এখনো তিনি সুড়ঙ্গের অর্ধেক অতিক্রম করেননি, এমন সময় সুড়ঙ্গের সম্মুখপানে আলো ঝলসে ওঠে। কিন্তু এই আলোতে কাফন জড়ানো লাশ নেই।
আলো নিভে গেছে। মাহদী আল-হাসান সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসেন। সম্মুখে এবং খানিক বায়ে উঁচুতে হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে। কিন্তু সেটা অন্য কোন দিকের আলো, যেনো কেউ কোনো গর্তে কিংবা টিলার পেছনে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে। মাহদী আল-হাসান কি যেনো ভাবেন এবং যেদিক থেকে এসেছিলেন সেদিকে হাঁটা দেন। তিনি এই পার্বত্য অঞ্চল থেকে বেরিয়ে যান। উটটা বাইরে বাঁধা ছিলো। তিনি উটের পিঠে চড়ে বসে কায়রো অভিমুখে রওনা দেন। মনে তার কোন ভীতি নেই। তবে কেমন যেনো অস্থিরতা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। তিনি পাহাড়ের অভ্যন্তরে দেখে আসা আলো দুটির ব্যাপারে ভাবছেন।
মাহদী আল-হাসান গন্তব্যে পৌঁছে যান। এখন গভীর রাত। তবু তার ঘুম আসছে না। বারংবার কাফন জড়ানো লাশটা চোখের উপর ভেসে উঠছে।
***
অভ্যাসমত মাহদী আল-হাসান ভোরবেলা উঠে পড়েন। যন্ত্রের ন্যায় নিত্যদিনের কাজগুলো সেরে নেন। আলী বিন সুফিয়ানের নিকট গিয়ে নতুন নির্দেশনা লাভ করেন, এই এলাকায় তার ডিউটি শেষ হয়ে গেছে এবং তাকে শহরের বাইরে অন্য কোথাও যেতে হবে।
না- মাহদী আল-হাসান বললেন- আমাকে এখানে আরো কদিন কাজ করতে দিন। আমি আশা করি এই পার্বত্য অঞ্চল থেকে কিছু একটা পেয়ে যাবো। দুতিন দিন পর আপনাকে বলতে পারবো অঞ্চলটা নিরাপদ কিনা।
আলী বিন সুফিয়ান মাহদী আল-হাসানের পরামর্শ উপেক্ষা করতে পারেন না। মাহদী সাধারণ কোন গুপ্তচর নন। একটি অঞ্চলের দায়িত্বশীল এবং অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি।
খানিক আলোচনা ও চিন্তা-ভাবনার পর আলী বিন সুফিয়ান মাহদী আল-হাসানকে উক্ত এলাকায় ফিরে যাওয়ার অনুমিত প্রদান করেন। মাহদী আল-হাসান পেতাত্মার মিলন লাভ না করে এলাকা ত্যাগ করতে রাজি নন। এ-ই বোধ হয় প্রথম ঘটনা, যেখানে তিনি ব্যক্তিগত বাসনাকে কর্তব্যের উপর প্রধান্য দিলেন। আলী বিন সুফিয়ান যদি ঘুণাক্ষরে টের পেতেন, মাহদী আল-হাসান অন্য কোনো মতলবে ডিউটি পরিবর্তন করতে নারাজ, তাহলে এক মুহূর্তের জন্যও তাকে এই ডিউটিতে বহাল রাখতেন না। একজন অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিজেকে এমন একটা ঝুঁকির মধ্যে নিক্ষেপ করছেন, যাতে তার জীবন বিপন্ন হওয়ার আশংকা রয়েছে!
মাহদী আল-হাসান হাকীমের নিকট চলে যান। তাকে রাতের ঘটনা শোনান। হাকীম চোখ বন্ধ করে মাথানত করে মনে মনে অস্ফুট স্বরে বিড় বিড় করতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে মাথা তুলে মাহদী আল হাসানের চোখের ভেতর তাকান।
আজ রাত আবার যাও- হাকীম বললেন- পাক জগতের একটি প্রাণী। এই নাপাক দুনিয়ার মানুষের কাছে ঘেঁষতে ভয় পাচ্ছে। তুমি সরলতা প্রদর্শন করবে। হয়তো বা আজো কিছুক্ষণের জন্য দেখা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে। তুমি অধৈর্য হবে না। সে তোমার সাক্ষাতের জন্য অস্থির হয়ে আছে। অবশ্যই মিলিত হবে। এই মিলনে যদি তোমার কোনো উপকার না থাকতো, তাহলে আমি তোমাকে সেখানে পাঠাতাম না। তোমার জীবনেরও কোন আশঙ্কা নেই।
মাহদী আল-হাসান চলে যান। ডিউটির এলাকায় ঘোরাফেরা করেন। সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে পড়েন। অপর প্রান্তে চলে যান। সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে নীচে অবতরণ করেন। মাটিতে এক টুকরা কাপড় পড়ে থাকতে দেখেন। কাপড়টা তুলে নেন। আধা ইঞ্চি চওড়া এবং আধা গজ লম্বা এক খন্ড কাপড়। মাহদী আল-হাসান কাপড়টা নেড়ে চেড়ে দেখতে শুরু করেন। তারপর কাপড়টুকু হাতে করেই পুনরায় সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে পড়ে অপর প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তিনি উপরের দিকে তাকান, যেখানে গত রাতে আগুন দেখেছিলেন। ওদিকটা ঢালু। মাহদী আল-হাসান সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে ঢালু বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করেন। এবার তিনি একটি পুরুষালী কণ্ঠ শুনতে পান- উপরে এসো না। তুমি যার জন্য এসেছে, তার সঙ্গে তোমার রাতে সাক্ষাৎ হবে।
শব্দটি গুঞ্জরিত হয়ে বার বার কানে বাজতে থাকে।
আমাদের জগতে এসে এভাবে খুঁজে ফিরো না। কণ্ঠটা পুনরায় ভেসে আসে।
মাহদী আল-হাসান থেমে যান। তার মনে হচ্ছে, শব্দটা তার চার পার্শ্বে ঘুড়ে ফিরছে। তিনি উপরে উঠলেন। বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকেন। তিনি সতর্ক থাকার চেষ্টা করছেন, যেনো তার দ্বারা এমন কোনো আচরণ না ঘটে, যার ফলে এখানকার কোনো প্রেতাত্মা তার কোনো ক্ষতি করে বসে।
মাহদী আল-হাসান স্থানটা ত্যাগ করে পেছনে ফিরে আসেন। এক স্থানে বসে ভাবতে শুরু করেন, জায়গাটার আসল রহস্য কী? এই ভাবনার মধ্য দিয়ে দিন কেটে যায়। রাতে আবার আসবেন স্থির করে ফিরে যান।
***
সূর্যাস্তের পর। মাহদী আল-হাসান রাখালের বেশ পরিবর্তন করে নতুন বেশ ধারণ করেন। দিনের বেলা ডিউটির সময় তার কাছে লম্বা একটা খঞ্জর থাকে। হাকীম তাকে জোরালোভাবে বলে দিয়েছেন, রাতে প্রেতাত্মার সাক্ষাতে যাওয়ার সময় সঙ্গে খঞ্জর বা অন্য কোন অস্ত্র রাখা যাবে না। গত রাতেও খঞ্জর নেননি। এখন তিনি রওনা হবেন। খঞ্জরটা দেয়ালের সঙ্গে ঝুলছে। মাহদী আল-হাসান খঞ্জরটার প্রতি তাকান এবং কিছুক্ষণ চিন্তা করেন। হাকীমের নির্দেশনা মান্য করলে খঞ্জরটা নেয়া যায় না। কিন্তু মাহদী আল-হাসান ভাবনার জগত থেকে ফিরে এসে সিদ্ধান্ত নেন, যা হয় হবে, আজ খঞ্জর নিয়ে যাবো। তিনি খঞ্জরটা দেয়াল থেকে হাতে তুলে নেন। পোশাকের ভেতর কোমরের সঙ্গে অস্ত্রটা বেঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।
