মাহদী আল-হাসান হৃদয়ে অস্থিরতা ও উত্তেজনা নিয়ে ফিরে যান।
পরদিন মাহদী আল-হাসান আলী বিন সুফিয়ানের পক্ষ থেকে আরো কিছু নির্দেশনা লাভ করেন। তিনি পালিয়ে পালিয়ে হাকীমের নিকট চলে যান। হাকীম যেনো তারই অপেক্ষায় বসে আছেন। মাহদী আল-হাসানকে দেখামাত্র উঠে দাঁড়িয়ে যান এবং তাকে ভেতরে নিয়ে যান।
সে তোমার সঙ্গে একটিবারের জন্য সাক্ষাৎ করতে চায়- হাকীম মাহদী আল-হাসানকে বললেন- সে তোমার সম্মুখে আসবে এবং নিজের আসল আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করবে। হতে পারে, প্রথম দিন সে তোমার সম্মুখে এসেই অদৃশ্য হয়ে যাবে। অন্য জগতের সৃষ্টি বলে হয়তো এ জগতের মানুষের কাছে আসতে ইতস্তত করবে। তা-ই যদি করে, তাহলে পরদিন তোমাকে আবার যেতে হবে।
কোথায়? মাহদী আল-হাসান জিজ্ঞাসা করেন।
সেখানে, যেখানে তুমি প্রত্যহ গিয়ে থাকো- হাকীম বললেন- যেখানে তুমি আমাকে প্রথম দেখেছিলে। সেখানে তুমি রাতে যাবে।
আপনিও কি সঙ্গে থাকবেন? মাহদী আল-হাসান খানিকটা কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন।
না- হাকীম উত্তর দেন- পরজগতে চলে যাওয়া আত্মাকে সে-ই দেখতে পায়, যাকে সে কামনা করে। কোনো পাপিষ্ঠ প্রেতাত্মা যদি কোন মানুষের উপর দৃষ্টিপাত করে, তাহলে তৎক্ষণাৎ সে মারা যায়। এই যে প্রেতাত্মা তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছে, সে কাউকে কষ্ট দেয় না। তার কান্না বুঝতে চেষ্টা করো। সে মজলুম, ভালোবাসার পিয়াসী। আমি রাতে যখন তাকে হাজির করেছি, তখন সে অঝোরে কাঁদছিলো এবং অনুনয় বিনয় করে বলছিলো, ঐ লোকটাকে সামান্য সময়ের জন্য হলেও আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। তারপর আমি আজীবনের জন্য চলে যাবো।
কথাগুলো যদি অন্য কেউ বলতো, তাহলে মাহদী আল-হাসান অতোটা প্রভাবিত হতেন না, যতোটা এখন হয়েছেন। সর্বজনমান্য ও দেশের বিখ্যাত হাকীম সাহেবের বক্তব্য অমূলক হতে পারে না। তাছাড়া তিনি বড় মাপের একজন আলেমও বটে। তার বলার ধরনটাই এমন যে, শ্রোতা হৃদয়ে গেঁথে যায়। তিনি মাহদী আল-হাসানকে নিশ্চয়তা প্রদান করেন, এই প্রেতাত্মার দর্শনে তোমার উপর কোন ভীতির সঞ্চার হবে না এবং তোমার কোন ক্ষতি হবে না। উল্টো তোমার বিরাট উপকার হতে পারে।
তবে সাবধানতা অবলম্বন করাও আবশ্যক- হাকীম বললেন- এই প্রেতাত্মা কিংবা তার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হওয়ার ব্যাপারে কাউকে কিছু বলবে না। এই ভেদ যদি ফাঁস করে দাও, তাহলে তোমার ক্ষতির আশঙ্কা আছে। তুমি এই দুনিয়ার মানুষকে ধোঁকা দিতে পারো। কিন্তু অদৃশ্য জগতে চলে যাওয়া আত্মার ভেদ ফাঁস করে দিলে আমি বলতে পারবো না তোমার শরীরের কোন দুইটি অঙ্গ চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাবে- দুপা শুকিয়ে যাবে, না দুই বাহু, নাকি চোখ দুটো দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলবে। তোমাকে আমি আরো একটি গোপন কথা বলবো, যাতে তুমি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারো। দেশের সেনাবাহিনীর দুজন ঊর্ধ্বতন কমান্ডার রাতে মারা গেছে। কেউ জানে না, তারা কীভাবে মারা গেছে। দুতিনটি প্রেতাত্মা আমাকে বলেছে, তাদেরকে প্রেতাত্মারা মেরে ফেলেছে। তারা হত্যাকারী প্রেতাত্মাদের গোমর ফাঁস করে দিয়েছে।
তা তারা কমান্ডারদের কীভাবে খুন করলো? মাহদী আল-হাসান জিজ্ঞাসা করেন। মাহদী আল-হাসান রাখালের বেশ ধারণ করে আছেন বটে, কিন্তু মূলত তিনি গুপ্তচর। তিনি কমান্ডারদ্বয়ের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন করতে চাচ্ছেন। তিনি হাকীমের নিকট বিস্তারিত জানতে চান।
এই রহস্য কাউকে বলা যাবে না- হাকীম বললেন- যতোটুকু অনুমতি ছিলো বলেছি। তুমি একেবারে চুপ থাকবে। যা যা বলছি স্মরণ রেখো। ভেবো না, কোনো স্বার্থ ছাড়া তোমার প্রতি আমার এই হৃদ্যতা কেনো। আমি এই আত্মা ও প্রেতাত্মাদের কামনার কাছে দায়বদ্ধ। আমি যদি তাদেরকে নারাজ করি, তাহলে আমার সব বিদ্যা বেকার হয়ে যাবে এবং প্রেতাত্মারা আমারও সেই দশা ঘটাবে, যেমনটি তাদের শত্রুদের ঘটিয়ে থাকে। এই যে আত্মা তোমাকে দেখে কাঁদে, সে আমাকে বলেছে, সামান্য সময়ের জন্য হলেও যেন আমি তার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ করিয়ে দিই। এখন তার বাসনা পূর্ণ করা আমার কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আচ্ছা, আমি যদি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ না করি, তাহলে কী হবে? মাহদী আল-হাসান জিজ্ঞেস করেন।
তাহলে সে প্রেতাত্মার রূপ ধারণ করে তোমার আত্মার উপর নিজের ছায়া ফেলবে- হাকীম জবাব দেন- তুমি আমাকে যে সমস্যার কথা, বলেছিলে, সেটি কোন শারীরিক সমস্যা ছিলো না। এটি তোমার আত্মিক ব্যাধি। তবে তা এখনো তোমার উপর পূর্ণ ক্রিয়া করেনি। তুমি একজন ভালো মানুষ। তোমার নেকী তোমার কাজে এসেছে। সমস্যার কথা ব্যক্ত করে তুমি ভালোই করেছে। মহান আল্লাহ যাকে দয়া করেন, তার জন্য কোন মানুষকে তিনি ওসিলা বানিয়ে দেন। এটা আল্লাহর লীলা যে, তুমি আমাকে এখানে দেখেছে এবং আমাদের সাক্ষাৎ ঘটেছে। আল্লাহর এই দয়াকে ভয় করো না। তুমি যদি ঐ প্রেতাত্মাটার সঙ্গে মিলিত হওয়ার কামনা করো, তাহলে সে এ জগতে তোমার অনেক উপকার করবে। তোমার একটি উপকার এই হতে পারে যে, সে অতিশয় সুন্দরী নারীর রূপে গোশত-চামড়ার জীবন্ত মানুষ হয়ে যখন খুশি তোমার সঙ্গে মিলিত হবে। তুমি তাকে স্ত্রী বানিয়ে ঘরে রাখতে পারবে। আর যদি সে তোমার প্রতি অতিশয় স্নেহশীল হয়ে যায়, তাহলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সে তোমাকে কোনো না কোনো ফেরাউনের গোপন ধনভাণ্ডারের সন্ধান বলে দেবে এর এমন উপায় সৃষ্টি করে দেবে যে, তুমি সেই ধনভাণ্ডার বের করে এই প্রেতাত্মাকে সঙ্গে করে মিসর থেকে দূরে কোথাও চলে যাবে এবং কোনো একটি ভূখরে রাজা হয়ে যাবে।
