এরা মিসরের সেইসব গুপ্তচর, যারা খৃস্টান গুপ্তপরদের পাকড়াও করার যোগ্যতা রাখতো। কিন্তু এখন তারা নিজেরাই ধরা কিংবা মারা পড়ছে। আশংকার ব্যাপার হলো, যদি তারা ধরাই পড়ে থাকে, তাহলে খৃস্টানরা তাদেরকে ফেদায়ীদের হাতে তুলে দিয়ে তাদেরকে মিসরেরই সরকার ও সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। তার চেয়েও বড় শংকা হলো, দুশমনের গোয়েন্দারা কায়রোর গোয়েন্দাদেরকে চিনে ফেলেছে। গুপ্তচরবৃত্তির এই যুদ্ধে দুশমন জয়লাভ করছে। আলী বিন সুফিয়ান এখন উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। তাদের একজন হলেন মাহদী আল-হাসান, যিনি ফিলিস্তীন ও ত্রিপোলীতে গুপ্তচরবৃত্তি করে এসেছেন। ইনি দুর্দান্ত সাহসী ও বিচক্ষণ গোয়েন্দা। উপকূলীয় এই পাহাড়ি এলাকাটার দেখা-শোনার দায়িত্ব তারই উপর ন্যস্ত করেন আলী বিন সুফিয়ান।
এলাকাটার ভেতরে একটি মাত্র পথ আছে। পেছনে নদী। অন্য তিনদিকে পাহাড় আর টিলা। অভ্যন্তরটা সবুজ গাছপালায় পরিপূর্ণ। কোথাও কোথাও পানির ঝিলও আছে।
রিপোর্ট আছে, পাহাড়ের ভেতরে সন্দেহভাজন কিছু মানুষ যাওয়া-আসা করছে। কেউ ফেরাউনদের কোনো ভবন বা তার ধ্বংসাবশেষ দেখেনি। কিন্তু মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস, ভেতরে কোথাও না কোথাও এমন কিছু অবশ্যই আছে। ফেরাউনরা এখানে কিছু না কিছু অবশ্যই নির্মাণ করে থাকবে, যা আজো বর্তমান আছে। মোটকথা, এলাকাটা সন্ত্রাসী আস্তানার জন্য একটি উপযুক্ত স্থান বটে।
মাহদী আল-হাসান এক-দুটি উট আর কয়েকটি ভেড়া-বকরী নিয়ে মরু যাযাবর কিংবা রাখালের বেশে সেখানে যাওয়া-আসা করতেন। পশুগুলো এদিক-ওদিক চরে বেড়াতে আর তিনি ঘোরাফেরা করতেন। তিনি কিছুদূর পর্যন্ত ভেতরকার এলাকা দেখেছেন। সে পর্যন্ত তিনি কিছুই দেখতে পাননি। অনেকখানি ভেতরে একটি পর্বত এমন আছে, যার পাদদেশে বিশ-পঁচিশ ফুট উপরে একটি কুদরতি সুড়ঙ্গ পথের মুখ আছে। মাহদী আল-হাসান এই সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। সুড়ঙ্গটি এতো উঁচু ও প্রশস্ত যে, তার মধ্য দিয়ে উট চলাচল করতে পারে। সুড়ঙ্গটি সোজা পাহাড়ের দিকে চলে গেছে। মাহদী আল-হাসান সুড়ঙ্গটির অপর প্রান্ত পর্যন্ত গিয়েছিলেন। সেখানে সংকীর্ণমত একটি উপত্যকা, যেখানে কোনো আস্তানা তৈরি হতে পারে না। সুড়ঙ্গটি অনেক লম্বা। ভেতরে ডানে-বাঁয়ে দেয়ালের গায়ে গুহার মতো তৈরি হয়ে আছে। এমন বড় বড় পাথরও আছে, যেগুলোর আড়ালে মানুষ দিব্যি লুকাতে পারে।
মিসরী গোয়েন্দা মাহদী আল-হাসান, আলী বিন সুফিয়ানকে রিপোর্ট করেছেন, আমি যতোদূর পর্যন্ত গিয়েছি, কোনো সন্দেহজনক স্থান চোখে পড়েনি এবং যতোবার গিয়েছি, একজন মানুষও ভেতরে যেতে কিংবা ভেতর থেকে বের হতে দেখিনি। আলী বিন সুফিয়ান তাকে বলে দেন, যেন তিনি সারাদিন সেখানে অতিবাহিত করেন এবং বেশি ভেতরে না যান। কারণ, তাতে ক্ষতির আশঙ্কা বিদ্যমান। আলী বিন সুফিয়ান তাকে এও বলে দেন, মাঝে-মধ্যে উটে সওয়ার হয়ে রাতেও চলে যাবেন। যদি কোনো মানুষের মুখোমুখি হয়ে পড়েন, তাহেল বলবেন, আমি কায়রো যাচ্ছি। নিজেকে কৃষাণ বলে দাবি করবেন।
আলী বিন সুফিয়ানের নির্দেশনা মোতাবেক মাহদী আল-হাসান রাতেও সেখানে গিয়েছেন। এক রাতে তিনি কারো পলায়নপর পায়ের শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। কোনো বন্য পশুও হতে পারে কিংবা মানুষও হতে পারে। মাহদী আল-হাসান আর সম্মুখে অগ্রসর হননি। কিছু সময় সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে আসেন।
পরদিন সূর্যোদয়ের আগেই মাহদী আল-হাসান দু-তিনটি উট ও গোটা কতক ভেড়া-বকরী নিয়ে সেখানে চলে যান। পশুগুলোকে উন্মুক্ত ছেড়ে দিয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করতে থাকেন। জায়গাটা সবুজ-শ্যামল। ঝোঁপড়, ঘাস ও বন্য ফল-বীচি সবই আছে। খানিক সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পর তার একজন মানুষ চোখে পড়ে। লোকটি এক স্থানে মাথানত করে বসে আছে। পরনে মূল্যবান চোগা। মুখে লম্বা দাড়ি। মাথায় দামি পাগড়ি। মাহদী আল-হাসান ধীরে ধীরে লোকটির দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেন। কারো আগমন আঁচ করে লোকটি মাথা তুলে তাকায়। বেশ-ভুষা ও চলন-বলনে মাহদী আল-হাসান একজন অশিক্ষিত গেঁয়ো লোক। তিনি ধীর পায়ে লোকটির নিকটে গিয়ে দাঁড়ান।
লোকটির হাতে একটি থলে। থলেটি কাঁচা সবুজ পাতায় ভর্তি। অপর হাতে একটি গাছের তাজা ডাল।
কী তালাশ করছেন চাচা?- মাহদী আল-হাসান বোকার মতো হেসে গেঁয়ো মানুষের ঢংয়ে জিজ্ঞাসা করেন, কিছু হারিয়েছেন কি? বলুন, আমিও তালাশ করি।
আমি হাকীম- লোকটি বললো- গাছ-গাছড়া, লতা-পাতা, গোটা দানা এসব খুঁজে ফিরছি। এসব ঔষধ তৈরিতে লাগে।
চেহারা দেখে মাহদী আল-হাসান লোকটাকে চিনে ফেলেন। কায়রোর বিখ্যাত হাকীম। তিনি সঠিক উত্তরই দিয়েছেন যে, লতা-পাতা তালাশ করছেন। এসব দিয়েই হাকীমরা ঔষধ বানায়।
তা তুমি এখানে কী করছো?- হাকীম জিজ্ঞাসা করেন- থাকো কোথায়?
ঐতো সামান্য দূরে- মাহদী আল-হাসান জবাব দেন- পরিবারের সঙ্গে থাকি। এখানে পশু চরাতে এসেছি।
দানাগুলো দিয়ে কী রোগের ঔষধ বানাবেন? মাহদী আল-হাসান জিজ্ঞাসা করেন।
কোন কোন রোগ এমন হয়ে থাকে যে, রোগী নিজেও জানেনা, তার কী হয়েছে।
ইনি দেশের বিখ্যাত হাকীম। দূর-দূরান্ত থেকে রোগী আসে তার কাছে। এখানে তার দেখা পাওয়া মাহদী আল-হাসানের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়।
