মানুষের একটি দুর্বলতা হলো, অনেক সময় মানুষ রোগাক্রান্ত না হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে রোগী মনে করে। সব মানুষই দীর্ঘ আয়ু, সুস্বাস্থ্য এবং শারীরিক শক্তির প্রত্যাশা রাখে। কোনো মানুষই নিজেকে শক্তিহীন ভাবতে চায় না। মাহদী আল-হাসানও তেমনি একজন মানুষ। শরীরে হয়তো সাধারণ কোন সমস্যা ছিলো, যা থাকে সব মানুষেরই। এতো বড় একজন হাকীমের সঙ্গে দেখা। সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।
মাহদী আল-হাসান রোগের কথা হাকীমকে জানান। হাকীম তার শিরায় হাত রাখেন। তারপর নিরিক্ষার সাথে চোখ দুটো দেখেন। এমনভাবে তাকান, যেনো তার চোখে বিস্ময়কর কিছু দেখেছেন। তারপর লোকটার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখেন। হাকীমের চেহারায় বিস্ময়ের লক্ষণ।
তুমি কি আমার দাওয়াখানায় আসতে পারো?- হাকীম জিজ্ঞাসা করেন- শহরে আসো।
আমি নিতান্ত গরীর মানুষ- মাহদী আল-হাসান বললেন- আপনাকে পয়সা দেবো কোত্থেকে?
তুমি এখনই আমার সঙ্গে চলো- হাকীম বললেন- আমার উট ওদিকে চরে বেড়াচ্ছে। তোমারও উট আছে। আমাকে তোমার পয়সা দিতে হবে না। ধনীদের নিকট থেকে অনেক টাকা নিয়ে থাকি। গরীবের চিকিংসা বিনা মূল্যে করি। তোমার রোগ এখনো সাধারণ। কিন্তু বেড়ে যেতে পারে। আমার অন্য একটি সন্দেহও হচ্ছে।
মাহদী আল-হাসান এখন ডিউটিতে আছেন। বৃদ্ধের কাছে আসা এবং তার সঙ্গে কথা বলাও তার কর্তব্যেরই অংশ। সাধারণ একটা রোগের চিকিৎসার জন্য তিনি ডিউটি ত্যাগ করতে পারেন না। তিনি হাকীমকে বললেন- আমি সন্ধ্যায় আপনার দাওয়াখানায় আসবো। হাকীম মাহদী আল-হাসানকে নিজের দাওয়াখানার ঠিকানা বলে দেন। মাহদী আল হাসান পূর্ব থেকেই দাওয়াখানাটা চেনেন। তবু না জানার ভানই দেখান।
***
সন্ধ্যার পর মাহদী আল-হাসান এই বেশেই হাকীমের দাওয়াখানায় চলে যান। উটটা সঙ্গে রাখেন, যাতে হাকীম চিনতে পারেন। হাকীমের প্রতি তার কোন সংশয় নেই। হাকীমরা গাছ-গাছড়া, লতা-পাতা তালাশ করে ফেরেন তা তার জানা আছে। সেই সুবাধে এই হাকীমেরও উক্ত পার্বত্য এলাকায় যাওয়া বিচিত্র নয়। তাছাড়া বাস্তবিকই তার বিশ্বাস জন্মে গেছে, তার এই সাধারণ রোগটা এক সময় গুরুতর কোন ব্যাধিতে পরিণত হতে পারে। হাকীম তাকে আবারো দেখলেন এবং খুব ভালো করে দেখলেন এবং বললেন- আমি তোমাকে ঔষধ দিচ্ছি। যদি এতে ভালো না হও, তাহলে অন্য ব্যবস্থা আছে। তোমার ব্যাপারে আমার অন্য একটি সন্দেহ আছে।
মাহদী আল-হাসান জিজ্ঞাসা করেন- কী সন্দেহ?
কামনা করি, আমার সন্দেহ সঠিক না হোক- হাকীম বললেন- তুমি সুদর্শন যুবক। পাহাড়-উপত্যকায় ঘুরে বেড়াও। যেখানে আমার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ হয়েছিলো, জায়গাটা ভালো নয়। ওখানে প্রেতাত্মারা বসবাস করে। তাদের কতিপয় ফেরাউনী আমলের রূপসী মেয়েদের প্রেতাত্মা। ফেরাউনরা তাদেরকে জোরপূর্বক নিজেদের কাছে রেখেছিলো এবং ভোগ-বিলাসিতার উপকরণ বানিয়েছিলো। পরে তাদের স্থলে অন্য মেয়েদের পেয়ে তাদেরকে মেরে ফেলেছিলো। আত্মা বৃদ্ধ হয় না- সব সময় যুবকই থাকে। তাদেরই আত্মারা এই সবুজ ভূ-খণ্ডে ঘুরে বেড়ায়। আমার সন্দেহটা হচ্ছে, তোমার আকার-গঠন ফেরাউনদের আমলের এক যুবকের সঙ্গে মিল খায়, যাকে সে কালের এক সুন্দরী যুবতী ভালোবাসতো, কামনা করতো। কিন্তু মেয়েটি কোন এক ফেরাউনের হাতে পড়ে যায়। তুমি ওখানে যাওয়া-আসা করছো। ঐ মেয়েটির প্রেত্মাত্মা তোমাকে দেখে ফেলেছে। সে তোমাকে কামনা করছে।
ও আমার কোন ক্ষতি করবে না তো?- মাহদী আল-হাসান হাকীমের বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে খানিকটা ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন- প্রেতাত্মাদের বন্ধুত্ব তো ভালো হয় না। তা আপনি কি আমাকে সেই প্রেতাত্মা থেকে বাঁচাতে পারেন?
আমার সন্দেহ ভুলও হতে পারে- হাকীম বললেন- আগে ঔষধ দেবো। তাতে সুস্থ্য না হলে তার সঙ্গে তোমার সাক্ষাৎ করিয়ে দিবো। প্রেতাত্মা থেকে মুক্তি লাভের এ-ও একটা পন্থা। তখন আর সে তোমার কোন ক্ষতি করবে না।
মাহদী আল-হাসান যোগ্য ও বিচক্ষণ গুপ্তচর বটে; কিন্তু আলেম নন। সাধারণ মানুষের ন্যায় তারও ভূত-প্রেতে বিশ্বাস আছে। এ জাতীয় শোনা ঘটনাবলীতে তার বিশ্বাস আছে। হাকীমের এক একটি শব্দ তার মনের মাঝে গেঁথে গেছে। প্রেতাত্মার ভয় তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
মাহদী আল-হাসান হাকীমের নিকট গুপ্তচরবৃত্তির জন্য নয়। চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। হাকীম তাকে সান্ত্বনা প্রদান করেন, যেনো তিনি চিন্তা না করেন। কিন্তু চিন্তা তাকে পেয়ে বসেছে। হাকীম তাকে এক ডোজ ঔষধ দিয়ে বলে দেন, এই ঔষধটুকু রাতে শোয়ার আগে খাবে।
মাহদী আল-হাসান ঔষধ সেবন করে শুয়ে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে তার ঘুম এসে যায়। তিনি গভীর নিদ্রায় তলিয়ে যান। এর আগে কখনো এতো তাড়াতাড়ি তার ঘুম আসেনি। সকালে চোখ খোলার পর অনুভব করেন, মনটা তার অস্বাভাবিক উৎফুল্ল। সর্বপ্রথম আলী বিন সুফিয়ানের নিকট যান। কিন্তু হাকীমের ঘটনা কিছুই বললেন না। এটা বলার মতো কোন বিষয় নয়। কেননা, হাকীম সন্দেহভাজন কেউ নন। তিনি কায়রোর বিখ্যাত ও বড় হাকীম। ফৌজ ও প্রশাসনের বড় বড় অফিসাররাও তার থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। তিনি তাবীজ-কবজও দিয়ে থাকেন এবং জিন-ভূত তাড়ান। আলী বিন সুফিয়ান মাহদী আল-হাসানকে বললেন, আপনি সেখানে যান। কোন সন্দেহভাজন মানুষ অবশ্যই পেয়ে যাবেন। আলী মূলত নাশকতাকারীদের আস্তানা খুঁজে ফিরছেন।
