক পুরুষ মেয়েটাকে ডাকছে। মাহদী আল-হাসান ধীরে ধীরে নীচে নেমে আসেন এবং মেয়েটির সন্নিকটে একটি পাথরের আড়ালে বসে পড়েন। লোকটি বোধ হয় মেয়েটাকে দেখে ফেলেছে।
তুমি কথা বলছো না কেন?- লোকটি জিজ্ঞেস করে এবং উপরে উঠে আসতে শুরু করে। মেয়েটার মুখ বন্ধ। লোকটি তার একেবারে কাছে চলে এসে বললো- কী হয়েছে তোমার? ওদিকে যাওনি কেননা
মাহদী আল-হাসান তার পার্শ্বেই বসা। ব্যবধান দু-চার পায়ের। তিনি উঠে সর্বশক্তি ব্যয়ে লোকটির পিঠে খঞ্জরের আঘাত হানেন। পরক্ষণেই আরেক আঘাত। দুটি আঘাতই সফল হয়। লোকটি কোনো শব্দ করারও সুযোগ পেলো না। মাহদী আল-হাসান তাকে টেনে নিয়ে সেই পাথরটার নীচে ফেলে দেন, যার তলে তিনি নিজে লুকিয়ে ছিলেন। তিনি মেয়েটাকে কাঁধে তুলে নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে যান। পাহাড়টা তেমন উঁচু নয়। তবে উপরটা চওড়া। তিনি হাঁটতে শুরু করেন।
মাহদী আল-হাসানের জন্য সহজ উপায় এটাই ছিলো যে, তিনি রাতটা কোথাও লুকিয়ে থাকবেন এবং দিনের আলোতে বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু তাকে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব কায়রো পৌঁছে যেতে হবে, যাতে রাত পোহাবার আগে আগেই হাকীমের গ্রেফতারী এবং এই অঞ্চলটাকে অবরোধ করে ফেলার আয়োজন করা যায়।
