বিশাল বিস্তৃত এক কবরস্তান। সবগুলো কবর এখনো তরতাজা। মাটির স্তূপগুলো অগোছালো-বিক্ষিপ্ত। কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। কোন কোন কবর একটি অপরটির সঙ্গে লাগোয়া। যুদ্ধক্ষেত্রের কবর এরূপই হয়ে থাকে। হামাত থেকে হাল্ব পর্যন্ত এরূপ তিনটি কবরস্তান গড়ে ওঠেছে। এই সেদিনের সবুজ-শ্যামল অঞ্চলটা এখন নির্জন-নিস্তব্ধ। এখানকার বাতাসে এখন শুধুই রক্তের গন্ধ। পাখিরা কিচির মিচির করছে, শুকুনরা উড়ছে।
এমনি একটি কবরস্তান হাব শহরতলীর এজাজ দুর্গের সন্নিকটে অবস্থিত। কবরগুলোর মাটি এখনো আর্দ্র। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর ফৌজের শ্রদ্ধেয় ইমাম জনাকয়েক সৈন্যসহ সেখানে দাঁড়িয়ে ফাতিহা পাঠ করছেন। দুআ শেষে যখন তিনি মুখমন্ডলে হাত বুলাতে গেলেন, ততোক্ষণে তাঁর দাড়ি অশ্রুতে ভিজে গেছে।
এই ভূখন্ডটি এখন বন্ধ্যা হয়ে যাবে। এখন আর এখানে সবুজ পাতা গজাবে না- ইমাম বললেন- এখানে এক কুরআনের অনুসারীগণ একে অপরের ঘাতক হয়ে গিয়েছিলো। যে মাটিতে ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের রক্ত ঝরে, সে মাটি শুকিয়ে যায়। এখানে আল্লাহু আকবার ধ্বনি আল্লাহু আকবর ধ্বনির মোকাবেলা করেছে। তারা সবাই মুসলমান ছিলো। তারা একজন অপরজনের হাতে নিহত হয়েছে। হাশরের দিন তারা প্রত্যেকে একত্রিত উত্থিত হবে। মহান আল্লাহ তাদেরকে বলবেন, তোমরা এক ভাই অপর ভাইয়ের যে পরিমাণ রক্ত ঝরিয়েছে, সেই পরিমাণ রক্ত যদি তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামের শত্রুদের ঝরাতে, তাহলে শুধু ফিলিস্তীন নয় স্পেনও পুনরায় তোমাদের হাতে চলে আসতো।
ইতিমধ্যে কতগুলো ঘোড়ার পদশব্দ কানে আসতে শুরু করেছে। ইমামের সঙ্গে দন্ডায়মান এক সেনা বললো- সুলতান আসছেন। ইমাম মোড় ঘুরিয়ে তাকান। সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবী আসছেন। তার সঙ্গে সালার ও রক্ষী বাহিনীর ছয়জন আরোহী। কবরস্তানের নিকটে এসে সুলতান আইউবী ঘোড়া থামান। তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ইমামের কাছে এসে ফাতিহা পাঠ করে ইমামের সঙ্গে মুসাফাহা করেন।
মহামান্য সুলতান!- ইমাম সুলতান আইউবীকে বললেন- এটা তো ঠিক যে, যারা আমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তারাও মুসলমান ছিলো। কিন্তু তাদের কবরে ফাতিহা পাঠ করা হবে, আমি তাদেরকে এর যোগ্য মনে করি না। তাদেরকে শহীদদের সঙ্গে দাফন না করা উচিত ছিলো। আমাদের মুজাহিদগণ সত্যের পক্ষে লড়াই করেছে। কিন্তু আপনি তাদেরকে দুশমনের নিহতদের সঙ্গে দাফন করিয়েছেন।
যারা মিথ্যার পক্ষে লড়াই করেছে, আমি তাদেরকেও শহীদ মনে করি সুলতান আইউবী বললেন- তারা তাদের শাসকদের প্রতারণার শহীদ। আমরা আমাদের সৈন্যদেরকে আল্লাহর বাণী শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছি। আর যারা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলো, তাদের রাজাগণ আবেগময় স্লোগান ও মিথ্যা বার্তা শুনিয়ে তাদের অন্তরে মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। তাদের ইমামগণ পুরস্কার-উপঢৌকন নিয়ে সৈন্যদেরকে বিভ্রান্ত করেছে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করিয়েছে। আমাদের মুসলমান শত্রুদের যারা পরে বুঝতে পেরেছিলো, তাদেরকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে, এখন তারা আমাদের সঙ্গে আছে। আর এই যারা মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের পর্যন্ত আলো পৌঁছেনি। রাজত্বের নেশায় বুদহওয়া শাসকগণ তাদের চোখের উপর পট্টি বেঁধে দিয়েছিলো।
মুসলমান আমীরগণ সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর দুশমন হয়ে গিয়েছিলেন। তারা খেলাফত থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন শাসক হতে চেয়েছিলেন। তাদের একজন হলেন নুরুদ্দীন জঙ্গীর বালক পুত্র আল মালিকুস সালিহ। দ্বিতীয়জন মসুলের আমীর সাইফুদ্দীন গাজী। তৃতীয়জন হাররান দুর্গের কেল্লাদার গোমস্তগীন। শেষোক্তজনতো স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই ফেলেছিলেন। এই তিন নেতা প্রত্যেকের সৈন্যদের দ্বারা একটি বাহিনী গঠন করে নিয়েছিলেন এবং সুলতান সালাহুদ্দীন আইউবীর বিরুদ্ধে ময়দানে নেমে এসেছিলেন। খৃস্টানরা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলো। তাদের সঙ্গে খৃস্টানদের সুসম্পর্কের সূত্র কেবল এটুকু যে, এই প্রক্রিয়ায় মুসলমানরা আপসে লড়াই করে করে শেষ হয়ে যাবে কিংবা দুর্বল হয়ে যাবে, যার ফলে মুসলমানরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। রাজত্বের নেশা, খৃস্টানদের দেয়া সম্পদ, সামরিক সাহায্য, মদ আর ইহুদীদের রূপসী মেয়েরা এই আমীরদেরকে এমন অন্ধ করে তুলেছিলো যে, তারা এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে সুলতান, আইউবীর বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, যখন নুরুদ্দীন জঙ্গী দুনিয়া থেকে চলে গেছেন এবং সুলতান আইউবী এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে মিসর থেকে এসেছেন যে, তিনি খৃস্টানদেরকে ইসলামী দুনিয়া থেকে বিতাড়িত করে প্রথম কেবলা বাইতুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত না করে ফিরবেন না।
দেড় মাস যাবত হামাত থেকে হাল্ব পর্যন্ত এই বিশাল সবুজ ভূ-খণ্ডে মুসলমান মুসলমানের রক্ত ঝরাতে থাকে। শেষে বিজয় সত্যেরই হয়েছে। সুলতান আইউবী জয়লাভ করেছেন। দুশমনরা তাঁর আনুগত্য মেনে নিয়েছে। কিন্তু সুলতানের চেহারায় খুশির সামান্যতম ঝিলিকও চোখে পড়লো না। জাতির সামরিক শক্তির বৃহৎ অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এই হিসেবে এটা খৃস্টানদেরই জয় আর মুসলমানদের পরাজয়। খৃস্টানরা তাদের লক্ষ অর্জনে সফল হয়েছে। সুলতান আইউবী কয়েক বছরের জন্য বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে অগ্রযাত্রার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।
