দুদিন পর রেমন্ড সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রস্তুত করার জন্য এদিক-ওদিক থেকে অন্যান্য খৃস্টান সম্রাটদের তলব করেন। তারা যথাসময়ে যথাস্থানে এসে উপস্থিত হয়। খৃস্টান গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হারমানও এসে হাজির হন। সভা শুরু হয়ে যায়।
আপনারা আমাকে এই সূত্রে তিরষ্কার করতে পারেন না, আমি সালাহুদ্দীন আইউবীর কাছে পরাজিত হয়ে এসেছি- শেখ সান্নান বললেন আপনারা জানেন, আমরা নিয়মতান্ত্রিক বাহিনীর ন্যায় লড়াই করতে জানি না। সুলতান আইউবীর মোকাবেলা তো আপনাদের বাহিনীও করতে পারবে না। সেখানে আমার ফেদায়ীরা কীভাবে পারবে? এখন প্রয়োজন হচ্ছে, আপনারা আইউবীর দুশমন মুসলমান আমীরদেরকে সৈন্য দিন। কিন্তু তারা সকলে মিলেও তার সামনে দাঁড়াতে পারবে না।
শেখ সান্নান!- রেমন্ড বললেন- আইউবীর বিরুদ্ধে আমরা কী করবো, সে সিদ্ধান্ত আমাদেরকে নিতে দিন। আপনার এ ব্যাপারে নাক গলানোর প্রয়োজন নেই। আপনি সর্বশেষ যে চারজন লোক প্রেরণ করেছিলেন, তারাও ব্যর্থ হয়েছে। তারা ধরা পড়েছে এবং মারা গেছে। সালাহুদ্দীন আইউবীর উপর একটি সংহারী আক্রমণও সফল হয়নি। তাতে প্রমাণিত হয়েছে, আপনি শুধু অকেজো-অকর্মণ্য লোকদেরই প্রেরণ করেছেন, যাদের মারা যাওয়া কিংবা ধরা পড়ায় আপনার কিছুই সমস্যা হতো না। আমরা আপনাকে যেসব সুবিধাদি প্রদান করেছি, সব বিফলে গেছে।
কেবল একজন সালাহুদ্দীন আইউবীর খুন না হওয়ায় আপনাদের অর্থ বিনষ্ট হয়নি- শেখ সান্নান বললেন- আমি মিসরে সালাহুদ্দীন আইউবীর যে দুজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে হত্যা করিয়েছি, তাদেরকেও এই অর্থের বিনিয়োগের হিসাবে রাখুন। সুদানে আপনাদের তিনজন শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ছিলো, আমি তাদেরকেও কবরে পাঠিয়ে আপনাদের পথ পরিষ্কার করেছি। হালবে আল-মালিকুস সালিহের দুই সহযোগি সালাহুদ্দীন আইউবীর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলো। আপনাদের ইঙ্গিতে আমি তাদেরকেও খুন করিয়েছি। সর্বোপরি বর্তমানে মিসরে গোপন হত্যাকাণ্ডের যে ধারা চলছে, সেটি কে চালু করেছিলো? আপনারা একেও কি ব্যর্থতা বলবেন?
আইউবী কবে খুন হবে?- ফরাসী ক্রুসেডার গাই অফ লুজিনান টেবিলে চাপড় মেরে বললেন- সালাহুদ্দীন আইউবীর হত্যার আলোচনা করুন। আপনি নুরুদ্দীন জঙ্গীকে যে বিষ প্রয়োগ করেছিলেন, সেই বিষ আইউবীকে কবে গেলাবেন।
সেই দিন, যেদিন সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যেমনটি হয়েছিলো নুরুদ্দীন জঙ্গীর সময়- শেখ সান্নান বললেন- জঙ্গী ভূমিকম্প কবলিত লোকদের সাহায্যের জন্য একাকি ছুটে চলছিলেন। না তার নিজের কোন চৈতন্য ছিলো, না তার কোন আমলার। তার জন্য খাবার কে রান্না করছিলো, সেই খবর তাদের কারো ছিলো না। এই সুযোগে আমি আপনার কথামত যাদেরকে তাকে হত্যার করার লক্ষে প্রেরণ করে রেখেছিলাম, তারা তার খাদ্যে এ বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। সেই বিষের ক্রিয়ায় জঙ্গীর গলায় রোগ জন্ম নেয়। তিন-চারদিন পর তিনি মারা যান। জঙ্গীর ডাক্তার আজো বলছে, নুরুদ্দীন জঙ্গী গলার ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু সালাহুদ্দীন আইউবীর খাবার পর্যন্ত পৌঁছা তো সম্ভব নয়।
যে পাঁচক আইউবীর জন্য খাবার রান্না করে, আপনি কি তাকে ক্রয় করতে পারেন না?- এক উর্দ্ধতন কমান্ডার জিজ্ঞাসা করে।
এর উত্তর আমার বন্ধু হারমান ভালো দিতে পারবেন। শেখ সান্নান বললেন এবং হারমানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।
বিগত কাহিনীতে বহুবার হারমানের উল্লেখ এসেছে। লোকটা জার্মানীর বাসিন্দা। আলী বিন সুফিয়ানের ন্যায় একজন চৌকস গোয়েন্দা। নাশকতা ও চরিত্র বিধ্বংসের ওস্তাদ। মিসরে সুলতান আইউবীর বিরুদ্ধে যেসব ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছিলো, সেসব এই হারমানেরই অপকর্ম। এই হারমানই চক্রান্তের মাধ্যমে সুলতান আইউবীর কয়েকজন ঊর্ধ্বতন আস্থাভাজন কর্মকর্তাতে তার প্রতিপক্ষ বানিয়েছিলেন। লোকটি মুসলিম শাসক জনগণের মনস্তত্ত্ব ও দুর্বলতাগুলো বেশ ভালো করে বুঝতেন এবং তাদেরকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার কৌশল জানতেন। এক খৃস্টান সম্রাট ফিলিপ অগাস্টাস তাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি সুদান, মিসর ও আরবের যে কোন অঞ্চলের ভাষা হুবহু আঞ্চলিক ভঙ্গিতে বলতে পারতেন।
শেখ সান্নান সঠিক বলছেন- হারমান বললেন- সালাহুদ্দীন আইউবীর বাবুর্চিকে কেননা ক্রয় করা যাবে না, সে প্রশ্নের জবাব আমাকেই দিতে হবে। আইউবী মৃত্যুকে পরোয়া করেন না। অন্যথায় এতোদিনে বিষ প্রয়োগ করে তাকে হত্যা করা ব্যাপার ছিলো না। তিনি বিশ্বাসের জোরে বেঁচে আছেন। তাঁর খাদ্য-খাবারের কেউ তত্ত্বাবধান করলো কিনা, তিনি তার কোনই তোয়াক্কা করেন না। নিজের জীবনটাকে তিনি আল্লাহর উপর সোপার্দ করে রেখেছেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস হচ্ছে, তার মৃত্যু যে দিনটিতে হবে বলে স্থির হয়ে আছে, ঠিক সেদিনই হবে এবং সেদিন কেউ তাকে ধরে রাখতে পারবে না। তার রক্ষী ইউনিটের কমান্ডার, গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা এবং একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি রীতিমত তার খাবার খেয়ে পরীক্ষা করে দেখে। মাঝে-মধ্যে ডাক্তারও এসে খাদ্য পরীক্ষা করে। এতোসব কঠোর তত্ত্বাবধানের পরও আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, আইউবীর বাবুর্চিসহ সকল কর্মচারি তার শিষ্য। তাদের অন্তরে রয়েছে তার অন্ধ ভক্তি ও অপার শ্রদ্ধা। আইউবী তাদেরকে নিজের চাকর মনে করেন না। তাদের সঙ্গে তিনি বন্ধু ও ভাইয়ের ন্যায় আচরণ করেন। আমি পুরোপুরি একটা পরিসংখ্যান নিয়ে রেখেছি। আইউবীর ব্যক্তিগত পরিমন্ডলের কাউকে ক্রয় করা কিংবা সেই পরিমন্ডলে কাউকে ঢুকানো সম্ভব নয়। তার লোকেরা সর্বক্ষণ তার চার পার্শ্বে মানব প্রাচীর দাঁড় করিয়ে রাখে। এরা হলো আলী বিন সুফিয়ান, গিয়াস বিলবীস, হাসান ইব্ন আব্দুল্লাহ ও যাহেদান। এরা এতোই সুদক্ষ গোয়েন্দা যে, এদের চোখ মানুষের কলিজা পর্যন্ত দেখে ফেলে।
