***
সাক্ষাৎ কবে হবে? মাহদী আল-হাসান জিজ্ঞেস করেন।
আজ রাতেই চলে যাও। হাকীম বললেন।
হাকীম মাহদী আল-হাসানকে আরো একটি তাবিজ দেন এবং বহু জরুরি নির্দেশনা প্রদান করেন। আশঙ্কা সম্পর্কে অবহিত করেন এবং উৎসাহিত করে জোরালো ভাষায় বললেন, ভয় পাবে না। তিনি সাক্ষাতের স্থানে পৌঁছার সময়ও বলে দেন, রাত অন্ধকারে ছেয়ে যাওয়ার খানিক পরে যাবে। মাহদী আল-হাসান বিস্ময়কর ও অভূতপূর্ব এক প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিদায় গ্রহণ করেন এবং নিত্যদিনকার ডিউটিতে চলে যান। দিনটা সেখানে অতিবাহিত করেন এবং সূর্যাস্তের আগে আগে ফিরে যান।
***
রাতের আঁধার নেমে এলে মাহদী আল-হাসান পুনরায় সেখানে চলে যান। এবার ডিউটির জন্য নয়- প্রেতাত্মার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। একাকি এমন ঘোর অন্ধকারে ও সুনসান পরিবেশে তাকে চরম ভীতসন্ত্রস্ত হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু হাকীমের বক্তব্য তাকে সাহস দিয়ে যাচ্ছে। বাহুতে তার দুটি তাবিজ বাধা। নিজের থেকে দুআ-কালামও পাঠ করছেন।
মাহদী আল-হাসান হাকীমের বলা স্থানে গিয়ে পৌঁছেন। পর্বতমালার ভেতরকার একটি জায়গা। গাছপালাগুলো দৈত্যের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। পরিবেশটা এতো নিস্তব্ধ যে, মাহদী আল-হাসান বুকের ধড়ফড়ানিও শুনতে পাচ্ছেন।
মাহদী আল-হাসান দিনে যে ক্রন্দনধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন, এখনো সেই কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। তিনি শব্দের দিকে এগিয়ে যান। কিছুক্ষণ নীরবতা বজায় থাকে। তিনি সামান্য অগ্রসর হয়ে দাঁড়িয়ে যান। এবার ক্রন্দন ধ্বনিটা পেছন দিক থেকে আসছে। তবে দূর থেকে। তিনি মোড় ঘুরিয়ে সেদিকে হাঁটা দেন। স্থানটা সম্পর্কে তিনি অবহিত। তাই অনায়াসে চলতে পারছেন। এই শব্দও থেমে যায়।
মাহদী আল হাসান উচ্চস্বরে বলে ওঠলেন- দেখা দেবে, নাকি এভাবেই ভয় দেখাতে থাকবে।
কিন্তু তিনি নিজের উচ্চারিত শব্দগুলোই স্পষ্ট শুনতে পান। যদি তার জানা না থাকতো, এটা তারই কণ্ঠের প্রতিধ্বনি, তাহলে ভয়ে পালিয়ে আসতেন। পাহাড়গুলো দেয়ালের ন্যায় খাড়া। খাড়া দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে মাহদী আল-হাসানের চীৎকারটা তিন-চারবার প্রতিধ্বনিত হয়ে তার কানে এসে বাজে। তার কটা দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত বাতাসে সাঁতার কাটতে থাকে।
মাহদী আল-হাসানের শব্দের গুঞ্জরণ অন্ধকার পরিবেশে মিলিয়ে গেলে তিনি একটি নারী কণ্ঠ শুনতে পান- আমাকে ভয় করো না। এগিয়ে আসো।
শব্দটা দূর থেকে এসেছে। তিনি শব্দটা কয়েকবার শুনতে পান। পরে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
আবারো আওয়াজ আসে- বিশ্বাসঘাতকতা করো না। আমি দুহাজার বছর যাবত তোমার পথ পানে চেয়ে আছি।
মাহদী আল-হাসান এই আওয়াজও একাধিকবার শুনতে পান। পরক্ষণে মাহদী আল-হাসানের কথা গুঞ্জরিত হয় এবং প্রতিধ্বনিত হয়ে কয়েকবার কানে বাজার পর থেমে যায়।
এভাবে উভয় দিক থেকে শব্দ উঠতে ও গুঞ্জরিত হতে থাকে। প্রেতাত্মার আওয়াজে আবেদন-অনুনয় বিদ্যমান, যার ফলে মাহদী আল-হাসানের ভীতি দূর হয়ে গেছে। তিনি পর্বতমালার একেবারে ভেতরে চলে যান। সম্মুখে আলোর ঝলকানি দেখতে পান, যা কিনা আকাশের বিজলীর ন্যায় চমকে ওঠেই নিভে যায়। এই বিজলীর চমকে তিনি নিজের অবস্থানটা দেখে নেন। এই চমকে তিনি সেই সুড়ঙ্গের মুখটা দেখতে পান, যার মধ্যদিয়ে একবার অপর প্রান্তে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানেই থেমে যান।
কিছুক্ষণ পর আলোটা আবার চমকায় এবং তার মাধ্যমে মাহদী আল হাসান সুড়ঙ্গের মুখে একজন মানুষ দণ্ডায়মান দেখতে পান। আলোটা কোথা থেকে আসছে বুঝা যাচ্ছে না। লোকটা মাহদী আল-হাসান থেকে আনুমানিক পঞ্চাশ কদম দূরে। তিনি গভীর দৃষ্টিতে দেখেন। মুখাবয়বটা অতিশয় রূপসী একটি মেয়ের। শুধু মুখমণ্ডলই দেখা যাচ্ছে। দেহের বাকি অংশ সাদা কাফনে ঢাকা। মাহদী আল-হাসানের গা ছমছম করে ওঠে। তিনি ভয় পেয়ে যান। এবার নারী কণ্ঠ ভেসে আসে- আমাকে ভয় করো না। দুহাজার বছর পর্যন্ত আমি তোমার পথপানে তাকিয়ে আছি।
মাহদী আল-হাসান সম্মুখে এগিয়ে যান। কয়েক পা অগ্রসর হওয়ার পর কাফনের মধ্য থেকে একটি হাত বেরিয়ে তার প্রতি এগিয়ে আসে। হাতের তালুটা এমনভাবে বাড়িয়ে দেয়া হয়, যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে অগ্রসর হয়োনা। মাহদী আল-হাসান সেখানেই দাঁড়িয়ে যান। আলো নিভে যায়। তিনি এই আশায় দাঁড়িয়ে থাকেন, পুনরায় আলো জ্বলে উঠবে এবং তিনি কাফনের মধ্যকার মেয়েটাকে দেখবেন। কিন্তু তিনি আওয়াজ শুনতে পান। তোমাকে আমি কীভাবে বিশ্বাস করি? তুমি চলে যাও। চলে যাও।
আমার উপর আস্থা রাখো- মাহদী আল-হাসান বললেন এবং সম্মুখপানে এগিয়ে গেলেন। তিনি চীৎকার করে বলছেন- আমি তোমারই জন্য এসেছি। তুমি আমার কাছে চলে আসো।
মাহদী আল-হাসান সুড়ঙ্গের মুখে গিয়ে দাঁড়িয়ে যান। সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে আওয়াজ আসে- কাল এসো, আজ চলে যাও। তুমি ধ্বংসশীল জগতের মানুষ। তোমার প্রতিশ্রুতিও ধ্বংসশীল।
মাহদী আল-হাসান সুড়ঙ্গের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন এবং সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে থাকেন। তিনি সুড়ঙ্গের অপর মুখটাও দেখতে পান।
সুড়ঙ্গের ভেতরের তুলনায় বাইরে অন্ধকার কম। তাই সুড়ঙ্গের মুখটা দেখা যাচ্ছে। সুরমা বর্ণের এই আলোতে লম্বা মতো একটি ছায়া দেখা গেলো, যা তৎক্ষণাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়, যা কিনা দেখতে কাফনে পেঁচানো মেয়েটির ন্যায়। মাহদী আল-হাসান সামনের দিকে দৌড় দেন। কিসের সঙ্গে যেনো হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। উঠে আবার দৌড় দেন। সুড়ঙ্গের অপর মুখের কাছে গিয়ে হাঁক দেন। কিন্তু নিজের ধ্বনির প্রতিধ্বনি ব্যতীত আর কোন উত্তর মেলেনি। কান্নার শব্দও শুনতে পেলেন না। তিনি হতাশ মনে ফেরত রওনা হন।
