উটটা গতকালের জায়গায় বসিয়ে রেখে মাহদী আল-হাসান পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন এবং পায়ে হেঁটে সেই স্থানে গিয়ে পৌঁছেন, যেখান থেকে সুড়ঙ্গের মুখটা দেখা যায়। মাহদী আল-হাসান পেছনে কারো পায়ের শব্দ শুনতে পান, যা তৎক্ষণাৎ নীরব হয়ে যায়। পরক্ষণেই উপর থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ কানে আসে, যা অতোটা উচ্চ নয়। কিন্তু এমন সুনসান নীরবতার মধ্যে গড়িয়ে পড়া পাথরটি স্থির হওয়ার পরও শব্দটি কানে বাজতে থাকে। তারপর শব্দটি গুঞ্জরণে পরিণত হয়ে শূন্যে সাঁতার কাটতে শুরু করে, যেনো কোন মানুষ কান্নার পর ফোঁপাচ্ছে। এভাবে কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর এবার মাহদী আল-হাসান কারো কান্নার শব্দ শুনতে পান।
আমার সম্মুখে এসে যাও- মাহদী আল-হাসান উচ্চস্বরে বললেন আমার জগত অপবিত্র–আমি অপবিত্র নই।
তুমি আমাকে আবারো ছেড়ে চলে যাবে- নিকটের কোনো এক স্থান থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে আসে।
মাহদী আল-হাসানের আওয়াজ আর উক্ত নারীকণ্ঠের আওয়াজ বারংবার কানে আসতে থাকে, যেনো একে অপরের পেছনে ছুটে চলছে। হঠাৎ এক স্থানে আলো ঝলসে ওঠে এবং নিভে যায়। মাহদী আল-হাসান এই আলোতে সুড়ঙ্গের মুখটা দেখতে পান। তিনি লম্বা পায়ে সম্মুখে এগিয়ে যান এবং সুড়ঙ্গের মুখের সামান্য নীচে বড় একটি পাথরের পেছনে লুকিয়ে পড়েন। তিনি গত রাতে উপরে যে স্থানটিতে আগুন দেখেছিলেন, তার প্রতি তাকান। আগুন তো নয়- ছিলো প্রবঞ্চনা। সেই প্রচঞ্চনা আজো বিদ্যমান।
সুড়ঙ্গের মুখটা অপেক্ষাকৃত উঁচু। মাহদী আল-হাসান উপুড় হয়ে পেটে ভর করে ধীরে ধীরে উপরে উঠে যান। কয়েক মুহূর্ত পরই তিনি সুড়ঙ্গের মুখে ঢুকে পড়েন। সেখান থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে উপরে যেদিক থেকে আগুনের প্রবঞ্চনাটা আসছিলো, সেদিকে তাকান। তিনি আগুনের এমন একটি আলো দেখতে পান, যার শিখা কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
মাহদী আল-হাসান সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে একটি নারীকণ্ঠ শুনতে পান দুহাজার বছর যাবত আমি তোমার পথ পানে চেয়ে আছি।
মাহদী আল-হাসান সুড়ঙ্গের দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে আরো ভেতরে চলে যান। তার মনে পড়ে যায়, হাকীম তাকে বলেছিলেন, সঙ্গে অস্ত্র নেবে না। অন্যথায় মেয়েটির আত্মা তোমার সম্মুখে আসবে না। এখন তার সঙ্গে দেড়ফুট লম্বা একটা খঞ্জর আছে। তথাপি প্রেতাত্মাতার সঙ্গে কথা বলছে। তিনি আরো এগিয়ে যান এবং সুড়ঙ্গের মধ্যস্থলে পৌঁছে যান। সুড়ঙ্গটা বেশ প্রশস্ত। তিনি কারো আগমন অনুভব করেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেয়ালের কোল ঘেঁষে বসে পড়েন। কে একজন তার গা ঘেঁষে অতিক্রম করতে শুরু করে। এতো ঘোর অন্ধকারেও তিনি অনুমান করতে সক্ষম হন, লোকটি সেই মেয়ে এবং কাফনের কাপড়ে জড়ানো।
মেয়েটি দাঁড়িয়ে যায় এবং কান্নার ভান ধরে। মাহদী আল-হাসান এই শব্দ পূর্বেও কয়েকবার শুনেছেন। তার বুকটা ধড়ফড় করতে শুরু করে। কাফন-জড়ানো মেয়েটি মাথাটা মাহদী আল-হাসানের দিকে এগিয়ে দেয়। ঠিক তখন সুড়ঙ্গের মুখ আলো জ্বলে উঠে ও নিভে যায়। মাহদী আল হাসান বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যান এবং বিদ্যুতিতে পেছন থেকে মেয়েটিকে ঝাঁপটে ধরেন। মেয়েটি বলে ওঠে- ওরে হতভাগা! এটা রসিকতার সময় নয়। আমাকে ছেড়ে দাও। অন্যথায় বিপদে পড়বে।
মাহদী আল-হাসান যে সন্দেহে জীবনের বাজি লাগিয়ে মেয়েটাকে ধরে ফেলেছেন, তা নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বুঝে ফেলেছেন, এটা যদি প্রেতাত্মা হতো, তাহলে তিনি তাকে ধরতে পারতেন না। আর সত্যিই যদি এটা প্রতারণা হয়ে থাকে, তাহলে তিনি বিরাট কিছু অর্জন করে ফেলেছেন।
কাফন, জড়ানো নারীর কণ্ঠ শোনামাত্র মাহদী আল-হাসান তার কানে কানে বললেন- উচ্চস্বরে কথা বললে খঞ্জরটা পাজরের এক পাশ দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য পাশ দিয়ে বের করবো।
আর আমি তোমার হৃদপিন্ড ও কলিজাটা মুখের পথে বের করে চিবিয়ে খাবো- মেয়েটি বললো- আমি আত্মা।
মাহদী আল-হাসান এক হাতে মেয়েটার বাহু ধরে রেখে অপর হাতে খঞ্জর বের করে তার আগাটা মেয়েটার পাজরে ঠেকিয়ে ধরেন। সুড়ঙ্গের সম্মুখের মুখে আরেকবার আলো জ্বলে ওঠে। ওদিকে যাওয়া মাহদী আল হাসানের জন্য বিপজ্জনক।
আমি এ কারণেই তোমাকে আমার কাছে আসতে দিচ্ছিলাম না যে, তুমি প্রতারক এবং ধ্বংসশীল জগতের মানুষ- মেয়েটি ক্ষীণ অথচ ক্রিয়াশীল ভঙ্গিতে বললো- দুই হাজার বছর যাবত আমি তোমার পথপানে তাকিয়ে আছি।
তোমার অপেক্ষার দিন শেষ হয়ে গেছে- মাহদী আল-হাসান বললেন- এখন আর তুমি পাক জগতে ফিরে যেতে পারবে না। তুমি এখন আমাদের অপবিত্র জগতের নারী।
আমি নারী নই- মেয়েটি বললো- আমি তরুণী। আমি রূপসী মেয়ে। আমি উচ্চশব্দে কথা বলবো না। আমার বক্তব্য গভীরভাবে শোনো। আমি জানি তুমি কে এবং এখানে কেন এসেছে। তোমাকে আমার এতো ভালে লাগে যে, আমি তোমাকে পাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং এই পন্থা অবলম্বন করেছি।
তাহলে আমার সঙ্গে চলো। মাহদী আল-হাসান বললেন।
না- মেয়েটি বললো- তোমার সঙ্গে গেলে আমরা না খেয়ে মারা যাবো। বরং তুমি আমার সঙ্গে চলল। তাহলে ফেরাউনদের সব ধনভান্ডার আমাদের হবে। তখন আর তোমাকে মরু বিয়াবান ও পাহাড়-বনে ঘুরে ফিরতে হবে না এবং সামান্য বেতন-ভাতার বিনিময়ে কারো গুপ্তচরবৃত্তি করে বেড়ানোর প্রয়োজন হবে না।
