১১৭৬ সালের জুন মাসের সেই দিনটিতে সুলতান আইউবী যখন এজাজ দুর্গের সন্নিকটস্থ বিশাল কবরস্তানে ইমামের সঙ্গে দন্ডায়মান ছিলেন, তখন তার চেহারাটা ছিলো বিমর্ষ। তিনি ইমামকে বললেন- প্রতি ওয়াক্ত নামাযের পর দুআ করবেন, যেনো আল্লাহ সেই লোকগুলোকে ক্ষমা করে দেন, যাদের চোখে পট্টি বেঁধে তাদের ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করানো হয়েছিলো।
সুলতান ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হন এবং বিস্তৃত কবরস্তানটার প্রতি। তাকিয়ে বললেন- আল্লাহকে এতো রক্তের হিসাব কে দেবে? এই পাপ আমার আমলনামায় লেখা না হয় যেনো।
সুলতান আইউবী তাঁর সালারদের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন- আমাদের জাতি আত্মহত্যার পথ অবলম্বন করেছে। কাফেররা রাসূলের উম্মতের শক্তি ও চেতনায় এতো বেশি ভীত যে, এই শক্তিটাকে নানা চিত্তাকর্ষক অস্ত্রের মাধ্যমে দুর্বল করে তুলতে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। এই একটি ছাড়া তাদের আর কোন উপায় নেই। তাদের নিজস্ব কোন শক্তি নেই। মুসলমানদের দুর্বলতাই তাদের শক্তি। আমাদের কোন কোন ভাই তাদের এই মাধ্যমটাকে বরণ করে নিয়েছে এবং গৃহযুদ্ধের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
আমরা যদি সেই পথ এখনই এবং এখানেই রুদ্ধ না করো দেই, তাহলে আমি ভবিষ্যৎকে যতদূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি, আমি উম্মতে রাসূলকে গৃহযুদ্ধ দ্বারা আত্মহত্যা করতে দেখতে পাচ্ছি। কাফেররা এখনকার ন্যায় অর্থ ও সামরিক সাহায্য দিয়ে দিয়ে উম্মতকে আপসে লড়াতে থাকবে। গুটিকতক মানুষের উপর যখন উন্মত্ততা সওয়ার হয়, তখন তারা জাতিকে ক্রীড়নকে পরিণত করে তাদেরসহ ডুবে মরে। ক্ষমতা ও রাজত্বের মোহে মাতাল এই মানুষগুলো জাতির রক্ত এভাবেই ঝরাতে থাকবে। এই বিস্তৃত কবরস্তানটা দেখো। কবরগুলো গণনা করো। গুণে শেষ করতে পারবে না। আমরা পেছনে যেসব লাশ দাফন করে এসেছি, তাদেরও কোন সংখ্যা নেই। এতে রক্তের হিসাব আমি কার থেকে নেবো? আল্লাহকে আমি কী জবাব দেবো?
গৃহযুদ্ধের ধারা বন্ধ হয়ে গেছে মাননীয় সুলতান!- এক সালার বললেন- এখন সামনের চিন্তা করুন। বাইতুল মুকাদ্দাস আমাদের ডাকছে। প্রথম কেবলা আমাদের পথপানে তাকিয়ে আছে।
কিন্তু আমাকে ডাকছে মিসর- সুলতান আইউবী ঘোড়া হাঁকাতে হাঁকাতে বললেন- ওদিক থেকে বড় উদ্বেগজনক খবরাখবর আসছে। ওখানে আমার স্থলাভিষিক্ত আমার ভাই। আমাকে অস্থিরতা থেকে রক্ষা করার জন্য সে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আমার থেকে গোপন রাখছে। আলী বিন সুফিয়ান এবং নগর প্রধান গিয়াস বিলবীসও আমাকে বিস্তারিত কিছু জানাচ্ছে না। শুধু এতটুকু সংবাদ প্রেরণ করছে যে, দুশমনের গোপন নাশকতামূলক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে, আমরা যা প্রতিহত করার চেষ্টা করছি। পরশু দিনের দূত আমাকে জানিয়েছে, কায়রোতে নাশকতা দিন দিন জোরদার হচ্ছে। মনে হচ্ছে, যে শেখ সান্নানকে আসিয়াত দুর্গ থেকে উৎখাত করেছি, তার কোন ঘাতক চক্র কায়রোতে নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে। দুজন কমান্ডার এমনভাবে খুন হয়েছে যে, তাদের শরীরে জখম বা আঘাতের কোন চিহ্ন ছিলো না। মৃত্যুর পর লাশের সুরতহাল থেকে এ প্রমাণও পাওয়া যায়নি যে, তাদের বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। এটা হাশিশিদের খুনের একটা বিশেষ পদ্ধতি।
তা আপনি বাহিনীকে কি এখানেই রেখে যাবেন নাকি সঙ্গে নিয়ে যাবেন? এক সালার জিজ্ঞাসা করেন।
এ বিষয়ে আমি এখনো কোন সিদ্ধান্ত নেইনি- সুলতান আইউবী বললেন- কিছু সৈন্য নিয়ে যেতে পারি। ফৌজের প্রয়োজন এখানে বেশি। খৃস্টানরা মিসরে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড-তৎপরতা এই জন্য জোরদার করেছে, যেনো আমি ফিলিস্তীন অভিমুখে অগ্রযাত্রা করার পরিবর্তে মিসর চলে যাই। তাদের এই আকাঙখা আমি পূর্ণ হতে দেবো না। তবে আমার মিসর যাওয়া জরুরি।
***
সুলতান আইউবীর আশঙ্কা অমূলক ছিলো না। ক্রুসেডারদের চিন্তাধারা ও প্রত্যয়-পরিকল্পনা তার চেয়ে বেশি আর কেউ বোঝে না। যে সময়ে তিনি ফাতিহা পাঠ করে কবরস্তান ত্যাগ করে নিজের সামরিক হেডকোয়ার্টারের দিকে যাচ্ছিলেন, ততোক্ষণে শেখ সান্নান ত্রিপোলি পৌঁছে গেছেন। আপনারা পড়ে এসেছেন, হাসান ইবনে সাব্বাহর পর এই চক্রটির যে গুরু সবচে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তিনি হলেন শেখ সান্নান। লোকটি ফেদায়ীদের প্রধান নেতা ছিলেন। সুলতান আইউবী বনাম খৃস্টানদের বিগ্রহগুলোর সময় ফেদায়ীদের খুনী চক্রটি এই শেখ সান্নানেরই নেতৃত্বে অতিমাত্রায় তৎপর হয়ে ওঠেছিলো। তার ঘাতকরা একাধিকবার সুলতান আইউবীর উপর সংহারী আক্রমণ চালিয়েছিলো এবং প্রতিটি আক্রমণেরই পরিণতিতে ঘাতকরাই মারা পড়েছে। যারা প্রাণে রক্ষা পেয়েছে, তারা ধরা পড়েছে। খৃস্টানরা শেখ সান্নানকে আসিয়াত নামক একটি দুর্গ দিয়ে রেখেছিলো, যেটি ১১৭৬ সালের মে মাসে সুলতান আইউবী অবরোধ করে দখল করে নেন। শেখ সান্নান অস্ত্রত্যাগ করে দুর্গ খালি করে দিলে সুলতান তাকে ক্ষমা করে দেন।
শেখ সান্নান ১১৭৬ সালের জুন মাসের একদিন ত্রিশোলী (লেবানন) গিয়ে পৌঁছেন। সঙ্গে তার ফেদায়ী চক্র ও সেনাবাহিনী। কারো সঙ্গে কোন অস্ত্র ছিলো না। সুলতান আইউবী তাদেরকে নিরস্ত্র করে বিদায় করে দিয়েছিলেন। ত্রিপোলী ও তার আশপাশের বিস্তৃত অঞ্চলটি এক খৃস্টান সম্রাট রেমন্ডের দখলে ছিলো। শেখ সান্নান তার নিকট গিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করেন।
