***
মিসরে নাশকতামূলক তৎপরতা বেড়ে গেছে। সেনাবাহিনীর নায়েব সালার অপেক্ষা এক স্তুর নিচু পদমর্যাদার এক কমান্ডারকে নগরীর বাইরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তিনি সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু রাতে আর ঘরে ফেরেননি। সকালে তার লাশ পাওয়া গেলো। তার শরীরে কোন জখম ছিলো না, কোন আঘাতও ছিলো না। তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে নিহতের পায়ের ছাপ ছাড়া অন্য আরো দুটি ছাপ দেখতে পান। চাল-চলনে এই কমান্ডার সকলের প্রশংসনীয় ছিলেন। তার গতিবিধি ভুল কিংবা সন্দেহভাজন লোকদের ন্যায় ছিলো না। তার একজনই স্ত্রী ছিলো, যে তার ব্যাপারে পূর্ণ আশ্বস্ত ছিলো। তার এই মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনের অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোন কুই বের করা সম্ভব হয়নি।
তিন-চারদিন পর একই পদমর্যাদার অপর এক সেনা কমান্ডারকে ঠিক একইভাবে ভোরে নিজ কক্ষে মৃত পাওয়া যায়। তিনি সেনা ব্যারাকের একটি কক্ষে থাকতেন। পুরোপুরি ভালো মানুষ ছিলেন। তার বন্ধু মহলে তারই ইউনিটের কিছু লোক ছিলো। তাদের কারো সঙ্গেই তার কোন দ্বন্ধ বিবাদ ছিলো না। হত্যাকাণ্ডের বাহ্যিক কোনো কারণ ছিলো না। ঘটনাটাকে হত্যাকান্ডও বলা যায় না। শরীরে জখম কিংবা আঘাতের সামান্যতম চিহ্নও নেই।
সরকারী ডাক্তার লাশটা দেখেছেন। লাশের ঠোঁটের এক কোণে একটুখানি লালা ছিলো। ডাক্তার লালাটুকু একটি বাটিতে করে নিয়ে এক টুকরা গোশতের সঙ্গে মিশিয়ে একটি কুকুরকে খেতে দেন। তারপর কুকুরটাকে নিজের ঘরে নিয়ে বেঁধে রাখেন এবং পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। কিন্তু কুকুর অস্বাভাবিক কোনো আচরণ করলো না। ডাক্তার সারা রাত জেগে কুকুরটার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। মধ্য রাতের পর কুকুরটা রশির সীমানা পর্যন্ত চারদিক আরামের সাথে পায়চারি করতে শুরু করে। অনেকক্ষণ পায়চারি করার পর হঠাৎ দাঁড়িয়ে যায় এবং লুটিয়ে পড়ে যায়। ডাক্তার এগিয়ে গিয়ে দেখলেন, কুকুরটা মরে গেছে। ডাক্তার রিপোর্ট করেন, কমান্ডার দুজনকে এমন বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে, যাতে কোন তিক্ততা থাকে না। যা খেলে মানুষ অতিশয় আরামের সঙ্গে মারা যায়।
গোয়েন্দারা উভয় কমান্ডার সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান চালায়। জানার চেষ্টা করা হয়, জীবনের শেষ দিনটিতে তারা কার কার সঙ্গে মিলিত হয়েছেন, কোথায় কোথায় গেছেন এবং কার সঙ্গে আহার করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোন তথ্যই পাওয়া গেলো না। বিবাহিত কমান্ডারের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। কিন্তু তাকেও সন্দেহের চোখে দেখার কোনো কারণ ছিলো না। উভয় কমান্ডারই পাকা মুসলমান ছিলেন। সুলতান আইউবী স্বয়ং এক যুদ্ধে তাদের কমান্ড ও বীরত্বের প্রশংসা করেছিলেন। তারা ছিলেন সীমান্ত বাহিনীর কমান্ডার। কয়েকজন সুদানীকে তারা সীমান্তের ওপার থেকে গ্রেফতারও করেছিলেন। সুদানীরা তাদেরকে মোটা অংকের ঘুষের অফার দিয়েছিলো। কিন্তু তারা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাদের নায়েব সালারের পদে উন্নীত হওয়ার কথা ছিলো।
আলী বিন সুফিয়ান সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন, হত্যাকান্ডের ঘটনা দুটি খৃষ্টান নাশকতাকারীদের কাজ এবং ঘাতকরা ফেদায়ী চক্রের সদস্য। তিনি বললেন, দুশমন এখন আমাদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যার ধারা শুরু করে দিয়েছে। সকল কমান্ডার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হলো, যেনো তারা অপরিচিত কিংবা সন্দেহভাজন কারো হাত থেকে কিছু না খায় এবং কেউ অযাচিতভাবে বন্ধুত্ব গড়তে শুরু করলে বা কিছু খাওয়াবার চেষ্টা করলে তাকে ধরিয়ে দেয়।
মিসরের গোয়েন্দা বিভাগ ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় কমান্ডারের হত্যাকান্ডের সাতদিন পর একরাতে হঠাৎ সেনা ছাউনিতে আগুন ধরে যায়। হাজার হাজার তাঁবু এক স্থানে স্তূপ করে রাখা ছিলো। প্রহরাও ছিলো। কিন্তু তারপরও অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে যায়। এটিও নাশকতামূলক কাজ। সেখানে আকস্মিকভাবে আগুন ধরে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা ছিলো না। এই এলাকায় আগুন জ্বালানো নিষিদ্ধ ছিলো এবং এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে পালিত হতো।
এসব ঘটনা ছাড়াও আরো রহস্যময় বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছিলো। সীমান্ত বাহিনীগুলোকে অধিকতর সতর্ক করে দেয়া হয়। সুদানের দিকে সীমান্তের ভেতরে গোপনে লোকজনের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিলো। তাদের বেশ কজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।
আলী বিন সুফিয়ান তার ইন্টেলিজেন্সকে আরো বেশি ছড়িয়ে দেন এবং পূর্বাপেক্ষা অধিক সতর্ক করে দেন।
***
কায়রো থেকে সামান্য দূরে নীল নদের তীরে একটি পাহাড়ি এলাকা। এই অঞ্চলেরই কোন এক স্থানে ফেরাউনী আমলের একটি প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ পড়ে আছে। ইতিপূর্বে একাধিক ঘটনায় খৃস্টান ও সুদানী সন্ত্রাসীরা এই পতিত প্রাসাদগুলোকে তাদের গোপন আস্তানারূপে ব্যবহার করেছিলো। মিসরে এরূপ পরিত্যক্ত পুরনো জীর্ণ প্রাসাদের সংখ্যা অনেক। পাহাড়ি এলাকাটাকে নজরে রাখার জন্য আলী বিন সুফিয়ান তাঁর গোয়েন্দাদেরকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করে নিয়োজিত করেছিলেন। এখানকার খৃস্টান সন্ত্রাসীরা দু-তিন মাসে আলী বিন সুফিয়ানের ছয়-সাতজন দক্ষ গোয়েন্দাকে বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় গুম করে ফেলেছে।
