ইসলামের পতন- ফিলিপ অগাস্টাস বললেন- আমি শতবার বলেছি, আমাদেরকে ইসলামের পতন ঘটাতে হবে। এটি এমন একটি ধর্ম, যে মানুষের আত্মাকে কজা করে নেয়। কেউ ইসলামকে নিজের আদর্শ হিসেবে বরণ করে নিলে পৃথিবীর কোনো শক্তি তাকে পরাজিত করতে পারে না। সালাহুদ্দীন আইউবীর চার পার্শ্বে মুসলমানদের যে বেষ্টনীটা আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, ধর্ম-কর্মে তারা এতোই পরিপক্ক যে, সোনা-দানা, হীরা জহুরত ও রূপসী নারী দ্বারা আপনারা এই বেষ্টনী ভেদ করতে পারবেন না। আপনারা যাদের ক্রয় করেছেন, তারা কাঁচা ঈমানের মুসলমান। দেখেছেন, তো, সালাহুদ্দীন আইউবীর কেমন ছোট ছোট বাহিনী আমাদের বিশাল বিশাল শক্তিশালী বাহিনীকে কিরূপ ক্ষতিসাধন করেছে! যেখানে আমাদের ঘোড়া ক্লান্তি ও পিপাসায় নির্জীব হয়ে পড়ে, সেখানে আইউবীর সৈন্যরা বীর বিক্রমে লড়াই চালিয়ে যায়। যেনো তাদের কোন ক্লান্তি নেই, ক্ষুধা তৃষ্ণা নেই। এই শক্তিকেই মুসলমানরা ঈমান বলে থাকে। আমাদেরকে তাদের ঈমানটা দুর্বল করতে হবে। তাদের এক দুজন আমীর কিংবা উধ্বর্তন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে হাতে আনা নিঃসন্দেহে একটা সাফল্য হারমান! এ থেকে আপনি অনেক স্বার্থ উদ্ধার করেছেন। কিন্তু এমন একটা পন্থা আবিষ্কার করা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে এই জাতিটার অন্তরে আপন ধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে যাবে। প্রবীণ লোকদের চিন্তাধারা পরিবর্তন করা সহজ হয় না। তাদের বংশধরকে শৈশব এবং কৈশোরেই টার্গেট করে নাও. কাঁচা মস্তিষ্ককে তুমি নিজের ছাঁচে ঢেলে নিজের মতো করে গড়ে নিতে পারো। তাদের পশুবৃত্তিটাকে উত্তেজিত করে ভোলো।
ইহুদীরা এই কাজটা করে যাচ্ছে- হারমান বললেন- আমি এই ময়দানে যা কিছু করছি, তার ফলাফল ধীরে ধীরে সামনে আসছে! আপনি এক-দুদিনে কারো বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারবেন না। এ কাজে সময়ের প্রয়োজন। একটি যুগ চলে যায়।
এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকা উচিত- ফিলিপ অগাস্টাস বললেন- আমি এই কামনা করবো না যে, ফলাফল আমাদের জীবদ্দশাতেই ফলতে হবে। আমি পূর্ণ আশাবাদি, আমরা যদি চরিত্র ধ্বংসের এই কর্মসূচি অব্যাহত রাখি, তাহলে এমন একটি সময় আসবে, যখন মুসলমান শুধুই নামের থাকবে। তাদের ধর্ম-কর্ম শুধুই একটি রেওয়াজে পরিণত হবে। চিন্তা চেতনায় তারা হবে আমাদেরই লোক। আমাদের কাজ তারাই আঞ্জাম দেবে। তাদের চিন্তা-চেতনার উপর ক্রুশ জয়লাভ করবে।
শেখ সান্নান!- রেমন্ড বললেন- আপনি যদি আসিয়াত দুর্গের পরিবর্তে আমাদের কাছে আরেকটি দুর্গ প্রার্থনা করেন, তাহলে এই মুহূর্তে আমরা তা দিতে পারবো না। আপনার সঙ্গে আমাদের চুক্তি অটুট থাকবে। দুর্গ ছাড়া অন্য সকল সুযোগ-সুবিধা আপনি পেতে থাকবেন। আপনি যদি এসব সুযোগ-সুবিধা বহাল রাখতে চান, তাহলে সমগ্র মিসরে বিশেষত কায়রোতে সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজ ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা অব্যাহত রাখুন এবং সালাহুদ্দীন আইউবীরও হত্যাচেষ্টা চালু রাখুন।
সালাহুদ্দীন আইউবীর হত্যা সম্পর্কে আমি আপনাকে স্পষ্ট বলে দিতে চাই, এ কাজে আমি আর একটি লোকও নষ্ট করবো না- শেখ সান্নান বললেন- আইউবীকে হত্যা করা সম্ভব হবে না। আমি আমার বহু মূল্যবান ফেদায়ীদের বিনষ্ট করেছি। আপনারা আমাকে বলার অনুমতি দিন যে, সুলতান আইউবী আমাকে নতুন জীবন দান করেছেন। আমি যখন তার হাতে অস্ত্র সমর্পণ করি, তখন আমার আশঙ্কা ছিলো, আমি তার উপর একাধিকবার যে সংহারী আক্রমণ করিয়েছি, তার প্রতিশোধে তিনি আমাকে এবং আমার গুরুত্বপূর্ণ ফেদায়ীদের খুন করে ফেলবেন। কিন্তু তিনি আমাকে ও আমার লোকদেরকে জীবন ভিক্ষা দিয়েছেন। তারপরও আমার ধারণা ছিলো, তিনি আমাকে ধোঁকা দিচ্ছেন- যেইমাত্র আমরা পিঠ ফেরাব, অমনি আমাদের উপর তীর বৃষ্টি চালাবেন কিংবা আমাদের উপর দিয়ে ঘোড়া দাবড়াবেন। এখন আপনারা আমাকে জীবিত দেখতে পাচ্ছেন। আমি আমার সকল কর্মী ও সমগ্র বাহিনীসহ আপনাদের সম্মুখে জীবিত উপস্থিত আছি। আপনারা আমার সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দিন। আমি আইউবীর হত্যা থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছি। তবে কায়রোতে আমাদের লোকদের কর্মতৎপরতা আপনাদের হতাশ করবে না।
কায়রোতে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে, যা সালাহুদ্দীন আইউবীকে মিসর ফিরে যেতে বাধ্য করবে- হারমান বললেন- আমি অতি তাড়াতাড়ি সুদানীয় মিসরের সীমান্ত চৌকিগুলোর উপর আক্রমণের ধারা শুরু করে দেবো। মিসরের উপর বড় কোনো আক্রমণ করা যাবে না। তবে আক্রমণের ধোকা দিতে হবে, যেনো সালাহুদ্দীন আইউবী সিরিয়া ত্যাগ করে মিসর ফিরে যেতে বাধ্য হন।
হারমান গুপ্তচরবৃত্তিতে অভিজ্ঞ। কিন্তু তার জানা নেই, আজকের এই সভায় যে কর্মচারিরা মদ ও খাদ্যদ্রব্য আনা-নেয়া-পরিবেশন করছে, তাদের মধ্যে একজন সুলতান আইউবীর গুপ্তচর। ফরাসী বংশোদ্ভুত লোকটির নাম ভিক্টর। তাছাড়া তাদের মধ্যে রাশেদ চেঙ্গিস নামক একজন তুর্কী মুসলমানও আছে, যে নিজেকে গ্রীক খৃস্টান দাবি করে এই চাকরিতে নিয়োগ লাভ করেছিলো। এই লোকটিও সুলতান আইউবীর গোয়েন্দা। খৃস্টানদের অতিশয় বিচক্ষণ গোয়েন্দা প্রধান হারমান এই যেসব বিশেষ কর্মচারি, সভা-সমাবেশ ও ভোজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে মদ-খাবার পরিবেশন করছে গভীর যাচাই-বাচাই করে তাদেরকে নিয়োেগ দান করেছিলেন। আগেই বলা হয়েছে, সুলতান আইউবী সর্বত্র গোয়েন্দা জাল বিছিয়ে রেখেছিলেন। খৃস্টানদের অনেক ভেতরকার গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো তথ্য সময়ের আগেই তিনি পেয়ে যেতেন। এবার শেখ সান্নানের এই কনফারেন্সের সব কথোপকথন তাঁর দুজন গুপ্তচর শুনে ফেলেছে। এখন দিন কয়েকের মধ্যেই এসব তথ্য নিয়ে তাদেরকে সুলতান আইউবীর নিকট পৌঁছে যেতে হবে।
