কায়রো! আপনি কায়রো যেতে চাচ্ছেন?
হ্যাঁ, আমি কায়রো-ই যেতে চাচ্ছি। অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই বালুকাময় মরু প্রান্তরে ভবঘুরের ন্যায় আর কতকাল ঘুরে বেড়াবোর যাবো কোথায়? চলো, ঘোড়ায় যিন বাধো। এক একটি মেয়েকে এক একটি ঘোড়ায় বসিয়ে বেঁধে নিয়ে চলো।
***
মরুভূমিতে ঘোড়া চলবার সময় তেমন শব্দ হয় না। উট চলে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে। চোখে না দেখলে মরুভূমিতে উটের আগমন টের পাওয়া যায় না। বালিয়ান যখন মুবীর সঙ্গে কথা বলছিলো, তখন একটি উট ছোট্ট একটি বালির ঢিবির আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের গতিবিধি অবলোকন করছিলো। কিন্তু তা টের-ই পাইনি বালিয়ান। লোকটি খৃষ্টান কমাণ্ডো দলের একজন সদস্য। দলের কমাণ্ডার অত্যন্ত বিচক্ষণ লোক। বালিয়ানের তাঁবুর প্রায় আধা মাইল দূরে ছাউনি ফেলেছে সে। শিকার যে এতো কাছে, মাত্র আধা মাইল দূরে, তা বুঝতেই পারেনি কমাণ্ডার। বুদ্ধি করে সে আশপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য তিন কমাণ্ডোকে দায়িত্ব দেয়, উটে চড়ে তারা আশপাশে ঘুরে-ফিরে দেখে আসবে এবং আশঙ্কার কিছু চোখে পড়লে কমাণ্ডারকে অবহিত করবে। উট ছিলো এ। কাজের উপযুক্ত বাহন।
তিন আরোহী চলে যায় তিন দিকে। এখানকার সমগ্র এলাকাটিই এমন যে, গোটা এলাকা যে কোন কাফেলার অবস্থানের জন্য বেশ উপযোগী। তাই এখানে এসে-ই কমাণ্ডার ভাবলো, অন্য কোন কাফেলা এখানে ছাউনি ফেলে থাকতে পারে।
এক স্থানে আলোর মত কিছু একটা চোখে পড়ে এক আরোহীর। সেদিকে এগিয়ে চলে সে। বস্তুটি একটি মশাল; জ্বলছে বালিয়ানের অস্থায়ী তাঁবুতে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে একটি টিলার পিছনে দাঁড়িয়ে যায়। টিলাটি উচ্চতায় এতটুকু যে, উটের উপর বসে টিলার উপর দিয়ে সম্মুখে দেখা সম্ভব।
ক্ষীণ আলোতে কয়েকটি মেয়ে চোখে পড়ে তার। সংখ্যায় ছয়জন। কয়েকজন পুরুষের সঙ্গে বসে গল্প করছে তারা। তাদের থেকে খানিক দূরে বসে আছে আরো এক জোড়া নারী-পুরুষ। কথা বলছে তারাও। একপাশে বাঁধা আছে কয়েকটি ঘোড়া।
খৃষ্টান আরোহী উটের মোড় ঘুরিয়ে দেয় পিছন দিকে। ধীর-সন্তর্পণে চলে কিছু পথ। তারপর এগিয়ে চলে দ্রুত। আধা মাইল পথ উটের জন্য কিছুই নয়। অল্পক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যায় ছাউনিতে, কমাণ্ডারের কাছে। সুসংবাদ জানায়, শিকার আমাদের হাতের মুঠোয়। সময় নষ্ট না করে অপারেশনের প্রস্তুতি নেয় কমাণ্ডার। ঘোড়র পায়ের আওয়াজে শিকার সতর্ক হয়ে যেতে পারে এ আশঙ্কায় পায়ে হেঁটেই রওনা হয় তারা।
খৃষ্টান কমান্ডো দলটি যখন বালিয়ানের তাঁবুর নিকটে পৌঁছে, ততক্ষণে বালিয়ান নির্দেশ জারি করে ফেলেছে, এক একটি মেয়েকে এক একটি ঘোড়ায় বেঁধে ফেলো। বন্ধুরা বিস্মিত অভিভূতের ন্যায় তাকিয়ে আছে বালিয়ানের প্রতি। তাদের ধারণা, নোকটার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। নইলে হঠাৎ করে এমন খাপছাড়া কথা বলবে কেন! এ নিয়ে তার সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেয় বন্ধুরা। অনেক সময় নষ্ট হওয়ার পর বালিয়ান তাদের বুঝাতে সক্ষম হয়, সে যা বলছে, হুঁশ-জ্ঞান ঠিক রেখে বুঝে-শুনেই বলছে এবং এ পরিস্থিতিতে কায়রো ফিরে গিয়ে আত্মসমর্পণ করাই কল্যাণকর।
পান্ডুর মুখে অপলক নেত্রে ফ্যাল ফ্যাল করে বালিয়ানের প্রতি তাকিয়ে আছে মেয়েগুলো। ঘোড়ায় যিন কষে বালিয়ানের সঙ্গীরা। ধরে ধরে মেয়েগুলোকে ঘোড়ার পিঠে বাঁধবে বলে–ঠিক এমন সময়ে তাদের উপর নেমে আসে অভাবিত এক মহাবিপদ। চারদিক ঘিরে ফেলে আক্রমণ করে বসে খৃষ্টান কমান্ডোরা। বালিয়ান বারবার চীৎকার করে উচ্চ কণ্ঠে বলছে–আমরা অস্ত্র ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা কায়রো রওনা হচ্ছি। আক্রমণ থামাও, আমাদের কথা শোন।
আক্রমণকারীদেরকে বালিয়ান সুলতান আইউবীর বাহিনী মনে করেছিলো। কিন্তু তার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তাই কোন ফল হলো না বালিয়ানের ঘোষণায়। একটি খঞ্জর এসে ঠিক হৃদপিণ্ডে বিদ্ধ হয়ে স্তব্ধ করে দেয় তাকে। এ আকস্মিক আক্রমণের মোকাবেলা করতে পারলো না বালিয়ানের বন্ধুরা। নিজেদের সামলে নেয়ার আগেই শেষ হয়ে যায় একে একে সকলে।
খৃষ্টান কমাণ্ডোদের অভিযান সফল। যাদের জন্য সমুদ্রের ওপার থেকে এসে তাদের এ ঝুঁকিপূর্ণ আক্রমণ, তারা এখন মুক্ত। বিলম্ব না করে তারা নিজেদের ছাউনিতে নিয়ে যায় মেয়েগুলোকে।
কমাণ্ডারকে চিনে ফেলে মেয়েরা। সেও তাদের-ই বিভাগের একজন গুপ্তচর। সেখানেই রাত যাপনের সিদ্ধান্ত নেয় তারা। পাহারার জন্য দাঁড়িয়ে যায় দুজন সান্ত্রী। তারা ছাউনির চার পাশে টহল দিচ্ছে।
সুলতান আইউবীর প্রেরিত বাহিনীটি এখনো এ স্থান থেকে বেশ দূরে, বালিয়ান কয়েদী মেয়েদেরকে যেখান থেকে মুক্ত করেছিলো সেখানে। অকুস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়া রক্ষী তাদের রাহ্বর। যেখানে তাদের উপর আক্রমণ হয়েছিলো, বাহিনীটিকে সে আগে সেখানে নিয়ে যায়। তারা একটি মশাল জ্বালিয়ে জায়গাটা দেখছে। রবিন ও তার সঙ্গীদের লাশগুলো পড়ে আছে বিক্ষিপ্তভাবে। লাশগুলো এখন আর অক্ষত নেই। শৃগাল-শকুনেরা ছিঁড়ে-ফেড়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে দেহগুলো। তখনো কাড়াকাড়ি চলছিলো লাশগুলো নিয়ে। মানুষ দেখে এইমাত্র কেটে পড়েছে হিংস্র পশুগুলো।
রক্ষী যেখান থেকে ঘোড়া নিয়ে পলায়ন করেছিলো, সে কমাণ্ডারকে সেখানে নিয়ে যায়। মশালের আলোতে মাটি পর্যবেক্ষণ করেন কমাণ্ডার। ঘোড়ার পায়ের চিহ্ন পাওয়া গেলো। রবিন তার দলবল নিয়ে কোনদিকে গেলো, তাও অনুমান করা গেলো। কিন্তু রাতের বেলা সে পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলা তো সম্ভব নয়, কালক্ষেপণ করাও যাচ্ছে না। তবু তারা রাতটা সেখানেই অবস্থান করলো।
