মাহদী আল-হাসান ডিউটিতে চলে যান। যাওয়ার পথে হাকীমের সঙ্গে দেখা করে যান। সেই রাখালের বেশ, রাখালের পোশাক। হাকীমকে বললেন, এই সাত সকালে আপনাকে জানাতে এসেছি, আজ রাত আমার গভীর ঘুম হয়েছে এবং ঔষধ খাওয়ার পর থেকে আমার মনটা এতো উফুল্ল ও তরতাজা যে, পূর্বে কখনো এমনটা হয়নি।
যদি বিকাল পর্যন্ত এই অবস্থা বজায় থাকে, তাহলে তোমার অন্য কোন সমস্যা নেই- হাকীম বললেন- সন্ধ্যায় আবার আসবে।
মাহদী আল-হাসান ওঠে ডিউটিতে চলে যান।
মাহদী আল-হাসান এই সবুজ-শ্যামল এলাকায় বহুদিন যাবৎ যাওয়া আসা করছেন এবং গোটা দিন অবস্থান করছেন। বহুবার রাতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু এবার হাকীমের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তার জায়গাটার নামে ভয় অনুভূত হতে শুরু করেছে। হাকীম তাকে বলেছিলেন, প্রেতাত্মা তার কোন ক্ষতি করবে না। কারণ, প্রেমের টানে সে তার আত্মার কাছে আসা-যাওয়া করছে। তবু অদেখা রহস্যময় সৃষ্টির প্রতি ভীতি সহজাত। মাহদী আল-হাসানের মনে হতে লাগলো, প্রেতাত্মারা তার চার পার্শ্বে চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছে। মাহদী আল-হাসান সাহসী সুপুরুষ। তিনি মন থেকে ভয় দূর করে ফেলার চেষ্টা শুরু করেন এবং হাকীম তাকে যে প্রেতাত্মার উল্লেখ করেছিলেন, তাকে কল্পনায় স্থান দিতে শুরু করেন। এই কল্পনায় তিনি শান্তি লাভ করেন এবং এদিক-ওদিক ঘুরতে শুরু করেন।
হঠাৎ মাহদী আল-হাসান অনুভব করেন, তার মনের প্রফুল্লতা ও আনন্দ নির্জীব হয়ে যাচ্ছে এবং মনটা ভীতিতে ছেয়ে যাচ্ছে। তিনি নিজেকে সামলে নেয়ার বহু চেষ্টা করেন। কিন্তু ভয় বাড়তেই থাকে এবং হাকীমকে যে সমস্যার কথা বলেছিলেন, তা আগের তুলনায় বেড়ে গেছে। তিনি তাৎক্ষণাৎ হাকীমের কাছে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডিউটি ত্যাগ করে যাওয়া সম্ভব নয়।
মাহদী আল-হাসান সহ্য করতে থাকেন। বহু সময় পর তার মনের ভয় দূর হতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে গতকাল ওষুধ সেবনের আগে যে অবস্থা ছিলো, সেই অবস্থায় ফিরে আসেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করে, এটা প্রেতাত্মার আছর।
দিন কেটে গেছে। মাহদী আল-হাসান উট ও ভেড়া-বকরীগুলোকে জড়ো করে সেই স্থানে নিয়ে যান, যেখানে প্রতিদিন নিয়ে রাখেন। তারপর উটের পিঠে সওয়ার হয়ে শহরে হাকীমের নিকট চলে যান। হাকীমকে নিজের মনের এই পরিবর্তনের কথা জানান। হাকীম প্রেতাত্মার সন্দেহের কথা ব্যক্ত করেন। কিন্তু আরো একদিন ওষুধ সেবন করে দেখার পরামর্শ দিয়ে গতকালের ওষুধটাই আরেক ডোজ দিয়ে বিদায় করে দেন। মাহদী আল-হাসান রাতে শোয়ার আগে ওষুধটা সেবন করেন। গত রাতের ন্যায় আজও তার গভীর ঘুম হয় এবং সকালে ঝরঝরা শরীর-মন নিয়ে জাগ্রত হন। নিত্যদিনের ন্যায় তিনি আলী বিন সুফিয়ানের নিকট গমন করেন এবং সেখান থেকে ডিউটিতে চলে যান।
মাহদী আল-হাসানের শরীরটা এখন ভালো। মন-মানসিকতায় প্রেতাত্মার কল্পনা প্রবল। কিন্তু আধা দিবস অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রফুল্লতা হ্রাস পেতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে তা নিঃশেষ হয়ে যায় এবং তদস্থলে ভীতি ও নির্জীবতা এসে ভর করে। তিনি ভাবনার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন এবং পায়চারি করতে শুরু করেন। কিন্তু পরে আবার ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যেতে থাকে। তার কানে এমন শব্দ ভেসে আসে, যেনো দূরে কোথাও এক নারী কাঁদছে। কান্নার শব্দ প্রথমে উঁচু হয়ে পরে আবার ক্ষীণ হতে হতে স্তিমিত হয়ে যায়।
মাহদী আল-হাসান যেখানে ছিলেন, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকেন। তিনি ভাবেন, এটা কোনো এক প্রেতাত্মার কান্না হবে। হতে পারে এটা সেই প্রেতাত্মা, যার কথা হাকীম বলেছিলেন। তিনি ভয় পেয়ে যান। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। প্রেতাত্মার সঙ্গে কথা বলবেন বলে মনস্থ করেন। কিন্তু হাকীম তো বলেননি, প্রেতাত্মার সঙ্গে কথা বলা উচিত কি উচিত নয়। তিনি যদি অন্য কোথাও কোন নারীর কান্নার শব্দ শুনতেন, তাহলে পরিস্থিতি যেমনই হোক তার সাহায্যে ছুটে যেতেন। কিন্তু এখানে তো জীবন্ত কোন নারীর অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। এটা যে ফেরাউনী আমলের প্রেতাত্মার ক্রন্দন!
সন্ধ্যায় মাহদী আল-হাসান আগের দিনের ন্যায় হাকীমের নিকট চলে যান এবং তাকে অবস্থা জানান। নারী কণ্ঠের ক্রন্দন শোনার ঘটনাও অবহিত করেন। হাকীম কিছুক্ষণের জন্য গভীর চিন্তায় হারিয়ে যান। পরে মাথা তুলে বললেন- আমার সন্দেহ দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হয়ে গেছে। এটা প্রেতাত্মা। তবে তুমি ভয় পেয়ো না। আমি এখনই তোমাকে একটা তাবিজ দেবো। তারপর প্রেতাত্মাকে জিজ্ঞেস করবো, সে কী চায়? তারপর যা করার করবো। তবে তোমাকে ভয় পাওয়া চলবে না। এই প্রেতাত্মাটা তোমাকে ভালোবাসে। তাই সে তোমার কোনো ক্ষতি করবে না। তুমি ওখানে যেতে থাকো। তবে তার থেকে পালাবার চেষ্টা করলে সে তোমার ক্ষতি করবে।
হাকীম মাহদী আল-হাসানকে একটি তাবিজ দেন। তিনি তাবিজটি বাহুতে বেঁধে নেন।
অবশিষ্ট কাজ রাতে করবো- হাকীম বললেন- কাল সকালে আমার কাছে চলে আসবে। তখন আমি তোমাকে প্রেতাত্মা সম্পর্কে ধারণা দেবো। তুমি যে কান্নার আওয়াজ শুনেছো, তা সেই প্রেতাত্মারই কান্না। এই প্রেতাত্মাটা শয়তান নয়। তারপরও আমি চেষ্টা করবো, তোমাকে তার থেকে রক্ষা করা যায় কিনা।
