এখানে তুমি কী করছো?
ধনভান্ডার উত্তোলন করছি- মেয়েটি বললো- আমার সঙ্গে অনেক লোক আছে।
তারা কোথায়?
আমার সঙ্গে চলো- মেয়েটি বললো- সকলে তোমাকে স্বাগত জানাবে। আমাকে আলোতে দেখলে তুমি যতোসব ধনভান্ডার আর নিজের জগতের কথাই ভুলে যাবে।
মেয়েটির সুরভিত দেহ অন্ধকারের মধ্যে মাহদী আল-হাসানকে বিমোহিত করে তুলছে। তার দেহের সৌরভে মাতাল করে তুলছে সুলতান আইউবীর এই পরিপক্ক ঈমানদার গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে। তিনি প্রথম যখন মেয়েটাকে ঝাঁপটে ধরেছিলেন, তখনই আঁচ করে নিয়েছেন, এই দেহ ঈমান ক্রয়ের ক্ষমতা রাখে। কণ্ঠটাও তার সুরেলা। মাদকতা ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে তুলছে মাহদী আল-হাসানকে।
ঠিক সে সময়ে সুড়ঙ্গের মুখে আবারো আলো জ্বলে ওঠে। মাহদী আল হাসান চৈতন্য ফিরে পান। তিনি মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করা সমীচীন মনে করলেন না, সুড়ঙ্গের পেছনেও তার লোকেরা আছে কিনা। সম্মুখের মুখে বের হতে চাচ্ছেন না তিনি। কারণ, তিনি নিশ্চিত, ওদিকে মানুষ আছে এবং তারাই আলো জ্বালাচ্ছে ও নেভাচ্ছে।
ওঠো- মাহদী আল-হাসান মেয়েটাকে তুলে দাঁড় করালেন এবং বললেন- কাফনটা খুলে ফেলল।
মেয়েটি দেহ থেকে কাফনটাকে খুলে ফেলে। মাহদী আল-হাসান কাপড়টা ছিঁড়ে তিনটি টুকরা বের করেন। একটি দ্বারা মেয়েটির দুই হাত পিঠমোড়া করে বাঁধেন। একটি দ্বারা টাখনুর কাছে দিয়ে পা দুটো বাধেন এবং অপর খন্ড দ্বারা মুখটা বেঁধে তাকে কাঁধের উপর তুলে নেন। খঞ্জরটা হাতে আছে। তিনি সুড়ঙ্গের পেছন মুখের দিকে হাঁটা দেন। এখান থেকে তাকে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে যাওয়া আবশ্যক।
মাহদী আল-হাসান গতরাতে যখন এখানে এসেছিলেন, তখন প্রেতাত্মার সঙ্গেই মিলিত হতে এসেছিলেন। তখন সুড়ঙ্গের মুখে আলোর ঝলকের মধ্যে তার কাঙ্খিত আত্মাটিকে এক নজর দেখেছিলেন। আজ দিনের বেলা এসে সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে অপর প্রান্ত দিয়ে বের হয়েছিলেন। সেখানে তিনি মাটিতে পড়ে থাকা পাতলা এক চিলতে কাপড় দেখতে পেয়েছিলেন। কাপড়টা দেখামাত্র তার মনে পড়ে যায়, এরূপ কাপড় দ্বারা মৃত ব্যক্তিকে কাফন পরানো হয়। মাহদী আল-হাসান আলী বিন সুফিয়ানের প্রশিক্ষণ ও দীক্ষাপ্রাপ্ত গোয়েন্দা। সামান্য বিষয় এবং সূক্ষ্য ইঙ্গিতকে তিনি অনেক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে থাকেন। আজ রাত যখন প্রেতাত্মার সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন হাকীমের বারুণ সত্ত্বেও তিনি খঞ্জরটা সাথে করে নিয়ে এসেছেন। এটা পরীক্ষার একটা পদ্ধতি। সঙ্গে অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও প্রেতাত্মা তাকে ধরা দিয়েছে। হাকীমের তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
মাহদী আল-হাসান সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি সুড়ঙ্গের মুখে আলোর ঝিলিক দেখামাত্র সেখানে চলে যান এবং সেখান থেকে উপর দিকে তাকিয়ে দেখেন। সেখানেই আগুনের শিখা লুকায়িত ছিলো। সুড়ঙ্গের মুখের আলোটা সেখান থেকেই আসছিলো।
মাহদী আল-হাসানের এ জাতীয় অন্য দুটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। সে ঘটনায় বেশ কজন খৃস্টান এজেন্ট পাকড়াও হয়েছিলো এবং তাদের প্রতারণার কৌশল ফাঁস হয়ে গিয়েছিলো। অন্যথায় সরল মানুষেরা এ জাতীয় আলোকে গায়েবের জ্যোতি বলেই বিশ্বাস করতো। উক্ত ঘটনা দুটোতে অভিযান পরিচালনাকারীদের মধ্যে মাহদী আল-হাসানও ছিলেন। তিনি বুঝে ফেললেন, সুড়ঙ্গের ঠিক বিপরীতে পাহাড়ের উঁচুতে যে অগ্নিশিখা দেখা যাচ্ছে, সুড়ঙ্গের মুখে তারই আলো এসে পড়ছে।
প্রশিক্ষণের সময় মাহদী আল-হাসান জানতে পেরেছিলেন, মৃত্যুবরণ করার পর ইহ-জগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ তার আত্মাকে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানোর জন্য ছেড়ে দেন না যে, সে মানুষের পেছনে পেছনে ছুটে বেড়াবে। যে মৃত্যুবরণ করে, সে না দৈহিকভাবে ফিরে আসে, না আত্মা কিংবা প্রেতাত্মার আকৃতিতে। প্রশিক্ষণের সময় মাহদী আল-হাসানের মনে দৃঢ়তার সঙ্গে এই বিশ্বাস জন্মানো হয়েছিলো যে, আল্লাহ মানুষকে এতো বেশি দৈহিক ও আত্মিক শক্তি দান করেছেন যে, সে পাহাড়-পর্বতকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলার ক্ষমতা রাখে। ঈমান যতো শক্ত হবে, এই শক্তি ততো বেশি হবে। ভূত-প্রেতের বিশ্বাস মানুষের মস্তিষ্কের সৃষ্টি। খৃস্টানরা আমাদের ঈমানকে দুর্বল করার লক্ষ্যে অলীক ধ্যান-ধারণা ও ভিত্তিহীন বিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে।
এই শিক্ষাটা জাতির প্রতিজন মানুষেরই পাওয়ার প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু এটা সম্ভব ছিলো না। সুলতান আইউবী যে লড়াকু গোয়েন্দা তৈরি করেছেন, বহু কষ্টে তাদেরকে ঈমানী শক্তির ধরণ ও প্রকৃতি বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। তাদেরকে অলীক ধ্যান-ধারণা থেকে দূরে রাখা হয়েছে। তাদেরকে বাস্তব দীক্ষাও প্রদান করা হয়েছে।
খৃস্টানরা তোমাদের সম্মুখে হযরত ঈসাকে ধরায় নামিয়ে এনেছিলো মাহদী আল-হাসানের আলী বিন সুফিয়ানের একটি পাঠ মনে পড়ে যায়–তোমাদের সম্মুখে খোদাকেও নামিয়ে এনেছিলো। এখন ধরে এনেছে প্রেতাত্মাদের। এ প্রতারণা তুমি নিজ চোখে দেখেছো। এও দেখেছো, এই প্রতারণার জালকে তারা কীরূপ নৈপুণ্যের সাথে বিছিয়ে থাকে। তুমি তো স্বচক্ষে দেখেছো, ওসব ভেল্কিবাজি ছিলো। সেসব তৎপরতা ছিলো ইসলামী চিন্তা-চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য, যা তোমরা ব্যর্থ করে দিয়েছে। আল্লাহ পূর্ব থেকেই পৃথিবীতে আছেন। আল্লাহ আমাদেরকে নূর দান করেছেন। খৃস্টানরা মুসলমানদের হৃদয়জগত থেকে সেই নূরকে নিভিয়ে ফেলতে সদা তৎপর।
